সত্যজিৎ রায় ও বাংলা চলচ্চিত্র : শেষ পর্ব

share on:
সত্যজিৎ রায়

সত্যজিৎ রায় নির্মিত ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রটি একটা প্রবল ভূমিকম্পের মত ভারতীয় চলচ্চিত্রের গৃহীত কাঠামোকে চূর্ণ করলো। পথের পাঁচালী যে নব বাস্তববোধ দর্শক ও সমালোচকদের হতবাক করেছিল তাই একদিন সত্যজিৎ রায়কে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তুলল।

নরেন মিত্রের লেখা অবতরণিকা ও আকিঞ্চন গল্প নিয়ে ১৯৬২ সালে সত্যজিৎ শুরু করলেন মহানগর ছবির কাজ। মাধবী মুখোপাধ্যায়কে আরতি চরিত্রের জন্য নেয়া হয়। ইতোপূর্বে মাধবী মৃণাল সেনের বাইশে শ্রাবণ এবং ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণ রেখা’য় অভিনয় করেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে উৎখাত হয়ে স্বপরিবারে মাধবী কোলকাতায় এসেছিলেন।

সত্যজিৎ যখন রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য রবীন্দ্রনাথকে সুক্ষ্মভাবে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। তখনই তিনি নষ্টনীড় গল্পের পান্ডুলিপিটা দেখেন। সেখানে পান্ডুলিপির মার্জিনে কবির হাতে লেখা ‘হেকেটি’ শব্দের উলে­খ ছিল। যারা রবীন্দ্রনাথের জীবনটা একটু ভালভাবে পড়েছেন। তারা নিশ্চয় জানেন, রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বন্ধুদের কাছে তাঁর স্ত্রী কাদম্বরী দেবী গ্রিক দেবী ‘হেকেটি’ নামে পরিচিত ছিল। সেই হিসেবে সত্যজিতের কাছে নষ্টনীড় গল্পটি রবীন্দ্রনাথের আত্মজীবনীর একাংশ বলে মনে হয়েছিল। বাংলা ১৩০৮ সালে ভারতী পত্রিকা নষ্টনীড় তিন সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৬৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নষ্টনীড় ছবির শু্যটিং শুরু হয়। সত্যজিৎ ছবিটির নাম প্রধান চরিত্রের নামের সাথে মিল রেখে রাখলেন চারুলতা।

নষ্টনীড় এর পান্ডুলিপি দেখে সত্যজিতের মনে হয়েছিল এই কাহিনীতে রবীন্দ্রনাথের এক গহন আত্মকথার অনুভূতি কিছুটা চিত্রিত হয়েছে। পান্ডুলিপিতে এক নারীর মুখের ছবি দেখে সত্যজিতের সেই ধারণা আরো বিশ্বস্ত হয়। তাঁর গভীর বিশ্বাস ছিল চারু আর কেউ নয়। তিনি হচ্ছেন কাদম্বরী দেবী নিজে আর অমল রবীন্দ্রনাথের যৌবনের প্রতিচ্ছবি। হয়তো বাংলার সমাজে চিরকালই এমন প্রচ্ছন্ন প্রণয় বহমান।

কিশোর কুমারের গলা সত্যজিৎ খুব পছন্দ করতেন। চারুলতা ছবির রবীন্দ্র সঙ্গীত, ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ কিশোর কুমারকে দিয়ে গাওয়াবেন বলে ঠিক করলেন। সত্যজিৎ কিশোরকে কলকাতায় আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তখন তিনি এত ব্যস্ত ছিলেন যে, মাসে একটি দিনও ফাঁকা ছিলেন না। বিব্রত কিশোর সত্যজিৎকে বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন বোম্বেতে যাওয়ার জন্য। সত্যজিৎ বোম্বেতে গিয়ে কিশোরের কণ্ঠে গানটি রেকর্ডিং করলেন। এই গানে পিয়ানো বাজিয়েছিলেন সত্যজিৎ নিজেই। দেশী—বিদেশী সুরের মিশ্রণের কথায় তিনি বলেছিলেন, ‘দ্য পসিবিলিটিজ অফ ফিউজিং ইন্ডিয়ান এন্ড ওয়েস্টার্ণ মিউজিক বিগ্যান টু ইন্টারেস্ট মি ফ্রম চারুলতা অন। আই বিগ্যান টু রিয়ালাইজ দ্যাট, অ্যাট সাম পয়েন্ট, মিউজিক ইজ ওয়ান।’

