ঋতুপর্ণ ঘোষ : চলচ্চিত্র ও ভাবনায়

share on:
ঋতুপর্ণ ঘোষ

ঋতুপর্ণ ঘোষ, বাঙালি পরিচালকদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়, আলোচিত ও বিতর্কিত চলচ্চিত্র পরিচালকদের একজন। পারিবারিক বা মানবজীবনের পারস্পারিক-মানবিক সম্পর্কগুলোর মধ্যকার জটিল মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েনকে এতো সহজ করে তিনি সিনেমায় উপস্থাপন করেছেন , যেকোনো শ্রেণীর দর্শক তাতে মুগ্ধ না হয়ে পারে না। 

নির্মাতা হিসেবে  প্রথম কাজ হিসেবে আমরা সবাই জানি হীরের আংটির কথা। কিন্তু হীরের আংটির কয়েক বছর আগে ১৯৮৮—৮৯ সালের দিকে টেলিভিশনের জন্য নির্মিত ‘বন্দেমাতরম’ নামের ডকু—ফিচার নির্মাণের মাধ্যমে ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্র নির্মাণের হাতেখড়ি।

বন্দেমাতরম শব্দের উৎপত্তি কিভাবে এবং এই শব্দটি ভারতীয় জনজীবনে কিভাবে জড়িয়ে আছে— তা মা তার ছেলেকে বুঝাচ্ছে। এই ছিলো চলচ্চিত্রটির বিষয়। আবার প্রথম ছবি হীরের আংটি হলেও, ঋতুপর্ণ তাঁর প্রথম ছবি হিসেবে উনিশে এপ্রিলকেই জনসম্মুখে প্রকাশ করতেন। হীরের আংটি নির্মাণের একটি ইতিহাস আছে। শিশুদের উপযোগি একটি চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট নিয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষ চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটির কাছে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু ভুতের গল্প হওয়ায় চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি তার আবেদনকে নাকচ করে দেয়। তখন ঋতুপর্ণ ঘোষ হীরের আংটি করার সিদ্ধান্ত নেন।

ঋতুপর্ণ ঘোষের উনিশে এপ্রিল চলচ্চিত্র মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে। বলা হয়ে থাকে শহুরে স্মার্টনেস ছবি বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকরা এই ছবির মাধ্যমে দেখা শুরু করল। যদিও এর আগে অভিনেত্রী ও পরিচালক অপর্ণা সেন ‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’ এবং ‘পরমা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের শহুরে গল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বাজারচলতি ছবির চেয়ে বিষয়ের বৈচিত্র থাকলেও চলচ্চিত্র দুটি মধ্যবিত্ত দর্শকের মনে ততটা ঠাই করে নিতে পারে নি। কিন্তু উনিশে এপ্রিলের মা মেয়ের সম্পর্কের টানাপড়েন এর গল্প দর্শককে বেশ ভাবান্বিত করে তুলেছিল। সেই সঙ্গে কলকাতার মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ পেয়েছিল নতুন বিনোদনের স্বাদ। তাদের পারিবারিক জীবনে নিত্যদিনকার সহজ—সাধারণ ঘটনা সিনেমায় দেখে তারা এক ধরণের সুখ অনুভব করেছিলেন।

সময়ের হিসেবে ঋতুপর্ণের চলচ্চিত্রকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। ১৯৯২ সাল থেকে ২০০২ সাল চলচ্চিত্রকার ঋতুপর্ণের ক্যারিশমার কাল। এই সময়ে পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলো ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রথম পর্যায়ের চলচ্চিত্র। এ সময়ে পরিচালিত হীরের আংটি, ১৯ এপ্রিল, দহন, বাড়িওয়ালি, অসুখ, উৎসব, তিতলি ও শুভমহরত চলচ্চিত্রগুলো একদিকে যেমন তাকে দিয়েছিলো জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে ঘরে এসেছে পুরস্কার ও সমালোচকদের প্রশংসা। এসময়ের সবগুলো চলচ্চিত্রই জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত। এমনকি প্রতিটি চলচ্চিত্রেই পরিচালকের নিজস্ব রুচিবোধ ও যত্নের ছাপ স্পস্ট। চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলো পোষাক নিবার্চন থেকে শুরু করে মেকআপ, সেট, সংলাপ এমনকি উপস্থাপনার ধরণে খাঁটি বাঙালি শহুরেপনার ছাপ স্পস্ট হয়ে ধরা দিত। ঝকঝকে নির্মাণ ও সাবলিল উপস্থাপনা খুব সহজেই আকৃষ্ট করে শহুরে বাঙালির মন। এই পর্যায়েই ১৯৯৬ সালে এবিপি টিভির জন্য ৫২ পর্বের টেরিসিরিজ ‘৫২ এপিসোড’ নির্মাণ করেন।

