
চীনের স্কুলে বাধ্যতামূলক এআই শিক্ষা: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার নতুন কৌশল
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তিবিদ, গবেষক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিষয় নয়। ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান, অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে এআইয়ের প্রভাব যত বাড়ছে, ততই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নতুন প্রজন্মকে এই প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে উদ্যোগী হচ্ছে।
সেই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে বেশ আগেভাগেই বড় পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। দেশটির রাজধানী বেইজিংয়ে ২০২৫ সালের শরৎকালীন সেমিস্টার থেকে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য এআই বিষয়ক সাধারণ শিক্ষা চালু করা হয়েছে। প্রতি শিক্ষাবর্ষে কমপক্ষে আট ঘণ্টার এআই শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এটিকে ধীরে ধীরে স্কুলশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
চীনের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যতের মানবসম্পদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগে আগামী দিনের নাগরিকরা যেন কেবল এআই ব্যবহারকারী না হয়ে এ প্রযুক্তি বুঝতে, নিয়ন্ত্রণ করতে এবং নতুন উদ্ভাবনে ভূমিকা রাখতে পারে, সেই লক্ষ্যেই স্কুল পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তবে এআই শিক্ষা সব বয়সী শিক্ষার্থীর জন্য একই রকম নয়। বয়স ও শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ বিবেচনায় রেখে পাঠক্রম সাজানো হয়েছে ধাপে ধাপে। প্রাথমিক স্তরে এআই শেখানো হচ্ছে মূলত অভিজ্ঞতা ও পরিচিতির মাধ্যমে। শিশুরা এআই কী, এটি কোথায় ব্যবহৃত হয়, রোবট বা স্মার্ট প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে—এসব বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পাচ্ছে। এই পর্যায়ের মূল লক্ষ্য প্রযুক্তির প্রতি কৌতূহল তৈরি করা এবং শিশুদের মধ্যে এআইভিত্তিক চিন্তার বীজ বপন করা।
মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে শিক্ষার্থীদের সামনে এআইয়ের ব্যবহারিক দিকগুলো তুলে ধরা হচ্ছে। কীভাবে এআই পড়াশোনা, তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে কাজে লাগতে পারে, সে বিষয়ে তাদের ধারণা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে প্রকল্পভিত্তিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা। এখানে শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহার করে সমস্যা সমাধান, নতুন ধারণা তৈরি এবং বাস্তবভিত্তিক প্রকল্পে অংশ নেওয়ার দিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বেইজিংয়ের শিক্ষা পরিকল্পনায় প্রাথমিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতাভিত্তিক, মাধ্যমিকে ধারণাভিত্তিক এবং উচ্চমাধ্যমিকে সমন্বিত ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চীনের পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এআইকে শুধু একটি আলাদা পাঠ্যবিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। স্কুলগুলো চাইলে স্বতন্ত্র এআই কোর্স চালু করতে পারবে, আবার তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সাধারণ প্রযুক্তি, ব্যবহারিক কার্যক্রম কিংবা অন্যান্য শিক্ষাবিষয়ের সঙ্গে এআইকে যুক্ত করেও পাঠদান করতে পারবে। অর্থাৎ এআইকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রযুক্তি হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি সাধারণ দক্ষতা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
শ্রেণিকক্ষেও আসছে বড় পরিবর্তন। চীনের পরিকল্পনায় এআই শুধু শেখার বিষয় নয়, শেখানোর একটি মাধ্যমও। এআইভিত্তিক শিক্ষাসঙ্গী, মানব-মেশিন সংলাপ এবং ব্যক্তিভেদে শেখার সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি বিশ্লেষণ, দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রচলিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের সঙ্গে প্রযুক্তিকে যুক্ত করে নতুন ধরনের ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী-মেশিন’ভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
তবে প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানোর পাশাপাশি এর ঝুঁকি সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের সচেতন করা হচ্ছে। জেনারেটিভ এআইয়ের উত্তর সব সময় নির্ভুল নাও হতে পারে, ভুল তথ্য তৈরি হতে পারে, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে—এসব বিষয়ও পাঠক্রমের অংশ। এআই নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব এবং প্রযুক্তির সতর্ক ও দায়িত্বশীল ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের শুধু ‘এআই কীভাবে ব্যবহার করতে হয়’ তা নয়, বরং ‘কখন, কোথায় এবং কীভাবে এআই ব্যবহার করা উচিত’—সেই বিচারবোধও গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
স্কুলের চার দেয়ালের বাইরেও এআই শিক্ষার অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে চাইছে চীন। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি, বিজ্ঞান জাদুঘর ও বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্কুলগুলোর সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা যাতে বাস্তব পরিবেশে প্রযুক্তি দেখতে, বুঝতে এবং ব্যবহার করতে পারে, সে জন্য এআই ল্যাব, প্রদর্শনী কেন্দ্র ও গবেষণা স্থাপনা শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ‘বিশ্ববিদ্যালয়, কোম্পানি ও স্কুল’—এই তিন পক্ষের সমন্বয়ে বিশেষ মেধাবী ও আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত এআই শিক্ষা ও উদ্ভাবনী কোর্স তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
এই বিশাল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ এআইভিত্তিক শিক্ষা শুধু নতুন একটি বই হাতে তুলে দিলেই সম্ভব নয়; শিক্ষককেও প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। এ কারণে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিশেষজ্ঞদের স্কুলে পাঠদান এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষকদের সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালেও বেইজিংয়ের এআই শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ‘AI education lecturer’ বা প্রশিক্ষক দল গঠনের তথ্য প্রকাশ করেছে চীনের শিক্ষা কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে চীনের এআই শিক্ষা পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য স্পষ্ট—আজকের স্কুলশিক্ষার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে তারা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে পিছিয়ে না পড়ে। কেউ হয়তো ভবিষ্যতে এআই প্রকৌশলী হবে, কেউ গবেষক, কেউ উদ্যোক্তা; আবার অনেকেই হয়তো অন্য পেশায় যাবে। কিন্তু প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআই একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হয়ে উঠবে—এমন ধারণা থেকেই দেশটি স্কুলপর্যায়েই এ প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করতে চাইছে।
চীনের এই উদ্যোগ তাই শুধু শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কৌশল। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের এআই সম্পর্কে সচেতন ও দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে চীন এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চায়, যারা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করবে না, বরং আগামী দিনের প্রযুক্তি তৈরি ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিতে পারবে। প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ যে দেশগুলোর হাতে নির্ভর করবে, সেই প্রতিযোগিতায় চীন তার নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে ইতোমধ্যেই স্কুলের শ্রেণিকক্ষ থেকেই কাজ শুরু করেছে।