১৯৬৫ সালে সত্যজিৎ রায় নায়ক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য তৈরি করলেন। স্বভাবত উত্তম কুমার তখনই নির্বাচিত হলেন। এই ছবির জন্য উত্তম কুমারকে নির্বাচন করার খবর যখন বেরোল, তখন চারিদিকে এক শোরগোল পড়ে গিয়েছিল যে, সত্যজিৎ স্টার নিয়ে ছবি করার কথা বলে কে¤প্রামাইজ করছেন, অনেকে এমনও মন্তব্য করলেন যে, ‘সত্যজিৎ বাবু এবার পথে এসেছেন, এবার উত্তম কুমারকে নিয়ে ছবি করছেন।’ সত্যজিৎ অবশ্য নিজেই মনে করেন, … বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে উত্তম ছাড়া আর কেউ পারেনি, পুরুষদের মধ্যে তাঁকে একমাত্র স্টার বলা যায়। উত্তম কুমারকে সত্যজিতের ভাল লাগতো তাঁর চরিত্রের সাবলীলতা, ব্যক্তিত্ব আর অভিনয়ের জন্য।

মূলত উত্তম কুমারের কথা ভেবেই সত্যজিৎ নায়ক ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন। কারণ ছবিতে এমন এক অভিনেতার কথা বলা হয়েছে যে স্টার হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে গেছেন। উত্তমের কাছে সত্যজিৎ খুবই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। পরিচালক যা চেয়েছিলেন উত্তম হুবহু সেটাই করতেন এবং অধিকাংশ শট একবারে ওকে হয়ে যেতো। শু্যটিং এর সময় উত্তম কুমার লোকেশনে চুপচাপ বসে থাকতেন। তেমন কারো সাথে কথা বলতেন না। মনে হত ধ্যানস্থ হয়ে ভাবছেন কিভাবে সত্যজিৎ যা চাইছেন একেবারে সেটাই দেওয়া যায়। সত্যজিৎ বার বার বলতেন, ‘অনেকের সঙ্গে আমি কাজ করেছি, কাজ করে আনন্দও পেয়েছি। কিন্তু উত্তমের মতো কেউ নেই, উত্তমের মতো কেউ হবেও না।’ নায়ক ছবিতে বাংলা চলচ্চিত্রের মহাপরিচালকের সাথে মহানায়কের এক অদ্ভুত সমন্বয় ঘটেছিল।

নায়ক সম্পূর্ণরূপে উত্তম কুমার কেন্দ্রীক ছবি, তার উৎস, পরিণতি ও সাফল্যে তাঁর অবদান সত্যজিৎ সব সময় কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করেছেন। উত্তম কুমার সত্যজিৎ রায়ের পরের ছবি চিড়িয়াখানা—তেও অভিনয় করলেন। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিড়িয়াখানা কাহিনী অবলম্বনে এই ছবিতে উত্তম ডিটেকটিভ ব্যোমবেশ বক্সীর চরিত্রে অভিনয় করলেন। ছবিটির জন্য সত্যজিৎ রায় ১৯৬৮ সালে শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে ভারত সরকারের পুরস্কার পান।

