আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

share on:
আল মাহমুদ

আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কলকাতার নীলাঞ্জন দত্ত। সাক্ষাৎকারে কবিতা-অধ্যাত্মবাদ-বাংলা ভাষা-ঢাকা-কলকাতা, বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে আল মাহমুদ৷

আল মাহমুদ  আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক।

আমরা আপনাকে যে ভাবে চিনেছি আপনার কবিতার মাধ্যমে, তাতে মনে হয়েছে যে আপনি সারা জীবন ধরে একটা কিছু খুঁজছেন

কী খুঁজছি সেটা তো আর স্পষ্ট করে বলতে পারব না, তবে এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শহরগুলোর ফুটপাথ ধরে আমি হেঁটে এসেছি৷ কখনও বৃষ্টির মধ্যে, তুষারপাতের মধ্যে, রৌদ্রের মধ্যে… গন্তব্য… চোখে ভালো দেখি না৷ আবছা মতো দেখি, এই আর কী৷

আজকের পৃথিবীকে কী রকম দেখছেন?

একটা কথা আছে না যে, গান্ধীজি যদি মারা যান, আকাশ হবে না খান খান- পৃথিবী ঘুরবে৷ এই পৃথিবীকে ঘূর্ণায়মান দেখছি, এই আর কী৷

আপনার মায়ের সেই নোলকটা যে হারিয়ে গিয়েছিল– ‘আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে৷ হেথায় খুঁজি, হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে‘- খুঁজে পেলেন?

না৷ তবে আমি খুঁজেছি, এইটাই আমার কাছে বড়ো৷ এই খুঁজতে গিয়ে আমি কোথায় কোথায় গেলাম, কী করলাম, এর একটা বিবরণ কিন্তু আমার সাহিত্যে, কবিতায়, গল্প-উপন্যাসে আছে৷ সান্ত্বনা কী? লেখকের, প্রকৃতপক্ষে, তৃপ্তি হয় না৷ পরিতৃপ্ত লেখক খুব কমই দেখেছি সারা জীবনে৷ সবার মধ্যেই একটা কীসের আকাঙ্খা যেন৷ এইটাই তো দেখার৷ ফরাসিরা নিজেদেরকে বলে ‘ফ্রঁসে’৷ তারা যে ফরাসি, এইটা আগে বলে৷ তারা বলে যে আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন ‘গল’৷

আর বাঙালিরা এই আত্মপরিচয়টা কী ভাবে দেবে?

আমরা বলি আমরা বাঙাল৷ আমাদের এক সময় এই বলে ঠাট্টা করা হত৷ এখন যদি আমরা নিজেরা বলি আমরা বাঙাল, তখন সবাই একটু থমকে যায়৷

আপনি তোসোনালি কাবিন‘- বাঙালি কবির গর্বের কথা বলেছেন– ‘ তীর্থে আসবে যদি ধীরে অতি পা ফেল সুন্দরী/ মুকুন্দরামের রক্ত লেগে আছে মাটির গায়…’

আমি তো মনে করি সেই ধারাবাহিকতা আমি বহন করছি৷ কিন্তু সাহিত্যের রাস্তা কেউ তো কাউকে এমনি ছেড়ে দেয় না৷ আমার তিক্ত সমালোচনাও আছে, আবার প্রশংসারও কোনও সীমা নেই৷ এই দুটো মিলিয়েই আছি৷

খন কী লিখছেন? কী নিয়ে লিখছেন?

এই তো, নানা রকম বিষয় নিয়ে লিখছি, গদ্য, পদ্য… তবে এখন পদ্যের চেয়ে গদ্যই বেশি লিখছি৷ কনটেম্পোরারি সাবজেক্ট নিয়ে৷ এই ঢাকাকে বলা হয় বাহান্ন গলি, তিপ্পান্ন সড়কের গোলকধাঁধা৷ এক সময় বলা হতো আর কী৷ এখন তো আর গোলকধাঁধা নাই, এখন তো ঢাকা রাজধানী, সিটি৷ একটা কথা আছে, আমার বাবা আমাকে বলত, ‘যদি পড়ে কহর, তবু ছেড়ো না শহর’৷ শহর ছেড়ে যাই কোথায়? মফস্সলের একটা শহরে আমার জন্ম হয়েছে, নাম হল ব্রাহ্মণবাড়িয়া৷ এক সময় নাকি ব্রাহ্মণরা ওখানে খুব প্রভাবশালী ছিল৷ আমি তো আমার সময়ে ব্রাহ্মণ খুব কমই দেখেছি৷ এখন মুসলমান ভর্তি৷

বাংলার গ্রামে তো এক সময় হিন্দুমুসলমান এক সঙ্গে বাস করত নিরাপদে

এখনও কিন্তু আমাদের দেশে, এই যে ভাটি বাংলা, এখানে সাম্প্রদায়িকতা নাই বলা যায়৷ এখানে মানুষ অসাম্প্রদায়িক৷

আপনি তো লিখেছেন, ‘কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি/ সে তো ভেসে থাকা ম্লান/ আমার মায়ের মুখ…’- সেখান থেকে আজকের এই নগরজীবনে এসে আপনি কি কিছু হারিয়েছেন বলে মনে হয়? নাকি নতুন কিছু পেয়েছেন?

