জয়নুল আবেদিনের চিত্রকলা : শেকড়ের সন্ধানে

share on:
জয়নুল আবেদিনের চিত্রকলা

জয়নুল আবেদিনের চিত্রকলা বিষয়ক এই লেখাটি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কাজের সামগ্রিক পাঠের একটি চেষ্টা। জয়নুল আবেদিন ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্ময়কর শিল্প-প্রতিভা। তিনি যেমন ছিলেন একজন শিল্পী তেমনি ছিলেন এদেশের আধুনিক শিল্পকলা আন্দোলনের পথিকৃৎ।

আধুনিক শিল্পীদের জীবনের প্রতি একধরনের বিতৃষ্ণা রয়েছে। রয়েছে পলায়নপর মনোবৃত্তি। তারা চাইতেন অন্ধকার ও মৃত্যুর কাছে আশ্রয়। যন্ত্রযুগের অসংগতি ও নিষ্পেষণ এর কারণ। কিন্তু শিল্পাচার্য জয়নুলকে যান্ত্রিক যুগযন্ত্রণা স্পর্শ করতে পারেনি। বরং তার ছবিতে প্রধান হয়ে উঠেছে লোকসমাজ। এই ক্ষেত্রে তিনি প্রচলিত ধারার অনুসারী। এই ধারার প্রধান শিল্পীও তিনি। আবহমান বাংলার নিসর্গ ও মানুষের কর্মময় জীবনের চিত্র কালজয়ী হয়ে আছে তার চিত্রকর্মে। মুসলমান পরিবারে জন্ম নেয়া জয়নুল ভারতীয় পুরাণে আশ্রয় নেননি।

জয়নুল আবেদিনের শিল্পচেতনার বিকাশকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়। প্রথম স্তরে পরে ছাত্রজীবন এবং তৎপরবর্তী কয়েক বছর। এ স্তরে জয়নুল ছিলেন সহজাত শিল্পী। মানুষ ও নিসর্গের প্রতি তার ছিল প্রবল অনুরাগ। কোলকাতা আর্ট স্কুলের বার্ষিক চিত্র প্রদর্শনীতে ‘বাঁশের সাঁকো’ শীর্ষক জলরং চিত্রের জন্য প্রশংসিত হন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র জয়নুল। এ স্তরে তার উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে- ব্রহ্মপুত্র নদের স্কেচ, শম্ভূগঞ্জ ঘাট, হাঁস, পল্লীদৃশ্য, জেলে নৌকা, পুল ইত্যাদি।

সংস্কৃতি ডটকম

জয়নুলের দ্বিতীয় পর্বের যাত্রা শুরু হয়েছে দুর্ভিক্ষ সংক্রান্ত চিত্রমালার মাধ্যমে। এ সময় তিনি মানবতার লাঞ্ছিত রূপ দেখে মর্মাহত হয়েছেন। ১৩৫০-র মন্বন্তর জয়নুলের মতো মহান শিল্পী সৃষ্টি করেছে; কিন্তু সমাজকর্মী তৈরি করেনি। এসব চিত্রে প্রতীকচিত্র হিসেবে নারী ও পুরুষের পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়েছে কাক, কুকুর, শূন্য থালা, পানির কলসি ইত্যাদি। দুর্ভিক্ষের চিত্রগুলোর শিরোনাম ‘দুর্ভিক্ষ-১৩৫০ বাংলা’। খাদ্যে স্বনির্ভর বাংলাদেশে খাদ্যের অভাবে দুর্ভিক্ষ হয়নি। দুর্ভিক্ষ হয়েছে ইংরেজ শাসকদের দ্বারা সৃষ্ট জমিদার, মজুতদার ও ফরিয়াদের কারণে। তখন বাজারে চাল ছিল, কিন্তু কৃষকদের হাতে টাকা ছিল না।

এই সম্পর্কে জয়নুলের বক্তব্য হচ্ছে- ‘‘ তারপর এলো দুর্ভিক্ষ। আমি কোলকাতায় সেই ভয়াবহ দৃশ্যাবলী ধরে রাখতে চাইলাম। চটপট কাজ করতে হয়, তাছাড়া সব জিনিসের দাম চড়া, আমি সস্তা কাগজে, দ্রুত অবিরাম একে গেলাম, শত শত স্কেচ, দুর্ভিক্ষের বিভিন্ন দৃশ্য। প্রয়োজনের তাগিদে, নেহাত অব্যবস্থার প্রয়োজনে আমার স্টাইল বদলে গেল। এক্সপ্রেশনিস্ট হলাম, খুব সহজ অথচ শক্ত রেখায়। কিছুটা জ্যামিতিক আকৃতির মধ্যে সেসব দৃশ্য ধরে রাখতে চাইলাম।’’