চিড়িয়াখানা’র শু্যটিং চলাকালীন সময়ে পুত্র সন্দ্বীপ পিতার কাছে আবদার করলেন ছোটদের জন্য একটি ছবি তৈরি করার জন্য। সেই সময় উত্তম কুমারের অসুস্থতার জন্য বেশ কয়েকদিন শু্যটিং বন্ধ ছিল। সেই অবসরে সত্যজিৎ পুত্রের আবদার রক্ষার্থে ছোটদের ছবির চিত্রনাট্য নিয়ে ভাবতে লাগলেন। পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়ের কাহিনী থেকেই তিনি গুপী গাইন বাঘা বাইন নামে একটি ছোটদের ছবির এক ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই সময় ছবির বাজেট ছিল চার লক্ষ টাকা যা রীতিমত সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল। রাজস্থানের দুটি বিখ্যাত কেল­া দুই রাজার প্রাসাদ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। ইনডোরে এ ছবির জন্য বিশাল সেট দর্শকদের আশ্চর্য করে দিয়েছিল। আউটডোরের শু্যটিংগুলো হয়েছে বীরভূম, যোধপুর, জয়সলমির, বুন্দি ও কুফরি অঞ্চলে। যদিও শিশুদের জন্য ছবিটি তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু এর মধ্যে যে অন্তর্নিহিত অর্থ রাখলেন তিনি যা আমাদের প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি কটাক্ষ করে। অদ্ভুত আনন্দ দেওয়ার সাথে চিন্তিত দর্শকদের একটু গভীরতর বাণীও দিলেন সত্যজিৎ রায়। ছবিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোপী গাইন বাঘা বাইন ছবির উপস্থাপনায় মনে হয় এটির আবেদন কখনো শেষ হবার নয়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৬৯ সালে সত্যজিৎ রায় অরণ্যের দিনরাত্রি’র কাজ শুরু করেন। সত্যজিৎ রায়ের আধুনিক চলচ্চিত্র এটি। যার সময়কাল খুব সমসাময়িক। চার বন্ধু হঠাৎ কয়েকটি দিন একটু অন্য রকমভাবে কাটানোর জন্য শহর জীবনের নিজেদের ব্যস্ততা এড়িয়ে ছুটে যায় শান্ত প্রকৃতির কোলে। এই প্রকৃতির কোল সাধারণ সরল মানুষদের বাস। টাইটলস্—এ মাদলের ধ্বনি আর কয়্যার—এর মতো আদিবাসীদের উচ্চস্বর সঙ্গীতে যে তীব্র আনন্দের উন্মাদনা বা পত্র বহুল শাল অরণ্যের যে প্রাণচঞ্চল প্রতিশ্র“তি তার সঙ্গে বস্তুত এই চারটি চরিত্রের কোন যোগাযোগ ঘটে না। ফরেস্ট বাংলাতে পেঁৗছানোর সঙ্গে সঙ্গে ল্যান্ডস্কেপ পরিবর্তিত হয়। পাতা ঝরা শীর্ণ বৃক্ষরাজি আর শুকনো নদীর ধু ধু বালির চড়ায় রিক্ততা প্রকাশ হয়ে পড়ে। চার বন্ধুর জীবনের উন্মাদনা, হৈ চৈ, আনন্দ এবং অপর্ণার মত এক মেয়েকে বনের এমন নিরব পরিবেশের পাওয়ার আনন্দ দর্শকদের হয়তো ক্ষণিকের জন্য শহরের ছাঁচে ফেলা আনন্দের কাছে নিয়ে যায়, এই আনন্দের সাথে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নাচ গানের আনন্দ আরো অপরূপ ঘন অরণ্য পরিবেশের কথা মনে করিয়ে দেয় আমাদের। কিন্তু যখন হাটে বা চায়ের দোকানে বুভুক্ষু মলিন মুখ দেখা যায় তখন বুঝতে বাকি থাকে না এরা শুধু প্রাকৃতিক ঐ সম্পদের পাহারাদার। এগুলো ভোগ করার অধিকার তাদের নেই। বাংলোর চৌকিদার পরিবারের দুর্দশা অথবা অর্থ বিনিময়ে আদিবাসী মেয়ে দুলির ওপর হরিনাথের দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন এবং দুলিকে সুন্দর নগর জীবনের মিছে স্বপ্ন দেখিয়ে নিজের পাশবিকতাকে চরিতার্থ করার মধ্য দিয়ে পরিচালক আমাদের সামনে তুলে ধরেন শহরের এই ক্লেদাক্ত মানসিকতার কাছে কিভাবে অরণ্যের সরলতা লাঞ্ছিত হয়েছে। বলা হয়, অরণ্যের দিনরাত্রি থেকে সত্যজিৎ চলচ্চিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের শুরু। এমন হতে পারে এ চলচ্চিত্র তাঁর পরবতীর্ চলচ্চিত্রের কথামুখ, কিংবা সমসাময়িক কাল ও মানুষ সম্পর্কে কোন ট্রিলজীর প্রথম পর্ব। ছবিটি পাশ্চাত্যে যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছে। সত্যজিৎ নিজেই বলেছেন, ‘আমি মনে করি, অরণ্যের দিনরাত্রি এক যথার্থ বাংলা ছবি। আমি ভাবতেই পারিনি পশ্চিমের দর্শক এত সহজে এই ছবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাবে। এটা একদম বাংলা ফিল্ম।’

একই বছর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আরেকটি উপন্যাসের কাহিনী নিয়ে সত্যজিৎ রায় তৈরি করলেন প্রতিদ্বন্দ্বী ছবিটি। তাঁর নায়ক শিক্ষিত ও বেকার সিদ্ধার্থ চৌধুরী। সত্যজিৎ এমন একটি চরিত্রের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করলেন। ষাটের দশকের শেষে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছিল। শ্রেণী শত্র“ খতম রবে গজিয়ে উঠছে নকশাল আন্দোলন আর অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যে কোন্দল। এমন অবস্থায় সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রবল অস্থিরতায় যুবসমাজ দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য। কোলকাতা নগরী অশান্ত। এমন বিক্ষুব্ধ এক শহরের পটভূমিতে বর্তমান কালের এক নাগরিক যুবককে নিয়ে ঘুরতে থাকে এই ছবির গল্প। পূর্বের ছবিতে সত্যজিৎ রায় উপন্যাসের গল্প থেকে অনেকটা সরে এসেছেন, সেজন্য সুনীল ছবিটা দেখে খুশী হতে পারেননি। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী ছবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে সত্যিকারের সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল।

১৯৭২ সালের জুলাই—এ অশনি সংকেত ছবির শু্যটিং শুরু হল শান্তিনিকেতনের কাছেই ভাঙাপাড়া গ্রামে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে অবিভক্ত বাংলায় মনন্তর যে দুর্ভিক্ষের রূপ নিয়ে দেখা গিয়েছিল, সেই চিত্র। এ ছবিতে বাংলাদেশের চিত্রনায়িকা ববিতা অভিনয় করেন। দেশ ও কালের এক সুতীব্র সংকটের মুহূর্তে অশনি সংকেত তৈরি হল। ছিয়াত্তরের দেশ জোড়া আকাল, অগ্নিমূল্য ও কালোবাজারীদের সীমাহীন খেয়াল খুশীর আধিপত্য যখন সাধারণ মানুষ এক অসাধারণ ধৈর্যের পরীক্ষায় রত, তখন সত্যজিৎ রায় তাঁর চলচ্চিত্রে তেতালি­শের দুর্ভিক্ষের পদধ্বনির কথা শোনালেন। যে দুর্ভিক্ষের পেছনে কোন অনাবৃষ্টি, বন্যা কিংবা কোন অজন্মার ভূমিকা ছিল না। তবুও সেই দুর্ভিক্ষের বলি হয়েছিল এই দেশেরই পঞ্চাশ লক্ষ নরনারী। অশনি সংকেত ছবিটি ১৯৭৩ সালের ৩ জুলাই বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়।

১৯৭৪ সালের শুরুতে সত্যজিৎ রায় সোনার কেল্লার শু্যটিং শুরু করলেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছবিটি প্রযোজনার জন্য এগিয়ে আসে। শিশুদের বিষয়টি মাথায় রেখে তিনি ছবিটি করেন। জাতিস্মরী বালক মুকুলকে ঘিরে গল্পটি আবর্তিত হয়েছে। এই আবর্তনের অন্যান্যদের মত সত্যজিতের ডিটেকটিভ হিরো প্রদোষচন্দ্র মিত্রও ঘুরে। কোলকাতা, রাজস্থান, দিল্লী, লালকেল্লা, যোধপুর ও জয়সলমিরে ছবিটির শু্যটিং হয়।

প্রেমচাঁদের অমর কাহিনী শতরঞ্জ কে খেলাড়ী অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় তাঁর প্রথম হিন্দী ছবি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। এই কাহিনীর যে সর্ব ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক আবেদন তাতে বাংলার চেয়ে হিন্দীতে করলে ছবিটি আরো বেশি ফলপ্রসূ হওয়ার চিন্তা থেকেই তিনি ছবিটি হিন্দীতে করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পূর্বে শান্তিনিকেতনে থাকার সময় সত্যজিৎ প্রথম উপন্যাসটি পড়েন এবং কাহিনীটি তাঁকে এত বেশি আলোড়িত করে যে, তিনি সব সময়ই ভাবতেন সময় সুযোগ আসলেই এই ছবিতে তিনি হাত দিবেন। ১৮৫৬ সালের লখনৌর ইতিহাস ও নবাবকে নিয়ে এই কাহিনী গড়ে উঠেছে। লখনৌর নবাব শাহ ওয়াজেদ আলীর কাহিনী, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ আর ব্রিটিশদের ভারত দখল উঠে এসেছে এই চলচ্চিত্রে। ব্রিটিশদের দ্বারা অযোধ্যা দখল নিয়ে সাধারণ জনগণের অস্পষ্ট ধারণা রয়েছে। সত্যজিৎ সেই বিষয়টির দিকেই দৃষ্টি দিতে চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, এটি তথ্য চিত্রের চরিত্রও হতে পারে। ১৯৭৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইলাস্ট্রেটেড উইকলি—র এক সমালোচনার জবাবে এই চিত্রনাট্য লেখার পূর্বে তিনি যে যে উৎস গবেষণা হিসেবে নিয়েছিলেন তার এক বিশাল তালিকা পেশ করেছিলেন। সেখানে তিনি উলে­খ করেন, ব্লু বুক অন অওধ, মিল এবং বেভারিজ এর ভারত ইতিহাস, ডালহৌসির পত্রাবলী, উটরামের দুটি জীবনীগ্রন্থ, হাওয়ার্ড রাসেলের দ্য ইন্ডিয়ান মিউটনি, তরুণ ওয়াজিদের ডায়েরি, উমরাও জান আদা, সমসাময়িক ইংরেজী ও বাংলা পত্র—পত্রিকা ইত্যাদি।

এ ছবিতে অভিনয় করলেন বোম্বের সঞ্জীব কুমার, সৈয়দ জাফরি, আমজাদ হোসেন, বিরজু মহারাজ, শাবানা আজমি প্রমুখ। সেই সাথে একটি দৃশ্যের জন্য অভিনয় করেছিলেন প্রায় ত্রিশ জন ব্রিটিশ, ক্যানাডিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ান সরকারের দিল­ীস্থ দূতাবাসকমীর্। ৬১তম ক্যাভালরির সেনাবাহিনী এবং আশিটি শিক্ষিত ঘোড়া, উট আর হাতি নিয়ে ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সৈন্যদল তৈরি হয়েছিল। এ ছবিতে জেনারেল উটরামের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত গান্ধী চলচ্চিত্রের পরিচালক রিচার্ড এ্যাটেনবরো। এই ছবিতে সেই সময়েই খরচ হয়েছিল চলি­শ লক্ষ টাকা।

১৯৭৮ সালের প্রথম দিকে নিজের রচিত ফেলুদা কাহিনী নিয়ে সত্যজিৎ রায় তৈরি করলেন জয় বাবা ফেলুনাথ। সম্ভবত মগনলাল মেঘরাজের চরিত্র তাঁকে যুব আকর্ষণ করতো। মগনলাল মেঘরাজের ভূমিকায় উৎপল দত্তের অভিনয় ছিল অসাধারণ। ছবির শু্যটিং হয়েছিল বেনারসে।

গুপী গাইন বাঘা বাইন এর দ্বিতীয় পর্বে তিনি হাত দিলেন হীরক রাজার দেশে নামে। এ ছবিতে দু রকম সংলাপ রাখা হয়েছে। সত্যজিৎ প্রথমবারের মত তাঁর চলচ্চিত্রে রাজা এবং তাঁর সভাসদদের কথোপকথন অন্তমিলযুক্ত পদ্যবন্ধে রেখেছেন। হীরক রাজার দেশে রূপকের মাধ্যমে জরুরি অবস্থা এবং একনায়কতন্ত্রের প্রতিবাদ করা হয়েছে। সত্তরের মধ্যভাগে দিল­ীর তুর্কমান গেটে যেমন বসতি ভাঙার ঘটনা ছিল এখানেও সেই ধরনের দৃশ্য আছে। আরো আছে শ্রমিক—কৃষক—শিক্ষক—ছাত্র সকলের মগজ ধোলাইয়ের জারিজুরির পরিকল্পনা।

জীবনের প্রথম সত্যজিৎ রায় যে ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন সেটি হচ্ছে ঘরে বাইরে। ১৯৪৭ সালে। কিন্তু ছবিটি করা হয়নি। সেই ছবিটি তৈরির জন্য ১৯৮১ সালে তিনি আবার চিত্রনাট্য তৈরি করলেন। এ ছবিতে সত্যজিৎ রায় উত্তম কুমারকে দিয়ে সন্দ্বীপ এর চরিত্রে অভিনয় করাতে চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি জানিয়েছিলেন ভিলেন বা খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করতে তিনি ইচ্ছুক নন। পরে সেই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এই ছবি চলাকালীন সময়ে সত্যজিতের হার্ট এ্যাটাক হল। বেশ কিছুদিন তিনি কোন কাজ করতে পারলেন না ফলে ছবিটি শেষ করতে করতে ১৯৮৪ এর মাঝামাঝি লেগে গেল।

ঘরে বাইরে ছবির পর সত্যজিৎ ১৯৮৯ সালে তৈরি করলেন হেনরিক ইবসেন এর কাহিনী অবলম্বনে গণশত্র“ এবং ১৯৯০ সালে নিজের কাহিনী অবলম্বনে শাখা—প্রশাখা। পূর্ণদৈর্ঘে্যর কাহিনীচিত্র ছাড়াও সত্যজিৎ পাঁচটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে উপরে রবীন্দ্রনাথ নামক তথ্যচিত্র। এটির চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও ধারাভাষ্যে সত্যজিৎ রায় নিজেই ছিলেন। পরবতীর্তে ১৯৭১ সালে সিকিম। ১৯৭২ সালে ইনার আই, ১৯৭৬ সালে বালা এবং ১৯৮৭ সালে কুসুমার রায়। ইনার আই তথ্যচিত্রটি তাঁর শান্তিনিকেতনের চিত্রকলার শিক্ষক বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের শিল্পী জীবন নিয়ে। শান্তিনিকেতনের যে দুজন শিক্ষকের কথা সত্যজিৎ আমৃত্যু পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন তাদের একজন হচ্ছেন শিল্পী নন্দলাল বসু আরেকজন বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। এছাড়া তিনি দূরদর্শনের জন্য ১৯৬৪ সালে টু কাহিনী চিত্র, ১৯৮২ সালে পিকু এবং সদগতি তৈরি করেন।

