সুহিতা সুলতানার কবিতা

share on:
সুহিতা সুলতানা

আত্মহত্যার আগে

আত্মহত্যার আগে আমি অন্তত তা‌কে একবার দেখ‌তে চাই
এই দীর্ঘ লকডাউ‌নের ম‌ধ্যেও মানু‌ষের কো‌নো প‌রিবর্তন নেই
আত্মহত্যার ভেত‌রেই না‌কি সকল শা‌ন্তি নি‌হিত। নিস্তরঙ্গ
জ‌লের ভেত‌রে নিষ্প্রভ হ‌য়ে আছে মায়া! অমীমাংসিত দিন
ও রা‌ত্রির কা‌ছে লু‌টি‌য়ে প‌ড়ে‌ছে তাবৎ বিস্ময়! উজানের ঢল
গড়িয়ে গড়িয়ে যায়, সর্বত্র বৈরী হাওয়া। কতদিন দেশ ও
দশের কাছে মুখোশ ফেরি করবে সেই সর্বভুক? আম্পানও
শুষে নিল মাটির গুণগত মান ,ক্ষয়ে যাচেছ লবনাক্ত স্বাদ
ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার ক্রমশ ভেঙে দিচেছ লকডাউন
নোতুন একটি পৃথিবীর অপেক্ষায় সবাই এখন ক্লান্ত প্রাণ
এক। রাতের অন্ধকারে বরষার ক্রন্দন নিমগ্নতার জলে
বিমূর্ত ও বধির হয়ে অনুভূতির সৌরভে অন্তিম আগুন
হয়ে ঢেউ তোলে অপার মহিমায়। এক গভীরতর ভাবনা
থেকে আমি যখন কবিতা লিখি ল্যাপটপের স্ক্রিনে তুমি
হামাগুড়ি দিয়ে বসো; এতটা বজ্রধ্বনি ডিঙিয়ে তোমার কী
এমন প্রয়োজন? অনর্থক অনিরাপদ দূরত্ব ডিঙিয়ে তুমি
হাওয়ায় ভেসে বেড়াও! এই ঘোরতম দিনে নিলামে চড়িয়ে
দিও না হৃদয়… শাওন ঘন বরষায় সুতীব্র বিষাদে কেঁপে
ওঠে অদৃশ্য মৃত্যু ও শূন্যতা। রীতির উৎসবে হে অগ্নিশ্বাস
তোমার পুনর্জন্ম হোক ;এখন মধ্যরাত্রিতেও জেগে থাকে
নোতুন শহর আর আমি ‘উদয়াস্ত আত্মহত্যা চিন্তা’কে নীল
রুমালে ভোরের হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছি ধ্রুপদমগ্নতায়

২৭ মে ২০২০
সেন্ট্রাল রোড,ঢাকা।

ক‌রোনাকা‌লের ক‌বিতা ৭

পেছ‌নে ছিল বাঁচার বিশ্বাস রৌদ্রভরা মুখ
এখন যেদিকে যাও সবদিকে মৃত্যুভয়
বদলে গেছে মানুষের মন ও পথের স্বপ্ন
সারাটা শহরের কোথাও একরত্তি আলো
নেই । সন্দেহের নদীতে ভেসে যাচেছ
কর্তিত হৃদয়।চিন্তার ঘরে যার মরীচিকা
থরথর সে কী কখনো আমাদের ছিল?
স্মৃতি বিস্মৃতির পরিক্রমায় বর্ণ ও ধ্বনির
মধ্যে শৃঙ্খলিত অন্তিম আগুন নিভে
গেলে হৃৎপিণ্ডের ওপরে উড়তে থাকে
ধূসর ছাই । কে কার অস্তিত্ব বিপন্ন করে
এই করোনাকালে? চেয়ে দেখি এই ধ্বংসের
কালে সে নিঃশেষ হতে হতে মৃত্যুপ্রাণ এক
সংকটে ও সমাধানে কোথাও কেউ থাকেনা
শুধু জেগে থাকে করোনার বিষযুক্ত ভোর
ক্রমশ স্বপ্নগুলি কার প্ররোচনায় সংক্রমিত
হতে থাকে কেউ তা জানে না ! সর্বনাশ
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। হুহু ক্রন্দনের
শব্দে অন্তহীন নিঃশ্বাস। প্রেমের মৃত্যু হলে
বিচেছদও সুবাস ছড়ায়,মৃদঙ্গ ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়

২৯ মে ২০২০
সেন্ট্রাল রোড , ঢাকা।

বহু দূরের অন্ধকার

চো‌খ থেকে ঘুম চ‌লে গে‌লে বহু‌ দূ‌রের অন্ধকার মৃত্যুর ম‌তো
পাশ ঘে‌ষে ব‌সে। লকডাউ‌নের দিনগু‌লি‌তে ‘দূরত্ব’ উল্লাস
‌নি‌য়ে অনিবার্য হ‌য়ে উ‌ঠেছে । একদা নীলদিগন্তের পটে যে
ছবি এঁকেছিলে তখন ঘুমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতো নগরী
এখন করোনার পায়ের নিচে পিষ্ট হচেছ মস্তিস্ক ও হৃদয়
কি আশ্চর্য অভিজ্ঞান এতদ্রুত কারো মূল্যবোধে মরীচিকা
জমে ? যারা স্বার্থান্বেষী হয়ে দিকভ্রান্ত হয় এই বিষণ্ন
রজনীতে আমার তির্যক ভাবনা থেকে পুঞ্জিভূত সব
ঘৃণা তাকে দিলাম। অজস্র খণ্ডিত হিল্লোলিত ভোরের
সৌন্দর্য আমাদের ছিল, ধর্মান্ধ উণ্মাদনা সব লণ্ডভণ্ড
করে দিয়েছে। বিস্রস্ত আয়নায় যেটুকু দেখা যায় কৃত্রিম
কাঁচপাত্রে মানিপ্ল্যান্টের অট্টহাস্য বিস্রুত হতে থাকে
বিষুবরেখা বরাবর বিসরণ বিসংবাদী হয়ে যুক্ত হয়
হাইফেন। জীবন যেন একটি নাটকের আবশ্যিক পাঠ
বিনিময়, প্রকৃতির নির্দয় আলিঙ্গন, বিস্তৃত স্রোতের সঙ্কট

২৬ মে ২০২০
সেন্ট্রাল রোড,ঢাকা।

পাথর ও বৃক্ষের নিচে

এখন ঘুমন্ত নগরী‌তে আতঙ্ক উড়ে উড়ে ছোবল উঁচায়
যে আগুন ও জলের মর্মার্থ বোঝে না সে ধর্মের পূর্ণতা
কীভা‌বে বো‌ঝে? এভাবে ব্যাকরণহীন অপৃষ্ঠার অঘ‌ুমের
গল্প হারানো নদীর স্রোত হয়ে মধ্যরাতে মুখোমুখি বসে
আমরা কখনো কী কেউ কারো ছিলাম হয়ত না অথবা
হ্যাঁ। প্রযুক্তির বদৌলতে বিলুপ্ত স্মৃতিভ্রষ্ট সুবৃহৎ খণ্ডিত
ইতিহাস ম্যাজিক হয়ে করোনাকালে হৃদয় কেটে কেটে
রক্তের নদী হয়ে যায়।বৈশ্বিক দূরাবস্হারকালে বহুতর
সর্বনাশ গোধূলিলগ্নে ঘ্রাণহীন পড়ে থাকে কুসুমিত
ভোরে। ভোরের হাওয়ায় বিগত পুষ্পঘ্রাণ শিহরিত
হলেও মৃত হরিণের মতো পড়ে থাকে প্রেম ও পিপাসা
পাথর ও বৃক্ষের নিচে ভালুকের নিঃশ্বাস অবিশ্বস্ত করে
তোলে বন্ধুর কৃত্রিম জঙঘায়। অবরুদ্ধ খিলান খুলে
দেখি কোথাও কেউ নেই কেবল বিষণ্ন হয়ে বসে
আছেন জাঁ আর্ত্যুর র‌্যাঁবো, ‘নরকে এক ঋতু ’র
বহু বর্ণিল দ্রাঘিমায় পাপ ও পতনের দুর্দশা বিভ্রান্তির
মধ্যে নিয়ে যায়। যা ছিল দুর্বোধ্য ও ঈশ্বরবিরোধিতা
প্রতীক্ষার নেশায় যে বুদ হয়ে থাকে সবটুকু আলোকখণ্ড
তার প্রাপ্য।বুকের ভেতরে বেজে ওঠে মৃদঙ্গ
বৃক্ষের ক্রন্দন। নীলদিগন্তের চিত্ররেখা আশ্চর্য
আয়নায় প্রজাপতি হয়ে আবর্তিত হতে থাকে ঘরময়
২৫ মে ২০২০
সেন্ট্রাল রোড,ঢাকা।

