ভিনসেন্ট ভ্যান গগ

share on:
ভিনসেন্ট ভ্যান গগ

ভিনসেন্ট ভ্যান গগ বিশ্বখ্যাত ওলন্দাজ চিত্রশিল্পী। রুক্ষ সৌন্দর্য, আবেগময় সততার প্রকাশ ও সপ্রতিভ রঙের ব্যবহারে তার ছবি ছিল একেবারেই ভিন্নধারার। তার আঁকা চিত্রগুলো বিংশ শতাব্দীর শিল্পকলায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখেছিল। তার কাজ পরবর্তীকালের চিত্রকরদের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে।

তিনি পোস্ট-ইমপ্রেশনিজমবাদী চিত্রশিল্পীদের মধ্যে অন্যতম। প্রতিকৃতি, প্রাকৃতিক দৃশ্য, সূর্যমুখী ফুল, গমের ক্ষেত ইত্যাদি তার আঁকার বিষয়বস্তুর মধ্যে ছিল।

ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গগ হল্যান্ডের গ্রোট জুনডার্টে ১৮৫৩ সালের ৩০ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। পাদ্রী থিওডর ভ্যান গগ ও কর্নেলিয়া দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান তিনি। ছোটবেলা থেকেই একা একা ঘুরে বেড়াতেন। তার লেখাপড়া নিয়ে খুব একটা জানা যায় না। ১২-১৩ বছর বয়সে প্রথম আঁকতে শুরু করেন। এ সময়ে মূলত পেন্সিলে ড্রইং করতেন। তার এক চাচা ছিলেন হেগের আর্ট ডিলার। তিনি প্যারিসের বিখ্যাত গোপিল অ্যাণ্ড কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করতেন। ১৬ বছর বয়সে তিনি এ অফিসে যোগ দেন। এ প্রতিষ্ঠানের হয়ে ব্রাসেলস ও লন্ডনে কাজ করেন।

১৮৭৬ সালে একটি স্কুলে অবৈতনিক সহকারী পদে চাকরি নিয়ে আবার লন্ডনে ফিরে আসেন। তার ওপর দায়িত্ব পড়ে শহরের দরিদ্রতম এলাকার ছাত্রদের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ের। তখন তিনি লন্ডনের হতদরিদ্র মানুষের জীবন খুব কাছ থেকে দেখেন। কয়েক মাস পরই তাদের কাছ থেকে বকেয়া আদায় করতে না পারায় চাকরিচ্যুত হন।

এরপর পাদ্রি হওয়ার জন্য পড়তে যান হল্যান্ডে। এক বছর পর পড়ায় ইস্তফা দেন। পাদ্রি হিসেবে যোগ দেন বেলজিয়ামের এক কয়লা খনিতে। তখন বয়স ২৫। এখানে দেখলেন আরও বিভৎস দরিদ্রতা। শ্রমিকদের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিলেন। তার আবেগ কর্তৃপক্ষের পছন্দ হলো না। তাই চাকরি হারাতে হলো। কর্মহীন অবস্থায় সেখানে দুই বছর থেকে আঁকেন খনি শ্রমিকদের ছবি।

দেশে ফিরে বাবা-মার সঙ্গে থাকতে লাগলেন। আঁকলেন অসংখ্য ছবি। কিন্তু একদিন বাবার সঙ্গে ধর্ম নিয়ে প্রচণ্ড তর্ক হয়। এর জের ধরে ১৮৮১ সালের ক্রিসমাসের দিন হেগের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে এক সময় অর্থাভাবে এক পতিতার সঙ্গে মিলে ঘর ভাড়া করে থাকতেন। হেগে এসে ভ্যান গগ পরিচিত হন আরেক বরেণ্য শিল্পী মভঁ-এর সাথে। মভঁ ভ্যান গগকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। গগকে যে স্বল্প ক’জন মানুষ ছবি আঁকার ক্ষেত্রে প্রেরণা দিয়েছিলেন, তাঁর মধ্যে মভঁ অন্যতম। কিন্তু এই শিল্পীর সাথেও গগের সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

১৮৮৪ সালে আবার দেশে ফিরে আঁকতে থাকেন কৃষকদের ছবি। এ সময়ই তাঁর হাতে আঁকা হয়ে যায় বিখ্যাত ছবি ‘দি পটেটো ইটার্স’ বা ‘আলু খাদকেরা’। এক বছরের মাথায় বাবা মারা গেলে দেশত্যাগ করেন। এর পর আর কখনই ফিরেননি। ছবি আঁকার নিয়ম-কানুন শিখতে বেলজিয়ামের এন্টর্প একাডেমিতে ভর্তি হন। কিন্তু প্রথম টার্ম শেষ হওয়ার আগেই একাডেমি ছাড়েন।

এবার ঠাঁই হয় প্যারিসে মোল্টমার্টে ছোট ভাই থিওয়ের কাছে। প্যারিসের উত্তরে পাহাড়ের উপরের এই অঞ্চল ছিল বিশ্ব চিত্রকলার অন্যতম কেন্দ্রভূমি। এখানে থেকে ফানার্ড করমনের স্টুডিওতে কাজ নেন। একই স্টুডিওতে কাজ করতেন পরবর্তীকালের বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী তুলজ লোত্রেক এবং এমিলি বানার্ড। কয়েক মাস পর তারা এ স্টুডিও ছেড়ে দেন। ইতোমধ্যে থিওয়ের মাধ্যমে চিত্রশিল্পী ক্যামিলো পিসারো এবং পল গঁগ্যার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। গঁগ্যার সঙ্গে তার ঘনিষ্টতা হয় আবার বিচ্ছেদও ঘটে।

১৮৮৮ সালের ফেরুয়ারি মাস থেকে দক্ষিণ ফ্রান্সের মার্সেল প্রদেশের আর্লেসে বসবাস শুরু করেন। তার আমন্ত্রণে অক্টোবরে গঁগ্যা আর্লেসে এলেন। কিন্তু বিবাদ তাদের পিছু ছাড়ে না। বিবাদের একপর্যায়ে গগ নিজের কান কেটে নেন। এ ঘটনার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। রক্তস্বল্পতা এবং হ্যালুসিনেশনে ভুগতে থাকেন। হাসপাতালে দুই সপ্তাহ চিকিৎসা শেষে ঘরে ফিরে দিনরাত ছবি আঁকতে থাকেন।

ভ্যান গগের শিল্পী জীবনের আর্লেসের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এখানে এসেই গগের ‘ইয়েলো প্রিয়ড’ শুরু হয়। হলুদের রঙের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা ছিল তাঁর। তিনি মনে করতেন, অন্য সব রঙের চেয়ে হলুদ রঙটা একটু ভিন্ন। আর্লেসে গগ যে বাড়িতে থাকতেন সে বাড়ির দেয়াল ছিল হলুদ। এখানে থাকা অবস্থাই তিনি আঁকেন তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকর্ম ‘সানফ্লাওয়ার্স’। ‘সানফ্লাওয়াস’ পৃথিবীর সবচেয়ে দামী চিত্রকর্মগুলো মধ্যে একটি। বর্তমানে এই ছবিটির বাজারমূল্য ৭৪ মিলিয়ন ডলার। ১৮৮৮ সালে এই ছবিটি এঁকেছিলেন গগ।

গগ নিজে প্রকাশবাদী শিল্পীদের কাতারে নিজের নাম কখনোই লিখান নি। তবে এটাও সত্য, তাঁর চিত্রকর্মে আমরা প্রকাশবাদী শিল্পীদের আচরণ লক্ষ্য করে থাকি।

এসময় আর্লেসের ৮০ জন বিশিষ্ট নাগরিক তাকে শহর থেকে সরিয়ে দিতে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানান। এরপর গগ নিজেই ভর্তি হন সেন্ট রেমির মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে। এই মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে ২০০ ছবি আঁকেন। এরই মধ্যে তার জীবনের একমাত্র সুসংবাদটি পান। ১৮৯০ সালে ব্রাসেলসের এক প্রদর্শনীতে তার আঁকা আর্লেসের আঙুরক্ষেত ছবিটি বিক্রি হয় ৪০০ ফ্রাঁতে। জীবদ্দশায় এ একটি মাত্র ছবিই বিক্রি হয়েছিল। একটু সুস্থ হতেই থিও তাকে প্যারিসে নিয়ে এলেন। এর কিছুদিন পর চলে গেলেন অভঁরোতে।

তাঁর আঁকা ‘দি পটেটো ইটার্স’ বা ‘সানফ্লাওয়ার্স’ই কেবল বিখ্যাত হয়নি, পাশাপাশি ‘স্টারি নাইট’, ‘প্রোট্রেট অব ডাঃ গেচেট’, ‘সরো’, ‘বেডরুম ইন আর্লেস’ও কালকে জয় করে কালজয়ী হয়েছে। গগের আত্মপ্রতিকৃতিগুলোও কম গুরুত্ববহ নয়। তিনি ৩০টির মতো আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছিলেন।

‘দি পটেটো ইটার্স’ ছবিতে ফুটে উঠেছে শ্রমজীবী মানুষের কথা। ছবিতে দেখা যায় চারজন মানুষ রাতে মৃদু আলোতে আলু খাচ্ছে। অর্থাৎ আলু খেয়ে তারা তাদের রাতের আহার সারছে। ছবির মানুষগুলোর বিষন্নতা এবং একই সঙ্গে আত্মতৃপ্তি আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না।

‘স্টারি নাইট’ আঁকা হয় ১৮৮৯ সালে। বর্তমানে এই ছবিটি নিউইয়র্কের আধুনিক আর্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। ছবিতে দেখা যায় নক্ষত্রখচিত আকাশকে। এখানে শিল্পী তারা আঁকতে হলুদ রঙের ব্যবহার করেছেন। ‘স্টারি নাইট’-এ আমরা রহস্যময় আকাশকে আরো রহস্যময়ভাবে ক্যানভাসে উপস্থিত হতে দেখি।

তিনি ২১০০’র বেশি চিত্রকর্ম এঁকেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ৮৬০টি তৈলচিত্র। ১৩০০’র বেশি জলরঙের কাজ, ড্রইং, স্কেচ ও প্রিন্ট। আত্মপ্রতিকৃতিসহ তার আঁকার বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে- প্রকৃতি, স্টিল লাইফ, চিরহরিৎ বৃক্ষ, গমের ক্ষেত ও সূর্যমুখী। তার আঁকা অতিপরিচিত ছবির মধ্যে রয়েছে- স্টেরি নাইট, সানফ্লাওয়ার্স, বেডরুম ইন আর্লেস, প্রোট্টেট অব ড. গ্যাচে ও সরো। ‘ভিনসেন্ট ভ্যান গগের চিঠি’ নামে তার লেখা চিঠির একটি সঙ্কলন বাংলায় অনুদিত হয়েছে।

ভ্যান গগ স্বপ্ন দেখেছিলেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের নিয়ে একটি কলোনি হবে। সেখানে শিল্পীরা একত্রে থাকবে, তাদের চিন্তার কথা বলবে। ছবি আঁকার জন্যে উপযুক্ত পরিবেশ থাকবে সেই কলোনীতে।

ভ্যান গগ শিল্পী হিসেবে অনেককেই জীবিতাবস্থায় প্রভাবিত করতে পারেননি। এমনকি নিজের চিত্রকর্ম নিয়েও তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল না। সমালোচনা ও অবহেলা পেতে পেতে গগ জীবন থেকে যেন বাদ পড়ে গিয়েছিলেন। যেসব শিল্পী মৃত্যুর পর অপরিমেয় খ্যাতি পেয়েছেন, ভ্যান গগ তাদের দলে নাম লেখানো মানুষ। মৃত্যুর পর তাঁর সৃষ্টিকর্মই তাঁকে বিশ্বের মহান শিল্পী করেছে, করেছে বিশ্বজয়ী। মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে সিনেমা যেমন হয়েছে, তেমনি অনেক বরেণ্য কবিও তাঁকে নিয়ে লিখেছেন অনবদ্য কবিতা। এসব কবিতায় কখনো গগের দুঃখবোধকে আবার কখনো গগের চিত্রকর্মকে তুলে ধরা হয়েছে।

মৃত্যুর কিছুদিন আগে গগ এক চিঠিতে ছোট ভাই থিওকে লিখেছিলেন, ‘নিজেকে সাবধানে বাঁচিয়ে চলার কোনো ইচ্ছে আমার নেই, কোনো অসুবিধে বা আবেগ আমি এড়িয়ে যেতে চাই না। কম বাঁচি বেশি বাঁচি, তাতে কোনো পরোয়া করি না; তাছাড়া একজন ডাক্তার যেভাবে শরীরের যত্ন নিতে পারে, সেভাবে করার ক্ষমতাও আমার নেই।’

এ কথা থেকে স্পষ্ট যে, জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছিল গগের। সঙ্গে সঙ্গে এই বিতৃষ্ণার কারণ যে অর্থদৈন্য তাও স্পষ্ট। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তিনি লিখেছেন, ‘আমি এখনো দারুণ দুঃখভারাক্রান্ত। তোমার ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, সে ঝড়ের ঝাপটা প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছি আমি নিজেও। এমনিতে আমি খুব হাসিখুশি আর মিশুক একজন মানুষ হয়ে থাকতে চাই। কিন্তু আমার জীবনও এখন আপাদমস্তক আক্রান্ত। আমার পদক্ষেপ ভারি হয়ে আসছে।’

১৮৯০ সালের ২৭ জুলাই রাতে নিজের বুকে গুলি করেন। এ অবস্থায় সারারাত শুয়ে শুয়ে খালি পাইপ টেনে গেলেন। অবশেষে ২৯ জুলাই রাত ১টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : নভেরা আহমেদ : বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক ভাস্কর।

Facebook Comments