আপনি খুব জটিল প্রশ্ন করেছেন৷ কথা হলো যে, ঢাকার এখন যে জীবন, এত দ্রুত গতি- আমরা হলাম কবি মানুষ, আলস্যের পূজারি৷ অলসতা ভালোবাসি৷ এখনও পর্যন্ত আমি লিখছি- আমার বয়সী লেখক আর নেই৷ সবাই গত হয়েছেন৷ শামসুর রহমান ছিলেন, নাই৷ ফজল শাহাবুদ্দিন- তিনিও কয়েক দিন আগে মারা গেছেন৷ শহীদ কাদরি আমেরিকায় থাকে৷ তাকে ডায়ালিসিস নিয়ে বাঁচতে হয়, দেশে আসতে পারে না৷

এখন যারা লিখছেন বাংলাদেশে, নতুন কবি যারা, তাদের সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়?

তাদের সঙ্গে আমার খুব একটা যে যোগাযোগ আছে, তা আমি বলতে পারব না৷ তবে মাঝেমধ্যে কেউ আসে দেখা করতে৷ নতুন সাহিত্য তো তাদেরই হাতে৷ তারা যে দিকে নিয়ে যাবে সে দিকেই যাবে৷ আমরা তো অতীত হয়ে যাব৷ কিছু দিন আগেও আজিজ মার্কেটে যেতাম, হাতড়ে-হুতড়ে বইপত্র, ম্যাগাজিন, এ সব কিনে আনতাম৷ আজকাল সেটাও আর পারি না৷ সমসাময়িক কালের লেখকদের সাথে যোগাযোগ একেবারে নাই তা বলব না, তবে ক্ষীণ হয়ে গেছে৷ অনেক তরুণ কবি এসেছেন, আমি শুনেছি খুবই প্রতিভাবান৷ তারা আসে মাঝেমধ্যে, আসলে কথাবার্তা বলি আর কী! লেখালেখি- একটা অন্তরের আকাঙ্খা না থাকলে শেষ পর্যন্ত হয় না৷ আমি যত দিন পেরেছি করেছি৷ এখন নতুনরা করবে৷

কিন্তু আপনি তো এখনও লিখে চলেছেন৷ আচ্ছা, আপনাকে যদি আপনার কবিতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, আপনি কী বলবেন?

আমি কিছু আঞ্চলিক শব্দ কাব্যে ব্যবহার করেছি৷ যেমন ধরুন, আমরা বলি, ‘কলস’৷ কিন্তু বাংলা ভাষায়, কেউ বলে ‘ধিল্যা’৷ ধিল্যা ভরা পানি৷ তো এই যে ধিল্যা শব্দটা, এটা কিন্তু বাংলা শব্দ৷ এটাকে কেন ব্যবহার করব না? এই ধারণা থেকে, আমি কিছু আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেছিলাম কবিতায়, এবং সেটা খুব প্রশংসিত হয়েছিল৷ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আঞ্চলিক বাংলা ভাষার ডিকশনারি করেছিলেন৷ সেখানে দেখা যাচ্ছে বাংলা ভাষার অর্ধেক শব্দই আমরা ব্যবহার করিনি৷ এখন অনেকে করছে৷ এবং এই সাহসটা, কিছু না কিছু হলেও, আমিই দিয়েছি৷ এখন একটা ভাণ্ডার খুলে গেছে৷

যারা লিখতে পারে, তারা শিখতেও পারে৷ দেখতে দেখতে, শিখতে শিখতে, লিখতে লিখতে যেতে পারে৷ তো এই গতিবেগটা, ঈষৎ হলেও, আমি জাগিয়ে দিয়েছি, এদের সাহস দিয়েছি, সহযোগিতা করেছি৷ এখন ভাষা তার নিজের গতিতে চলবে৷ বাংলা সাহিত্যের জন্ম চর্যাপদ থেকে৷ চর্যার যে শব্দরাজি, সেটা একেবারেই বাংলার নিজস্ব, এবং তার স্টাইল খুবই পরিচ্ছন্ন৷ আধুনিক বাংলা ভাষার যে চরিত্র দাঁড়িয়েছে, সেই চরিত্র পরীক্ষা করলে দেখবেন যে একটা গতিবেগ আছে৷

আমি অবশ্য বহু দিন কলকাতায় যাই না, কিন্তু আমরা তো বড় হয়েছি কলকাতায়৷ কত বন্ধু ছিল৷ কলকাতার কথা তো আমার মতো মানুষেরা কোনো দিন ভুলতে পারে না৷ আমরা বাংলাদেশের বাঙালিরা যদি বলতাম, যে কলকাতার অর্ধেকটা আমাদের দিতে হবে, তবে সে আন্দোলন আমরা চালিয়ে যেতে পারতাম৷ কিন্তু কলকাতা কলকাতার জায়গাতেই আছে৷ আমি তো আর যেতে পারি না ভাই৷ কলকাতায় আমার গল্প নিয়ে ছবি হয়েছে, তারা আমায় দাওয়াত করেছিল, কিন্তু আমি সুস্থ নই, আমি যেতে পারিনি৷

আমরা কিন্তু আল মাহমুদকে বামপন্থী কবি বলে চিনেছিলাম৷ আপনার কি সেই বামপন্থায় বিশ্বাস এখনও আছে?