ইতোমধ্যে সত্যজিতের শরীরটা খারাপ হতে শুরু করেছে। তাঁর অতিথি গল্পটাকে একটু বড় করে আগন্তুক নামে একটি ছবি করার সাধ তাঁর বহুদিনের। ১৯৯০ সালে তিনি এই ছবির শু্যটিং শুরু করলেন। দীর্ঘদিন পর কোলকাতায় ফিরে আসে এক ব্যক্তি। তাঁর ভাগ্নির বাসায় কয়েকটি দিন কাটাতে চান। ভবঘুরে এই মামার জীবন কেটেছে পৃথিবীর সব বৈচিত্রময় পরিবেশে। এক সময় কোলকাতায় ছাত্র থাকা অবস্থায় বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় প্রথম হওয়া মামা কিসের এক টানে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। তিনিই ফিরে এসেছেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে গড়ে উঠে সন্দেহের ঘেরাটোপ। তাঁর কথা বিশ্বাস করতে সবাই সন্দেহ পোষণ করে। তর্ক হয় ভাগ্নি জামাইয়ের বন্ধুর সাথে। নগর জীবনের অবিশ্বাসে মামা কষ্ট পান। আবার ভালভাবেই উপলব্ধি করেন দীর্ঘদিন আদিবাসীদের সরলতায় জীবন কাটিয়ে দেওয়ায় আছে পরম সুখ। তাইতো কোলকাতা ছেড়ে তিনি ক্ষণিকের জন্য আশ্রয় নেন এক আদিবাসী পল­ীতে। পরে সন্দেহ প্রবণ ভাগ্নি জামাই এবং ভাগ্নির মামার আসলত্ব নিয়ে সন্দেহ দূর হয় আসে যখন মামা কোলকাতা ছেড়ে চলে যান এবং যাবার আগে ভাগ্নির নামে দিয়ে যান উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত তাঁর বিশাল অংকের অর্থ। আগন্তুক চলচ্চিত্রে মামার চরিত্রে উৎপল দত্তের অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনবদ্য সৃষ্টি। ছবির শু্যটিং চলার সময় সত্যজিৎ শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। নিয়মিত চিকিৎসা চলছিল। মনে হচ্ছিল তাঁর অনেক তাড়া আছে, অনেক কাজ বাকী। অবশেষে আগন্তুক ছবির শেষ শটটির সময় এলো। অনেকক্ষণ সত্যজিৎ ক্যামেরায় লুক থ্রু করলেন, সব কিছু ঠিকঠাক দেখে নিলেন। তারপর পথের পাঁচালী’র প্রথম শট নেয়ার সময় যেমন একটা খোশ মেজাজ ছিল তেমনই এক মেজাজে তিনি জলদ কণ্ঠে বলে উঠলেন; ‘লাইটস, ক্যামেরা, এ্যাকশন’। শটটা ওকে হবার পর বেশ হাসির মেজাজে একটা তালি মেরে বলে উঠলেন, ‘যাঃ, আমার যা কিছু ছিল সব ফুরিয়ে গেল। আর কিছু বলার নেই।’

১৯৯২ সালের ৪ মার্চ সত্যজিৎকে আবার ইনটেনসিভ কেয়ারে ভর্তি করা হল। এবার ওঁর হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের জন্য ডাক্তার ওঁকে তৈরি করছেন। তাঁর অবস্থা খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। ডিসেম্বর মাসে হলিউড থেকে টেলিগ্রামে জানানো হয়েছে তাঁর জীবনব্যাপী কীর্তির স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি এবারে অস্কার পুরস্কারে ভূষিত হবেন। ৩০ মার্চ ১৯৯২ এ আমেরিকায় বিশ্ব চলচ্চিত্রে মহারথিদের উপস্থিতিতে তাঁকে অস্কার পুরস্কার প্রদান করা হবে। প্রাণচাঞ্চল্যে জেগে উঠলেন চলচ্চিত্রের এই নোবেল পুরস্কারটা পাওয়ার জন্য। এর মধ্যে তাঁকে বিভিন্ন মহল থেকে পুরস্কার দেওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। কিছুদিন পূর্বে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং ফ্রঁাসোয়া মিতেরা কোলকাতায় এসে সত্যজিৎ রায় ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান লিজিয়ন অব দ্য অনার এ ভূষিত করে গেছেন। ভারতের প্রধান মন্ত্রী পিভি নরসীমা রাওং জরুরি ভিত্তিতে মন্ত্রী সভার মিটিং ডেকেছেন এবং সেই দিনই রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ঘোষণা করা হয় সত্যজিৎ রায়কে ভারতরত্ন উপাধি দেওয়া হচ্ছে। সবাই এত তাড়াহুড়ো করছে কেন? তাঁর কি যাবার সময় হয়ে গেছে!

