আব্বাসউদ্দীন আহমদ : বাঙালির প্রাণের শিল্পী

share on:
আব্বাসউদ্দীন আহমদ

আব্বাসউদ্দীন আহমদ গ্রামবাংলার একান্ত নিজস্ব শিল্পী। বাংলার সাধারণ মানুষ ও তাদের পরিবারের মনে কোণে লুকিয়ে থাকা আশা-ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার গানে।

গান সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। মনকে পাল্টায়-করে তোলে উতলা। জাতিকে নিয়ে যায় প্রেরণার জগতে । স্বাধীনতার প্রণোদনায় উদ্বেলিত করে তোলে। আব্বাসউদ্দীনের বেলায় এ কথাটি সত্যে পরিণত হয়েছিল।

সংস্কৃতিবানেরা ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আব্বাস উদ্দীন যখন গান গাওয়া শুরু করেন তখন বাঙালি মুসলিমসমাজে গানের কদর ছিল কম, পরিসরও ছিল একেবারে ছোট। এমনকি মুসলিম সমাজে তখন গান গাওয়া তো দূরে থাক, শোনাও ছিলো বলতে গেলে হারাম। এই অর্গল ভাঙার দায় বর্তেছিল আব্বাসউদ্দীনের কাঁধে। বলতে গেলে স্বেচ্ছায় তুলে নিয়েছিলেন।

আর এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিলেন আব্বাস উদ্দীন। তার গানে সমস্ত অর্গল ভেঙ্গে একদিন মেতে উঠেছিল সমগ্র বাংলাদেশ। যখন আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো : ‘আল্লা আমার মাথার মুকুট রসুল গলার হার’- ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়’- ‘আল্লা নামের বীজ বুনেছি’-‘নাম মোহাম্মদ বোল রে মন নাম আহমদ বোল’- ‘আল্লাহ আমার প্রভু আমার নাহি নাহি ভয়’। যারা এতদিন গান শুনলেই কানে আঙুল দিত তারাই তন্ময় হয়ে শুনল এ গান।

রংপুর ও কুচবিহার অঞ্চলের ভাওয়াইয়া-ক্ষীরোল-চটকা গেয়ে তিনি প্রথম সুনাম অর্জন করেন। তারপর জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, বিচ্ছেদী, দেহতত্ত্ব, মর্সিয়া, পালাগান ইত্যাদি পল্লীগানের নানা শাখার গান গেয়ে ও সেসব গান রেকর্ড করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম, জসিমউদ্দীন ও গোলাম মোস্তফার ইসলামি ভাবধারায় রচিত অনেক গানও গেয়েছেন।

আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে নজরুলের ইসলামী গানের পরিমাণ যেমন বিপুল, তেমনি এর সুর প্রচণ্ড আবেগসঞ্চারী থাকায় তা বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ঈদের গান ‘ ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে….’ মুসলিম সমাজে তাকে দেয় তুমুল জনপ্রিয়তা। আজও এ গান ছাড়া বাঙ্গালী মুসলিম সমাজের রোজার ঈদ যেন পূর্ণাঙ্গ হয় না।

বাংলার চিরকালীন সম্পদ ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি, সারি, মুর্শিদি গানের জাদুতে তিনি মুগ্ধ করেন সমগ্র বাংলাভাষী সংগীত শ্রোতাদের। আমাদের প্রেম-বিরহে, দ্রোহে-সংগ্রামে, জাতীয় জাগরণে তিনি যে উদ্দীপনা জুগিয়েছেন তা এক কথায় অনন্য ও অসাধারণ। আব্বাসউদ্দীন আহমদ ছিলেন এমন একজন গায়ক, যাঁর কণ্ঠস্বরে বাংলার পল্লীপ্রকৃতি মূর্ত হয়ে উঠেছিল।

গান নিয়ে তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন ছিলো না আব্বাস উদ্দীনের। কেবল কলকাতায় অল্পসময়ের জন্য তিনি ওস্তাদ জমীরুদ্দিন খাঁর কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নেন। প্রথম জীবনে ছিলেন পল্লীগাঁয়ের গায়ক। যাত্রা-থিয়েটার ও স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান শুনে তিনি গানের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং বলতে গেলে নিজ প্রচেষ্টায় গান গাওয়া রপ্ত করেন। তিনি প্রায় সবধরণের গান গেয়েছেন। তবে পল্লীগীতিই ছিল তার মূল সাধনা।