সত্যি কথা বলতে কী, আমি বাম এবং দক্ষিণ নিয়ে ঝগড়াঝাটি করি না৷ আমার একটা ব্যক্তিগত বিশ্বাস আছে৷ ফেথ যাকে বলে৷ আই প্রে৷ প্রার্থনা করি৷ এটা আমার বয়স হয়েছে বলে না, এটা আমার পারিবারিক ট্র্যাডিশন থেকে আসছে৷ অনেক বিদ্বান এবং বিদূষী ব্যক্তি আমাদের দেশে জন্মেছেন এবং অনেক ভালো কাজ করে গেছেন৷ বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক দিক দিয়েও একেবারে পিছিয়ে নেই৷ শোষণ-লুণ্ঠন এখন আর আগের মতো নেই৷

একটা স্থানীয় গণতন্ত্র আছে বাংলাদেশে৷ এখানে সহনশীল মানুষ বাস করে৷ আপনি কথা বললে আপনাকে কথা বলতে দেবে৷ আপনার কথা শুনবে৷ এই রকম একটা পরিস্থিতি পূর্ববাংলায় আগে পাওয়া যেত না৷ এখানে মুসলমান-হিন্দু চাষী সম্প্রদায়ের লোক বেশি ছিল৷ এবং তাদের জমিদাররা খুব শোষণ করত৷ সেটা বন্ধ করেছিলেন ঋণ সালিশী রোর্ড করে এ কে ফজলুল হক৷ আর বাঙালি- কী পুরুষ কী নারী- খেটে খাওয়া মানুষ৷ খাটতে জানে, এই জন্য তাদের অগ্রগতি হয়েছে৷

এই যে কয়েক দিন আগে লালন ফকিরের তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান হলো কুষ্ঠিয়ায়, আপনি তো শুনেছি আগে নিয়মিত যেতেন৷ আপনি লালনকে কী ভাবে পেয়েছেন?

আমি তো বলি সাঁইজি৷ লালন তো আমাদের সত্তায় মিশে আছে৷ আধুনিক জীবনেও৷

কিন্তু লালনকে নিয়ে তো রাজনীতিও হয়েছে এখন তো আবার প্রশ্ন উঠেছে, লালন কার৷

ওই যে একটা কথা আছে, ‘খানিক ভাসে শূন্যের উপর, খানিক ভাসে নীরে৷’ আধ্যাত্মিকতার মধ্যে একটা রহস্য আছে৷ এই রহস্য ভেদ করে সবাই ভেতরে ঢুকুক, এটা হয়তো তারা চাননি৷ নিজেরাই চাননি৷ তারা ভেবেছেন, জীবন রহস্যময়, রহস্য থাকুক৷

আপনিও কি তাই মনে করেন?

দেখুন, আমাকে তো আধুনিক কবি বলা হয়৷ এখন প্রশ্ন হল, যে আধুনিকতা কাকে বলে৷ একশো বছর বড়ো জোর- তার আগের কবিতাকে তো আর আধুনিক বলা যায় না৷ তা হলে কবিতা কবিতাই থাক, আধুনিক শব্দটা আর ব্যবহার করা উচিত নয়৷

কবিতাও তো একটা রহস্য৷ কবিতা কী, তা কি আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি?

তা কি বলা যায়? বলা যায় না তো৷ কিন্তু শুধু এইটুকুই জানি, যে কবিতা না হলেও চলে না৷

আমাদের কাছে কিন্তু আল মাহমুদও রহস্যই রয়ে গেলেন৷

আদর্শগত দিক দিয়ে, আমি তো এক জন বিশ্বাসী মানুষ৷ সারা জীবনই আমি লিখতে চেষ্টা করেছি৷ এখন নিজের বই দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই- যে এত লেখা আমি কখন লিখলাম! আমার কাজ তো আমি করে গেছি- ভবিষ্যত্ জানে কোনটা গ্রহণীয় কোনটা বর্জনীয়৷ সাধারণ মানুষ অনেক এগিয়ে যাচ্ছে৷ আমি তো দেখব আর লিখব৷ এবং আমিও যাব- লিখতে লিখতে, দেখতে দেখতে, শিখতে শিখতে৷

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : জহির রায়হান : চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও জীবন।

Facebook Comments
share on: