স্ট্যানলি কুবরিক : বিশ্বসেরা নির্মাতা

share on:
স্ট্যানলি কুবরিক

স্ট্যানলি কুবরিক আমেরিকান চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক। তাকে চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সৃজনশীল ও প্রভাবশালী নির্মাতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

কুবরিক ১৯২৮ সালের ২৬ জুলাই ম্যানহাটনের লাইং-ইন হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা জ্যাক লিওনার্ড কুবরিক ও মা জারট্রুডে। ইহুদি এই দম্পতির পেশা ছিল চিকিৎসা। ছেলেবেলা থেকে তিনি দাবা, ছবি তোলা ও জ্যাজ সঙ্গীতের অনুরক্ত ছিলেন। ড্রামার হিসেবে একটি ব্যান্ড দলে কাজও করেন।

পড়াশোনায় তিনি দুর্বল ছিলেন। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত উইলিয়াম হাওয়ার্প ট্যাফট স্কুলে পড়েন। ১৯৪৫ সালে হাই স্কুল পাস করার পর উচ্চশিক্ষা নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খারাপ রেজাল্ট ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফেরত ছাত্রদের চাপে উচ্চশিক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি।

হাই স্কুলে থাকতেই ছবি তোলার জন্য প্রশংসিত হন। স্কুলের অফিসিয়াল আলোকচিত্রীর সম্মান পান। ১৯৪৬ সালে কিছুদিনের জন্য সিটি কলেজ অব নিউইয়র্কে পড়েন। সে সময় ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার আগেই তার বেশকিছু ছবি লুক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। ওই বছরই লুক ম্যাগাজিনে শিক্ষানবিস আলোকচিত্রীর চাকরি পান। কিছুদিন পর তার চাকরিটা স্থায়ী হয়ে যায়। সে সময়ে (১৯৪৫-৫০) কুবরিকের তোলা অনেকগুলো ছবি ‘ড্রামা অ্যান্ড শ্যাডোস’ (২০০৫) বইটিতে প্রকাশিত হয়। ২০০৭ সালে প্রকাশিত ‘২০০১ : আ স্পেস অডিসি’র বিশেষ ডিভিডি সংস্করণেও কিছু ছবি স্থান পায়। লুক ম্যাগাজিনের জন্য তিনি প্রায় ৫-৬ হাজার ছবি তোলেন।

১৯৪৮ সাল থেকে তিনি প্রচুর সিনেমা দেখা শুরু করেন। মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে নিয়মিত যেতেন। এ ছাড়া নিউইয়র্ক সিটিতে মুক্তি পাওয়া কোনো সিনেমাই বাদ যেত না। এ সময় তিনি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হন জার্মান পরিচালক মাক্স ওফুলসের কমপ্লেক্স ও ফ্লুইড ক্যামেরার কাজ দেখে। তার সিনেমার ভিজ্যুয়াল স্টাইলের অনেককিছুই ওফুলস দ্বারা প্রভাবিত।

তার অধিকাংশ চলচ্চিত্রই বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যকর্মের অবলম্বনে নির্মিত। চলচ্চিত্রে নিখুঁত কারিগরি কৌশলের ব্যবহারসহ তিনি অনেক কারিগরি কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। তার চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো- খুব কাছ থেকে তোলা ক্লোজআপ। এ ছাড়া জুম লেন্স এবং উচ্চাঙ্গ যন্ত্রসঙ্গীতের ব্যাপক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। কোনো সিনেমার থিম মাথায় আসার পর তিনি গবেষণায় লেগে যেতেন। গবেষণার কারণে সিনেমা বানাতে লেগে যেত প্রায় ৪-৫ বছর। তার প্রায় চরিত্রই সমাজের একটা বৃহৎ অংশের প্রতিনিধিত্ব করলেও চরিত্র নির্মাণে তিনি এক্সপ্রেশনিস্ট ধারা মেনে চলতেন।

স্ট্যানলি কুবরিকের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৫০ সালে।  জমানো টাকা দিয়ে মুষ্টিযোদ্ধা ওয়াল্টার কার্টিয়ারকে নির্মাণ করেন ১৬ মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি। ‘ডে অব দ্য ফাইট’ নামের এই ডকুমেন্টারিতে কুবরিক একাধারে ডিরেক্টর, সিনেমাটোগ্রাফার, এডিটর এবং সাউন্ডম্যান হিসেবে কাজ করেন। এরপরই কুবরিক ‘লুক’ ম্যাগাজিনের কাজ ছেড়ে দিয়ে পুরোদস্তুর ফিল্মমেকার হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৫৩ সালে এক আত্মীয়র অর্থায়নে প্রথম মূলধারার চলচ্চিত্র ‘ফেয়ার অ্যান্ড ডিজায়ার’ নির্মাণ করেন।  এরপর তিনি বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে দুটি নিম্ন বাজেটের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানান। প্রকৃতপক্ষে এই সিনেমাগুলো তাকে চলচ্চিত্রকার হিসেবে প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। যদিও একসময় তিনি এই সিনেমাগুলোর কথা ভুলে যেতে চাইতেন। সিনেমা দুটির কারিগরি সব কাজ তিনি নিজেই করেছেন। পরিচালনা থেকে শুরু করে চিত্রগ্রহণ, শব্দ ধারণ ও সংযোগ, সম্পাদনা সবকিছু।

১৯৫৫ সালে তিনি উঠতি প্রযোজক জেমস হ্যারিসের সঙ্গে পরিচিত হন। এ সময় দুজনে মিলে একটি পুঁচকে গুণ্ডা দলের ঘোড়দৌঁড়ের টাকা ডাকাতির কাহিনী নিয়ে দ্য কিলিং সিনেমাটি বানান। এই সিনেমা ব্যবসায়িকভাবে বেশ সফল হয়। এই সিনেমা দিয়ে কুবরিক বেশ পরিচিতিও পান।