সত্যজিৎ রায়ের অস্কার নেওয়ার জন্য আর আমেরিকায় যাওয়া হল না। এমনকি ৩০ মার্চ পর্যন্ত অস্কার কমিটি অপেক্ষাও করল না। তারপূর্বে অস্কার পুরস্কার নিয়ে এক মার্কিন প্রতিনিধি দল কোলকাতায় এসে হাজির হল। পনের দিন আগে নার্সিং হোমেই অসুস্থ সত্যজিতের হাতে অস্কার তুলে দেওয়া হল। ১৯৯২—র ৬৪তম বার্ষিক একাডেমী পুরস্কারের পত্রে আট লাইনে লেখা ছিল ঃ

অ্যান একাডেমী অনারারি অ্যাওয়ার্ড ইজ প্রেজেন্টেড টু সত্যজিৎ রায় ‘ইন রেকগনিশন অফ হিজ রেয়ার মাষ্টারি অফ দ্য আর্ট অফ মোশান পিকচার্স, এন্ড অব হিজ প্রোফাউন্ড হিউম্যানিট্যারিয়ান আউটলুক, হুইচ হ্যাজ অ্যান ইনডেলিবল ইনফ্লুয়েন্স অন ফিল্মমেকারস এন্ড অভিয়েন্সেজ থ্র আউট দ্য ওয়ার্ল্ড।

তাঁর উদ্দেশ্যে লেখা এই কথাগুলো পড়ে হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে গেল দশ বছর বয়সের সেই দৃশ্যটি। যেবার মা সুপ্রভা রায়ের সঙ্গে বালক মানিক তাঁর বেগুনী অটোগ্রাফের খাতা নিয়ে গিয়েছিল শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণে, বিশ্বকবির অটোগ্রাফ নেবার আশায়। একদিন পর অদ্ভুত জড়ানো হাতের আট লাইনে লেখা কবিতাটা বালক মানিকের হাতে দেবার সময় কবি তার মাকে বলেছিলেন, ‘এটার মানে ও আরেকটু বড় হলে বুঝবে।’ অস্কার ট্রফিটা হাতে নিয়ে সব ভুলে তাঁর মন কেন যেন ছুটে যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথে দিকে। তাঁর খুব যেন বলতে ইচ্ছ করছে, ‘গুরুদেব, আমি তোমার সেই আট লাইনের মানে এখন পুরোপুরিই বুঝি, গুরুদেব!’ তারপর মনের অজান্তেই আশেপাশের কারো দিকে লক্ষ্য না রেখে ডুকরিয়ে ছোট শিশুর মত কেঁদে উঠলেন।

কোলকাতার বেলভিউ নার্সিং হোমে ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল সত্যজিৎ রায় সত্তর বছর এগার মাস একুশ দিন বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : সত্যজিৎ রায় বিষয়ক সব লেখা।

Facebook Comments
মনিস রফিক

মনিস রফিক

মনিস রফিকের জন্ম ১৯৬৯ সালের ১ জুলাই রাজশাহী শহরে। ২০০৭ সাল থেকে চলচ্চিত্র ও আদিবাসীদের নিয়ে গবেষণা, পত্রিকা সম্পাদনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে জড়িত আছেন। বর্তমানে তিনি কানাডার টরেন্টোতে কর্মরত আছেন। তার প্রকাশিত চলচ্চিত্র বিষয়ক কিছু বই হচ্ছে - ক্যামেরার পেছনের সারথি, চলচ্চিত্র বিশ্বের সারথি, গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার পটভূমি পর্যালোচনা, তারেক মাসুদ : চলচ্চিত্রের আদম সুরত, সুবর্ণরেখা : প্রসঙ্গ ঋত্বিক ( সম্পাদনা), তিতাস একটি নদীর নাম ( সম্পাদনা)।