অনিদ্রার লবণাক্ত প্রহর

খুব জ‌টিল ও দ্বিধাগ্রস্হ সম‌য়ের ওপর খড়গ হ‌য়ে ব‌সেছে
স্মার্টফোন। কতদ্রুত অশ‌ব্দের অন্ধকার পা‌খি‌দের শেকড়
ধ‌রে উপ‌ড়ে ফে‌লে‌ছে দীর্ঘশ্বাস! প্লাবনে ভেসে গ্যাছে স্বপ্ন
ও চিন্তার ঘর । বিমর্ষ পৃথিবীর উপকণ্ঠে দাঁড়িয়ে দেখছি
মানুষের দুর্মতি আর দুরাত্মার ধ্বনি। হৃদয় বিদীর্ণ করে যে
দুর্মুখ পোশাকের জীর্ণতা উলঙ্গ করে তোলে প্রেক্ষাপট
সে কী কখনো মানুষ ছিল ? আজকাল চারদিকে ধর্মের
নামে ভণ্ড ঋষিদের ঘৃণ্য মুখ প্রকট হয়ে উঠেছে। যারা
বোধ ও বিবেক বিক্রি করে উল্টে দেয় ‘রেমসিভির’গুরুত্ব
আম্পানকে রোমান্টিক সঙ্গী ভেবে ল্যাম্পপোস্টকে
প্রেমময় করে তোলে তারা দেশদ্রোহী, মাতাল পুরোহিত
এখন মৃত্যু দীর্ঘতা বোঝেনা অস্বপ্নের দাহ ও অস্হিরতা
বোঝে। অনিদ্রার লবণাক্ত প্রহর কর্দমাক্ত করে তোলে
ঋতুর বৈভব ঝরে যাওয়া ঝাউপাতা, অপূর্ণ উপত্যকা

২২ মে ২০২০
সেন্ট্রাল রোড ,ঢাকা।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : সুহিতা সুলতানার করোনাকালের কবিতা

Facebook Comments
সুহিতা সুলতানা

সুহিতা সুলতানা

সুহিতা সুলতানা, দু’বাংলার জনপ্রিয় কবি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ (অনার্স), এমএ। বর্তমানে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উপপ‌রিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন। নিভৃতচারী এ কবি অনবরত অরণ্য পাহাড় সমুদ্রের মুখোমুখি অনন্তকাল বসে থাকতে চায়; স্পর্শ করতে চায় কুয়াশা শিশির বৃক্ষরাজি পত্রালী বনফুল মেঘপুঞ্জ। প্রিয় ভাষা বাংলা ভাষা। চর্চা করেন নরওজিয়ান, রুশ ও হিন্দী।