আব্বাসউদ্দীন প্রথম গান রেকর্ড হয় ১৯৩০ সালে হিজ মাস্টার্স ভয়েস (এইচএমভি) কম্পানিতে। পরে মেগাফোন, টুইন, রিগ্যাল ইত্যাদি কোম্পানিও তার বহু গান রেকর্ড করে। গ্রাম-গঞ্জ-শহরের আসর ও জলসায় গান গেয়ে এবং গ্রামোফোনে গান রেকর্ড করে আব্বাসউদ্দীন বাংলার মুসলিম সমাজকে সঙ্গীতানুরাগী করে তোলেন। ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই…’, ‘আমার হাড় কালা করলাম রে…’, ‘আমায় ভাসাইলি রে…’, ‘নদীর কূল নাই, কিনার নাই…’ ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে..’ ইত্যাদি গান তাঁকে জনপ্রিয় করেছিল।

আব্বাসউদ্দীন আহমদ গ্রামবাংলার একান্ত নিজস্ব শিল্পী। বাংলার সাধারণ মানুষ ও তাদের পরিবারের মনে কোণে লুকিয়ে থাকা আশা-ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার গানে। আজও তার গান আমাদের বাঙালী গ্রাম্য জাতীয় জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার অনন্ত সঙ্গী। আব্বাসউদ্দীনের আগে বা পরে এমন কালজয়ী সঙ্গীতশিল্পীর আর আগমন ঘটেনি, যিনি আব্বাসউদ্দীনের চাইতে অধিক গণসম্পৃক্ততা পেয়েছেন, জনগণের হৃদয়ের গভীরে এর চাইতে অধিক জায়গা করে নিতে পেরেছেন।

আব্বাসউদ্দীন জীবনে একটিমাত্র বই লিখে গেছেন। বইটির নাম ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’। ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’য় তিনি তাঁর শিল্পী জীবনের সংগ্রাম, প্রাপ্তি, আনন্দ ও বেদনার কথা বলেছেন।

আব্বাসউদ্দীন আহমদ-এর জন্ম ১৯০১ সালের ২৭শে অক্টোবর, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে। তার পিতার নাম জাফর আলি আহমদ। তিনি তুফানগঞ্জ মহকুমা আদালতের উকিল ছিলেন। আব্বাসউদ্দীন বাংলাদেশের বিখ্যাত গায়ক মোস্তফা জামান আব্বাসী এবং ফেরদৌসি রহমানের পিতা।

আব্বাসউদ্দীন ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কোলকাতায় বসবাস করেছেন। প্রথমে তিনি রাইটার্স বিল্ডিং-এ ডি.পি.আই অফিসে অস্থায়ী পদে এবং পরে কৃষি দপ্তরে স্থায়ী পদে কেরানির চাকরি করেন। শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হকের মন্ত্রিত্বের সময় তিনি ‘রেকর্ডিং এক্সপার্ট’ হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। চল্লিশের দশকে আব্বাসউদ্দীনের গান পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মুসলিম জনতার সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকায় এসে তিনি সরকারের প্রচারদপ্তরে ‘অতিরিক্ত গান সংগঠক’ হিসেবে চাকরি করেন। তিনি পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৫৫ সালে ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলায় ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয় সঙ্গীত সম্মেলন’, ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে ‘আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত সম্মেলন’ এবং ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে ‘প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনে’ অংশগ্রহণ করেন।

সঙ্গীতে অবদানের জন্য ১৯৬০ সালে মরণোত্তর প্রাইড অব পারফরমেন্স, ১৯৭৯ সালে মরণোত্তর শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮১ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত হন এই গুণী শিল্পী। ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। যত দিন বাংলা ও বাঙালি থাকবে তত দিন আব্বাসউদ্দীন আহমদ বাঙালির প্রাণের শিল্পী হয়ে থাকবেন।

আরও পড়ুন :  আলতাফ মাহমুদ : সুরের জন্য শহীদ।

Facebook Comments
share on:
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।