আলবেয়ার কামু ও অ্যাবসার্ড তত্ত্ব

share on:
আলবেয়ার কামু

আলবেয়ার কামু যখন সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যান ১৯৬০ সালের জানুয়ারির ৪ তারিখে, তখন বয়স ৪৬ বছর। ততদিনে অবশ্য তার সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পাওয়া হয়ে গিছে।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

তাঁর সর্বাধিক পরিচিত উপন্যাস ‘দা স্ট্রেনজার’ এর মাধ্যমে পৃথিবীবাসী তার ‘অ্যাবসার্ড’ তত্ত্বের সঙ্গে হয়ে উঠেছে পরিচিত। সেই সঙ্গে তিনি তাঁর জন্মস্থান প্যারিস থেকে হয়েছেন বিতারিতও। জ্যাঁ পল সাত্রে ও কতিপয় বামপন্থিদের কাছে শুনতে হয়েছে আক্রমণাত্মক গালিগালাজ। ফ্যাশনাবল রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিষ্ঠায় তার দেওয়া মতামতকে অনধিকার চর্চা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর এসময়ে পারতপক্ষে আলবেয়ার কামু তার মেয়ের ভাষ্যমতে ছিলেন বড্ড নিঃসঙ্গ একজন মানুষ।

তবে আজ সময় পাল্টেছে। আজকের ফরাসিরা আলবেয়ার কামুকে অত্যন্ত মর্যাদার চোখে দেখে। অবশ্য এটা হয়েছে সাত্রের ভাবমূর্তি কিছুটা স্থিমিত হয়ে যাওয়ার পর। এমনকি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি , তাঁর রাজনৈতিক অধিকার থেকেই কামুর দেহাবশেষ নিজ দেশে স্থানান্তরের প্রস্তাব করেছিলেন। এবং সাম্প্রতিক সময়ে তার মৃত্যুবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে জাকজমকপূর্ণভাবে পালন করা হয়েছে। এ সময়ে তার রচনার একটি বিশাল ভলিউম প্রকাশ করা হয়েছে চমৎকার অলঙ্করণ সহকারে। আর এর কাজটি করেছে তার জময কন্যাদ্বয়ের একজন ক্যাথরিন কামু।

আলবেয়ার কামু ছিলেন একজন প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা দার্শনিক এবং সেই সঙ্গে একজন লেখক। তার এই দার্শনিক হয়ে ওঠা পড়াশোনার ভেতর দিয়ে অর্জন করতে হয়নি, বরং জীবন সম্পর্কে তার এই দর্শনগত চিন্তা ছিলো সহজাত। তার এই চিন্তাগুলো ছিলো প্রকৃতপক্ষেই অদ্ভুত, যদিও এই অদ্ভুত চিন্তাগুলো ছিলো একটি শক্তিশালী ভিতের উপর দাড়ানো, মোটেই অগোছালো নয়। আর তার চিন্তাধারাগুলো একদিকে যেমন ছিলো ধোয়াশাবৃত, অন্যদিকে ছিলো যৌক্তিক ও উদার মানসিকতা দ্বারা পরিবেষ্টিত। ফলে পাঠককে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করতো।

এ ব্যাপারটি কিছুটা পরিষ্কার হতে পারে তার একটি মন্তব্যের মাধ্যমে।

‘আমার সামনে দিয়ে হাটবে না, হয়তো আমি অনুসরণ করতে পারবো না, আমার পেছনে হাটবে না, কারণ আমার নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা নেই, আমার পাশে হাটতে পারো এবং আমার বন্ধু হতে পারো।’

কামু মানুষের নিয়তি সম্পর্কে ছিলেন পেসিমিস্ট, কিন্তু প্রত্যেকটা মানুষের ক্ষেত্রে ছিলেন অপটিমিস্ট। ক্রমাগত নবায়নের মাধ্যমে নিজের অবস্থা পরিবর্তনের একটি অভিজাত প্রচেষ্টা তার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। আর এজন্যই তিনি ছিলেন বড়ই একাকী এবং অদ্ভুত প্রকৃতির। তবে তার উপন্যাসে যে স্থানের বর্ণনা উঠে এসেছে – সেই স্থান সম্পর্কে তার স্বচ্ছ একটি ধারণা ছিলো। যা অন্য ফরাসি উপন্যাসিকের চেয়ে তাকে আলাদা করে তুলেছে।

আর এজন্যই প্রচণ্ড শীত বা উষ্ণতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আশেপাশের শব্দের তারতম্য ও সেই স্থানের প্রতিটি ধুলিকণার পরিবর্তনের মতো সুক্ষ বিষয়গুলোও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কামুকে সমগ্র জীবন জুড়ে যক্ষা নামক ভয়াবহ ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে যেতে হয়েছে । ফলে জীবনকে উপভোগ করার কোন সুযোগ তার জীবনে আসেনি যা সাধারণত তরুণ বয়সের ছেলেরা করে থাকে। একদিক দিয়ে বলতে গেলে এই কারণটিই হয়তো তাকে একটি বিশেষ ধরণের সাহিত্য রচনায় প্ররোচিত করেছে।