এই কারণে তার দুর্ভিক্ষের চিত্রমালায় শীর্ণকতায় মানবদেহগুলো দীর্ঘ হয়েছে। এর ফলে তাদের উপর যে দুর্ভিক্ষের প্রভাব, তা ভয়াবহভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে। এতে দর্শকদের মনে ভীতি সঞ্চারিত না হয়ে পারে না।

এসময়ের চিত্রে আবেদিন মন্বন্তরের অযাচিত মৃত্যুর দৃশ্যপট উন্মোচন করলেন। মৃত্যুময়তা এবং মৃত্যু পথযাত্রায় অথবা বুভুক্ষায় দুর্বল অসহায় শরীরগুলো বিচিত্র আকৃতি নিয়ে আবেদিনের দীপ্ত মোটা তুলির টানে বিস্ময়কর স্তব্ধতায় প্রকাশিত হলো। নতুন বিষয়ের নতুন আবেদনে আবেদিন সকলকে অভিভূত করলেন। এ চিত্রগুলোতে সমাজের কোনও সমালোচনার অথবা রাজনীতির কোনও প্রেক্ষাপট ছিলো না, ছিলো শিল্পী আবেদিনের স্বকীয় জীবনগত কৌতূহলের উপস্থাপনা।

একটি শিল্পকর্মের বিশিষ্টতা এবং সম্পন্নতা নির্ভর করে বহুলাংশে শিল্পীর ব্যক্তিগত অনুভূতি, কৌশল এবং স্বাচ্ছন্দ্যের উপর। চিত্রটির বিষয়গত অর্থবৃত্তি শিল্পীর মানসলোকের চৈতন্যের উপর স্থাপিত। বাস্তবের কোনও আকৃতি বা ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিতে শিল্পের যথার্থ্য নয়, শিল্পের যথার্থ্য হচ্ছে কন্ঠের উচ্চারণের মতো শিল্পীর অঙ্কনশৈলীর স্বকীয়তা। এ স্বকীয়তাই আবেদিনকে বিশিষ্টতা দিয়েছিলো। শিল্পীর তুলির টানে যে ইডিয়াম নির্মিত হয়, বস্তুর দৃশ্যগত আকৃতির যে পরিবর্তন সূচিত হয় তা এক ধরণের ট্রান্সফরমেশেন। আবেদিন এরকম ট্রান্সফরমেশন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

তার চিত্রে পরিপ্রেক্ষিতগত গভীরতা নেই, পূর্ণাঙ্গ মডেলিং-এর কারুতা নেই, গঠিত আকৃতির একটা স্তব্ধতা আছে। মোটা তুলির টানে পৌনঃপুনিকতা তাঁর চিত্রগুলোতে একধরণের রিদম বা ছন্দ এনেছে। তাঁর দুর্ভিক্ষের চিত্রগুলোর ফোরগ্রাউন্ড খুবই সংকীর্ণ কিন্তু উপরিভাগে শূন্যতার একটা বিস্তার আছে।

১৯৪৭ উত্তরকালে জয়নুলের শুরু হয়েছে তৃতীয় পর্ব। এ পর্বে তার চিত্রকলায় স্থান করে নেয় বাস্তবাদী চিত্র। শিল্পকলার জগতে বাস্তববাদী আন্দোলনের মূলে ছিল বুদ্ধিবৃত্তি, আধ্যাত্মিকতা ও ভাবালুতা পরিহার। এ সময়ের চিত্রকলায় তিনি চিরায়ত মাতৃত্ব ও নিসর্গের সঙ্গে লোকসংস্কৃতিকে যুক্ত করেছেন। এ পর্বে তিনি আরো গুরুত্বপূর্ণ যে কাজ করেন তা হলো চারুকলা শিক্ষার জন্যে ইনস্টিটিউট স্থাপন ও লোকশিল্প জাদুঘর প্রতিষ্ঠা। এ সময়ে তিনি বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকশিল্প সংগ্রহ করেছেন। এসব লোকশিল্পের মধ্যে রয়েছে নকশী কাঁথা, দারুশিল্প, শখের হাঁড়ি, বিচিত্র রঙের পুতুল ইত্যাদি। আর এসকল লোকশিল্পের রূপকল্প তার চিত্রকর্মে ব্যবহার করেছেন।

আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার পর তিনি বুঝলেন, দেশের অন্তরের গভীরে যেতে হবে ভালো শিল্প তৈরি করতে হলে। কৃষ্টি-শেকড়কে চেনাতে শিল্পীছাত্রদের সামনে নিয়মিত হাজির করলেন আববাসউদ্দীন, জসীম উদ্দীন, কানাইলাল শীলকে। সংগ্রহ করতে শুরু করলেন বাংলার লোকজ নানা উপকরণ – শাড়ি, নকশিকাঁথা, সরা, পিঠার ছাঁচ, মাটির কিংবা কাঠের পুতুল – আর দেখাতে লাগলেন ছাত্র-শিক্ষকদের। জয়নুলের তৎকালীন শিল্পসৃষ্টিতে তখনো এই লোকজ উপকরণগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যবহার শুরু হয়নি – তবে তিনি যে-শেকড়ের সন্ধানে, নিজের শিল্পভাষা বিনির্মাণে ব্রতী, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল।

এ সময়ে জয়নুল অনেক এঁকেছেন বাংলার গ্রামজীবনের রূপ। এগুলোর বেশিরভাগই জলরঙে কিংবা গোয়াশে করা। মোটা কনট্যুর লাইনে আঁকা গ্রামীণ খেটে-খাওয়া মানুষ এ-ছবিগুলোর বিষয়। এ সময় থেকেই পাশ্চাত্যের কিউবিক জ্যামিতিক স্টাইলের সঙ্গে বাংলার লোককলাকে মেলানোর চেষ্টা করছিলেন জয়নুল। ছবিতে মূল বিষয় বাংলার নারী। বাংলার প্রতিদিনকার নিপাট নিরহঙ্কার গ্রামীণ মানুষের খেটে খাওয়া জীবনকেই জয়নুল আঁকতে চেয়েছেন চিরকাল।

জয়নুল আবেদিনের ছবি এক অন্ত:হীন সামাজিক দ্বান্দ্বিকতাকে তুলে ধরে। আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় অসম সেই সমাজব্যবস্থাকে, যা তৈরি করে দুর্ভিক্ষ, মহামারি, শোষণ এবং বঞ্চনার একটি চিরন্তন কোলাজ। জয়নুলের ছবি আমাদের সচেতন করে দরিদ্র মানুষদের দ্বিমুখী বঞ্চনার বিষয়ে। এক, তাদের দারিদ্র এবং শেণীগত শোষণ, দুই, তাদের রাজনৈতিক পরাধীনতা।

মুক্তিযুদ্ধ জয়নুলকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল, কারণ শুধু বাঙালির নয়, পরাশক্তি বা উপনিবেশী শক্তির হাতে নিপীড়িত যে কোন জনগোষ্ঠীর মুক্তিও তার কাছে কাম্য ছিল। এজন্য প্যালেস্টাইনের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর পূর্ণ সমর্থন ছিল। যা তাঁর ছবিতে দেখা যায়। মুক্তিযুদ্ধের উপর করা জয়নুলের স্কেচ ও ড্রইংগুলিতে তিনটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে- পাকিস্তানীদের হিংস্র আক্রমণ, বাঙালি যোদ্ধাদের প্রতিরোধ এবং যুদ্ধের বীভৎসতা ও ধ্বংসলীলা।

পাকিস্তানীদের তিনি সরাসরি আঁকার চেয়ে এঁকেছেন মেটোনিমির মাধ্যমে, যেমন একটি উদ্যত বুট, যা নিরীহ কিছু মানুষকে পিষে দিতে চাইছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি এঁকেছেন তাদের শৌর্য বীর্য নিয়ে এবং যুদ্ধের বলি মানুষজনের ছবি আঁকায় জয়নুল বেশ স্পষ্ট। পাশাপাশি জয়নুলের ছবিতে আছে প্রাকৃতিক দূর্যোগ, নিসর্গদৃশ্য এবং আছে নানান পেশার নারী ও পুরুষের ছবি। প্রকৃতপক্ষে জয়নুল ছিলেন সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ একজন শিল্পী এবং সমাজবাস্তবতা ছিল তাঁর নান্দনিক চিন্তার ভিত্তি। এ শুধু কথার কথা ছিল না, বরং তা তাঁর শিল্পচর্চায় গতিশীলতা দিয়েছে।