এরপর কুবরিক হামফ্রি কব এর উপন্যাস দ্য পাথস অফ গ্লোরি-র স্বত্ব কিনেন। আর ১৯৫৭ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে এমন এক সিনেমা নির্মাণ করেন, যা ইতিহাসের সবচেয়ে আপোষহীন যুদ্ধবিরোধী সিনেমাগুলোর একটিতে রূপান্তরিত হয়।

এরপর তিনি খ্রিস্টপূর্ব যুগের রোমান সম্রাজ্যে দাস বিদ্রোহ নিয়ে ‘স্পার্টাকাস’ সিনেমাটি বানান। তবে এই সিনেমার পরিচালনায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেননি তিনি। কারণ সিনেমাটিতে তার পাশাপাশি কার্ক ডগলাসও প্রযোজক ছিলেন। ‘স্পার্টাকাস’ ভালো হয়েছিল যদিও, তথাপি স্ট্যানলি কুবরিক শপথ নিলেন পূর্ণ শৈল্পিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা ছাড়া জীবনে আর কোনো সিনেমা বানাবেন না।

কুবরিকই একমাত্র পরিচালক যিনি হলিউডের স্টুডিওতন্ত্রের মধ্যে থেকেও সবচেয়ে স্বাধীনভাবে সৃষ্টিশীল কাজ করার চেষ্টা করেছেন। এর মাধ্যমেই তিনি নিজেকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রকারদের সারিতে নিয়ে যান। প্রচেষ্টায় সফল হয়েছিলেন বলেই এক সময় তিনি তার সব সিনেমার ওপর পূর্ণ শৈল্পিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন।

তিনি মোট ১৬টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তার প্রায় সবগুলো সিনেমাই বিশ্ব চলচ্চিত্রে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছে। তিনি বিভিন্ন ধরনের ছবি বানিয়েছেন এবং প্রায় সবগুলোই যার যার জোনে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে।

কুবরিকের বিখ্যাত ছবি ‘২০০১: আ স্পেস অডিসি’। মানুষের তৈরি মারণাস্ত্র মানুষ খুনে ব্যবহার, আর যান্ত্রিক যুগে মানুষের নৈরাশ্যজনক বৈশিষ্ট্যতার পরিণতি নিয়ে এই ছবি বানান। স্পেস অডিসিতে তিনি হ্যাল নামক কম্পিউটারকে মানুষের ভঙ্গিতে কথা বলিয়ে যন্ত্রের মানুষে রূপান্তরিত হওয়ার আশা ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তা মানুষের নৈরাশ্যেরও কারণ ছিল। মানুষ, জীবন, যান্ত্রিকতা নিয়ে স্পেস অডিসি দর্শকদের এক দ্বান্দ্বিকতায় যেন ফেললো, সেখান থেকে কুবরিকই টেনে তুললেন দর্শকদের পরবর্তী সিনেমা ‘ক্লকওয়ার্ক’ দিয়ে। যদিও এই সিনেমায়ও নৈরাশ্যবাদী ব্যাপার ছিল। তারপরও এই সিনেমায় তিনি বলতে চেয়েছেন বিশ্বে টিকে থাকতে হলে মানুষকে তার মানবিকতা ধরে রাখতেই হবে। মানুষকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, নিজের বানানো যন্ত্রের ওপর কর্তৃত্ব করতে চাইলে মানুষকে আগে নিজের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি সিনেমা বানান তিনি। কুবরিক ‘দ্য শাইনিং’ নামে একটি হরর সিনেমাও বানিয়েছেন।

কুবরিক নির্মিত প্রামাণ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- ডে অব দ্য ফাইট (১৯৫১), ফ্লাইং পাদ্রে (১৯৫১) ও দ্য সিফেয়ারার্স (১৯৫৩)। পূ্র্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- ফিয়ার অ্যান্ড ডিজায়ার (১৯৫৩), কিলারস কিস (১৯৫৫), দ্য কিলিং (১৯৫৬), প্যাথস অব গ্লোরি (১৯৫৭), স্পার্টাকাস (১৯৬০), লোলিটা (১৯৬২), ড. স্ট্রেঞ্জলাভ অর : হাউ আই লার্নড টু স্টপ ওরিয়িং অ্যান্ড লাভ দ্য বম (১৯৬৪), ২০০১ : আ স্পেস অডিসি (১৯৬৮), আ ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ (১৯৭১), ব্যারি লিন্ডন (১৯৭৫), দ্য শাইনিং (১৯৮০), ফুল মেটাল জ্যাকেট (১৯৮৭) ও আইস ওয়াইড শাট (১৯৯৯)।

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে কুবরিক অনেক সম্মানজনক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৯৭ সালের মার্চে ‘দ্য ডিরেক্টরস গিল্ড অব আমেরিকা’র সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘ডিডব্লিউ গ্রিফিথ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ৫৪তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গোল্ডেন লায়ন অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন।

তিনি তিনবার বিয়ে করেছেন। তার স্ত্রীদের নাম টোবা মেটজ, রাথ সোবোটকা ও ক্রিশ্চিয়ান হার্লেন। তার দুই সন্তান- অ্যানিয়া কুবরিক ও ভিভিয়ান কুবরিক।

স্ট্যানলি কুবরিক ১৯৯৯ সালের ৭ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : আন্দ্রেই তারকোভস্কি : চলচ্চিত্রের বুদ্ধ

Facebook Comments