কামুর রচনা পাঠকদেরকে নিজস্ব জীবন সম্পর্কে চিন্তাশীল পর্যবেক্ষক করে তোলে। কামুর কাছে বিদ্রোহ হলো মানুষের শ্বাশ্বত অবস্থা, অন্যায়-অবিচার যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাকে ব্যহত করে তার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম। আর এটা বলতে গেলে প্রায় একটি অসম্ভব কাজ। বিদ্রোহকে সাফল্যমণ্ডিত করে তোলা কেবল সম্ভব উন্নত চরিত্রের মানুষদের দ্বারাই।

কেননা বেশিরভাগ বিদ্রোহই বিদ্রোহকারীর ব্যক্তিগত ও স্ব-আরোপিত বিপত্তিতে পরে ব্যর্থ হয়ে যায়। যেখানে আশা নাই সেখানে হতাশা থাকতে পারে না – এ ব্যপারটা সম্ভবত আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের চেয়ে প্রাচীন বিয়োগান্তক উপাখ্যানের বেলায়ই বেশি খাটে। ব্যপারটা এতটা অসঙ্গতিপূর্ণ হওয়া স্বত্ত্বেও কামু এমন একজন জ্ঞানী ব্যক্তি তিনি ব্যাপারটা মেনে নিচ্ছেন।

আপনাকে সবসময় অবিচারের প্রতি মনোযোগি থাকতে হবে। কামু এক্ষেত্রেই অনেকটাই সাবধানী। তার মতে- জীবনকে বয়ে চলার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টার চেয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য আমাদের উপভোগ করার দিকেই আমাদের বেশি মনোযোগি হতে হবে। আর তার এই স্বীকৃতিই তাকে একথা বলার অনুমতি প্রদান করে যে- ‘শীতকালের মাঝামাঝি সময়ে অবশেষে আমি বুঝতে পারি যে- গ্রীষ্মকালই ছিলো আমার কাছে অদম্য।’

নোবেল পুরষ্কার গ্রহণ বক্তৃতায়, আলবেয়ার কামু বলেন যে, লেখকের দায়িত্ব দুই ধরণের- ‘সমাজে প্রচলিত মিথ্যাকে অস্বীকার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ’। আর এ দুটি বিষয় সাহায্য করে আলবেয়ার কামুর উপন্যাসের চরিত্র ও বিষয়কে বুঝতে। তখনই কামুর উপন্যাসের বিষয়ের অর্থহীনতা-পরিমার্জনা এবং চরিত্রের- নীরবতা, বিদ্রোহ, সততা পাঠককে আবিষ্ট করে রাখে।

আলবেয়ার কামু-র অবিস্মরণীয় উপন্যাস ‘দ্য প্লেগ’ এর অবিস্মরণীয় একটি বাক্য এ ব্যাপারটিকে বুঝতে সাহায্য করে। ‘সন্ন্যাসী হতে না পেরে তারা ডাক্তার হয়েছিলো।’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বার্নার্ড রিয়াক্স ছিলেন পেশায় চিকিৎসক। আলজেরিয়ার শহর ওরান এ প্লেগের প্রাদুর্ভাবে যে ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছিলো ওরান এর মানুষ ও সমাজ, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান ওই চিকিৎসক। প্লেগাাক্রান্ত মানুষের সেবা শুশ্রূষা করতে গিয়ে তিনি হারান তাঁর স্ত্রী এবং ভালবসার সকলকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনের যুদ্ধে তিনি জেতেন।

কামু পাঠকদেরকে একধরণের দৈতাবস্থানের মধ্যে পতিত করে- যেমন দুঃখ ও বিষন্নতা, অন্ধকার ও আলো, জীবন ও মৃত্যু। তিনি এ বিষয়ের উপরে জোর দিয়েছেন যে- সুখ ব্যপারটা খুবই আপেক্ষিক এবং দ্রুত শেষ হয়ে যায়। মানুষ মূলত একধরণের মৃতাবস্থার মধ্যে অবস্থান করে। মৃত্যু নিশ্চিত ও মহাবিশ্বের নীরবতা স্বত্ত্বেও আমরা কষ্ট সহ্য করে যাচ্ছি। ব্যাপারটা কিছুটা এরকম যে সুখ পেতে হলে কষ্ট সহ্য করতে হবে।

যখন আপনি এরকম বিশ্বাস করবেন তখন আপনি প্যারাডক্স জীবনযাপন করতে পারবেন না। কারণ প্যারাডক্স হলো- জীবনের প্রচণ্ড রকমের গুরুত্ব আছে, সেই সঙ্গে অর্থহীন একটা ব্যাপারও। এরকমই একটি পরস্পরবিরোধী এবং উদ্ভট ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আলবেয়ার কামুর অ্যাবসার্ড তত্ত্ব। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও গভীরভাবে ভাবার পরে পাঠকের সামনে- পরে একটি যুক্তিগ্রাহ্য অর্থ আবিষ্কৃত হয়।

কামু অ্যাবসার্ড তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে আমাদের জীবনকে বিচার করেছেন এবং মানুষকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন- কিভাবে আমরা এর মধ্যে বাস করবো।

অবশ্যই আমাদের জীবনের অর্থ ও মূল্য আছে। কিন্তু যদি আমরা মনে করি আমাদের জীবনের কোনো মূল্য ও অর্থ নেই, তবে কি আমাদের আত্মহত্যা করা উচিত?

আরও পড়ুন :

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস : লেখকদের লেখক।

Facebook Comments
share on:
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।