জয়নুলের ভিতরে ক্রিয়াশীল ছিল একটি দ্বন্দ্ব এবং সেটি স্পষ্ট হয় তাঁর বিষয় নির্বাচনে, তাঁর শৈলীগত প্রাধান্য নির্ধারণে। তিনি প্রাচ্যবাদী চিন্তার মিস্টিক প্রকাশে কখনো আবিষ্ট হননি। কারণ তাঁর ভিতরের দ্বন্দ্বটি তাতে মেটার সম্ভাবনা ছিল না। বাস্তবতার একটি চর্চায় বরং সেটি সম্ভব ছিল। এবং এই দ্বন্দ্বটি ছিল তাঁর মানুষ হিসেবে একটি অবস্থান গ্রহণ এবং শিল্পী হিসেবে একটি অবস্থান গ্রহণের মধ্যে।

শিল্পী কি পারেন, তাঁর একান্ত নিজস্ব নন্দনচিন্তায় মগ্ন হয়ে সৃষ্টিশীলতায় প্রকট বাস্তবতা কখনো হানা দিবে না, অথবা দিলেও তার প্রকাশটি হবে বড়োজোর নমিত এবং সংযত? নাকি একজন শিল্পী অবতীর্ণ হবেন একজন যোদ্ধার ভূমিকায়? নাকি একটি মধ্যবর্তী পথ রয়েছে যেখানে শিল্পীর চিন্তা ধারণ করবে একই সঙ্গে সমাজবাস্তবতা এবং নন্দনচিন্তার প্রগাঢ় উৎসার- এবং একটি প্রভাবিত করবে অন্যটিকে? জয়নুলের ছবি দর্শককে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেয়।

জয়নুলের ছবিতে দরিদ্র মানুষের কষ্টের জীবন বহুবার বিধৃত হয়েছে, কিন্তু কোন করুণা সঞ্চারিত হয়না ছবিগুলোতে, যেন তাদের করুণা করা হোক, দরিদ্র মানুষ তা চায় না। বরং ক্রোধেরই সঞ্চার হয়। দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা এক একটি আয়নার মতো, যাতে ধরা পড়ে যত না মৃত্যু, ক্ষুধা এবং বঞ্চণার ছবি, তার থেকে বেশি মানুষের শঠতা এবং লালসার চিত্র, এবং সেসব চিত্রে আমরা নিজেদেরই দেখি হঠাৎ করে। এমনকি মনপুরা বা ঘূর্ণিঝড়ের স্ক্রলচিত্রেও দর্শক করুণা করার সুযোগ পান না মৃত মানুষদেরকে। সেসব ক্রল তাদের বিশালতা নিয়ে জীবনেরই এক একটা প্রতীক হয়ে দাড়ায় এবং আমরা তাদের ভিতরে প্রবেশ করি।

জয়নুল বাস্তবকে পড়েছেন একজন নিবিষ্ট পড়ুয়ার মতো। তাঁর এই পঠনে সমাজের নানা উত্থান-পতন, ইতিহাস এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ছিল। তিনি পরাধীন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ছাত্র-জনতার নানা আন্দোলনকে সামনে থেকে দেখেছেন। তিনি সচেতন ছিলেন বিভিন্ন কৃষক আন্দোলন সম্পর্কে এবং তার সহানুভূতি ছিল নিম্নবর্গীয় সেই সংগ্রামী মানুষগুলোর প্রতি, ছিল সমর্থন ও শ্রদ্ধা।

ফেরিঘাটে অপেক্ষমান উদাসীন মানুষ ও ছেলেটি থেকে বন্দুক হাতে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধা; প্রসাধনরত মহিলা থেকে জলকে চলা গৃহবধূ- সবাই তাঁর রাজনীতির কুশীলব। কারণ তারাই তাঁর দেশের ও সময়ের রূপকার। কিন্তু তিনি কোনো সহজ সমাধানে বিন্যস্ত করতে চাননি তাদের জীবনকে, কোনো আশাবাদী চেতনার আবরণে আড়াল করতে চাননি তাদের জীবনযাপনের কষ্ট এবং সংগ্রামকে। বরং তিনি জোর দিয়েছেন তাদের বাস্তবতার উপর, যে বাস্তবতা একসময় তাদের অন্তর্গত সৃজনশীলতাকে জাগিয়ে তুলে তাদেরকে নিজেদের একটি গন্তব্যে নিয়ে যাবে।

প্রচন্ড শক্তিশালী এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল এক শিল্পী জয়নুল আবেদিন। শিল্পকলাকে কখনই তিনি সাধারণ জীবনের বাইরের কোনো বিষয় বলে গণ্য করেননি। ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ – এমন আদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না জয়নুল আবেদিন। আবার প্রোপাগান্ডা আর্টেও তিনি বিশ্বাস করতেন না। শিল্প জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, এটাই ছিল তাঁর দর্শন। তাঁর কাছে শিল্প হচ্ছে জীবনেরই এক প্রকাশ আর এর উদ্দেশ্য হলো মানবসমাজকে সমৃদ্ধ ও সুন্দর করে তোলা।

তাঁর নিজের মুখের কথাই তাঁর জীবনদর্শন ও শিল্পচিন্তার পরিচায়ক। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে শিল্পকর্ম করে যতটা আনন্দ পাই তার চেয়ে বেশি আনন্দ পাই শিল্পকে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে দেখলে, আমার নিজের শিল্পকে জীবনে প্রবিষ্ট হতে দেখলে। ছবি আঁকার সাফল্যের চেয়ে আমি তৃপ্তি পাই আরো অনেকে ছবি আঁকতে পারবে এমন একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করার প্রচেষ্টায়। কেননা এখান থেকে জন্ম নেবে সুন্দরের নির্মাতারা, এখান থেকে জন্ম নেবে সুন্দরের চিন্তা ও সুন্দর। আমি একটি সুন্দর বা মহৎ ছবি এঁকে আর কতদূর কী করতে পারব। ‘শিল্পকলা শুধু শিল্পকলার জন্য’, এ ধরনের বিশ্বাস আমার নয়। আমি বিশ্বাস করি শিল্পকলা মানুষের জন্য। তার জীবনকে সুঠাম ও সুন্দর করার জন্য। প্রকৃতি, মানুষ, জীবন সবকিছু যখন এক হয়ে যাবে তখনই সম্ভব হবে সবচেয়ে সুন্দরের সৃষ্টি। সেই অবস্থায় আমাদের পৌঁছুতে হবে, সকল মানুষকে, সারাবিশ্বের মানবসমাজকে। বাঙালি জাতিকেও এই অবস্থায় পৌঁছুতে হলে সকলকে সুন্দরের মর্ম বোঝাতে হবে, শিল্পকলার চর্চা সেজন্যই সর্বজনীন করা একান্ত বাঞ্ছনীয়। তার জন্য জাতীয় চিত্রশালা, জাতীয় লোকশিল্প জাদুঘর ইত্যাদি প্রয়োজন। চাই সর্বস্তরে শিল্পশিক্ষা। অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য যেমন কাম্য তেমনি কাম্য হওয়া উচিত সুন্দর রুচিশীল ও সৎ জীবন, শৈল্পিক জীবন। আমি বারবার বলি, আমাদের বর্তমান দুর্ভিক্ষ ততটা ভাতের নয়, যতটা রুচির দুর্ভিক্ষ। একে দূর করতেই হবে। হয়তো অর্থনৈতিক দারিদ্র্য এবং রুচির দারিদ্র্য সমান্তরালভাবে অগ্রসর হয়। সেক্ষেত্রে আমাদের সংগ্রাম ঐ উভয় দারিদ্রের বিরুদ্ধেই হওয়া উচিৎ। আমি সুন্দর প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অন্যতম সৈনিক মাত্র।’

আবেদিন আজীবন রেখাঙ্কনে এবং কম্পোজিশনে তাঁর যৌবনকালের বোধ ও স্বভাবকে ধরে রেখেছিলেন। পাশ্চাত্য শিল্প-ব্যাকরণ তাকে প্রভাবিত করতে পারেনি। এমনকি তিনি বিদেশী রংও ব্যবহার করতে চিইতেন না, প্রয়োজনে সম্পূর্ণ দেশজ উপাদান দিয়ে রং তৈরি করে নিতেন। নতুন নতুন আঙ্গিক,  বর্ণ প্রয়োগে নব নব বিভা এবং ডিজাইনের বিভিন্ন প্রকার ‘বিভঙ্গ’ আবেদিনের সৃষ্টিতে আমরা পাই না। কিন্তু তিনি শিল্প সাধনায় সব সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তরুণ শিল্পীদের উৎসাহিত করেছেন। তার শিল্পের সম্পূর্ণ বিরোধী আঙ্গিককেও তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। তার ঔদার্য ও সমর্থনে আমাদের দেশে নতুন নতুন শিল্পভঙ্গী জন্ম নিয়েছে। তিনি বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চার জনক এবং এখনো পর্যন্ত এদেশের চিত্রকলার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী।

বি: দ্র:  লেখাটি জয়নুল আবেদিনের চিত্রকলা বিষয়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সৈয়দ আলী আহসান, নজরুল ইসলাম, মইনুল ইসলাম জাবের ও মাহমুদ শফিকের লেখার সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন :

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সাক্ষাৎকার

জয়নুল আবেদিনের চিত্রকলা দেখুন।

Facebook Comments
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।