এ পর্বের চলচ্চিত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো— বাঙালী শহুরে উচ্চমধ্যবিত্তের পারস্পারিক সম্পর্কের বৈপরিত্য ও টানাপড়েন এবং প্রায় সবগুলো চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র নারী । বিষয় হিসেবে বাঙালি দর্শকদের জন্য নতুন বৈকি। উনিশে এপ্রিলে মা ও মেয়ের ভেতরকার সম্পর্ককে সততার সঙ্গে তুলে ধরেন। দহনে আধুনিক এই সময়েও নারী স্বাধীনতার এই যুগে কিভাবে অসহায় হয়ে পড়ছে নারী তারই বাস্তব প্রতিফলন। বাড়িওয়ালী চলচ্চিত্রের নির্মানের গল্পের আড়ালে একাকী নারীর মনের নিঃসঙ্গতার ছবি দর্শকের চিন্তাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে। অভিনেত্রী মেয়ে ও নির্ভরশীল বাবার গল্প নিয়ে তৈরি অসুখ চলচ্চিত্র দর্শককে সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন ভাবনার খোরাক যোগায়। পূঁজোর ছুটিতে একত্রে মিলিত হওয়া একটি পরিবারের সম্পর্কের গভীরতার চলচ্চিত্র উৎসব। চলচ্চিত্রের নায়ককে ঘিরে মা ও মেয়ের ভাললাগা ও স্মৃতিরোমস্থনের গল্প তিতলি বাংলা চলচ্চিত্রের নির্মম পরিহাসের চলচ্চিত্র। শুভ মহরত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এ পর্বের পরিসমাপ্তি ঘটে ঋতুপর্ণের। সেই সঙ্গে পরিচালক ঋতুপর্ণের ক্যারিশমার কিছুটা পরিসমাপ্তিও বটে।

২০০৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পরিচালক ঋতুপর্ণের নির্মাতা জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। এই সময়ে তিনি যতগুলো চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন তার প্রায় সবগুলোতেই কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা গেছে কোনও না কোন বলিউড তারকাকে। ২০০৩ সালে ঐশ্বরিয়া রায় অভিনীত চোখের বালি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এ পর্যায়ের যাত্রা শুরু। তারপর রেইনকোট —এ অজয়—ঐশ্বরিয়া, অন্তরমহল—এ জ্যাকি শ্রফ, সোহা আলী খান, অভিষেক বচ্চন, দ্য লাস্ট লিয়র —এ অমিতাভ বচ্চন, প্রীতি জিন্তা, অর্জুন রামপাল, সব চরিত্র কাল্পনিক এ বিপাসা বসু, খেলা — এ মনীষা কৈরালা অভিনয় করেছেন। এ সময়ের চলচ্চিত্রগুলো একদিকে যেমন ঋতুপর্ণ ঘোষকে বিতর্কিত করে তুলেছিলো, অন্যদিকে এ সময়ের চলচ্চিত্রগুলো তেমন একটা দর্শকপ্রিয়তা পায়নি। বলতে গেলে বিতর্ক শব্দটির সঙ্গে এসময় তার একরকম বন্ধুত্বতা শুরু। আর এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো ডাবিং। একজন অভিনেতার আরেক অভিনেতার মুখ দিয়ে কথা বলানো যেন তাঁর খেলায় পরিণত হয়েছিলো। হিন্দীভাষার অভিনেতা—অভিনেত্রীদের বেলায় ডাবিং করলে তাও না হয় মেনে নেওয়া যেত কিন্তু বাংলাভাষাভাষীদের ক্ষেত্রেও ডাব না করালে যেন তার চলতোই না। দহনে সুচিত্রা মিত্রের ডাব কেতকী দত্তকে দিয়ে করানোর মাধ্যমে এ বিতর্কের শুরু। সুচিত্রা মিত্রের গায়িকার কণ্ঠস্বর ও উচ্চারণের খ্যাতি তখন কেবল পশ্চিমবঙ্গেই নয়, সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর ভয়েসই হঠাৎ পাল্টে দিয়ে বসলেন কেবল ব্যাপারটা জমছে না বলে। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো প্রথম পর্যায়ে ঋতুপর্ণের চলচ্চিত্রে অভিনয় করে অনেকেই জাতীয় পুরস্কার ঘরে তুলেছেন। কিন্তু বলিউডের বড় বড় অভিনেতা—অভিনেত্রীরা জাতীয় পুরস্কার পাননি। এ পর্বের চলচ্চিত্রে তিনি চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে খেলা করার পরিবর্তে মুখের ভাষা নিয়ে ও স্টার নিয়ে খেলা করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

২০০৯ সাল থেকে শেষ পর্যন্ত এক সময়টা ঋতুপর্ণের তৃতীয় অধ্যায়। এ পর্যায়ে নির্মাতা ঋতুপর্ণের চেয়ে ব্যক্তি ঋতুপর্ণ বড় হয়ে ওঠেন ক্রমশই। আবহমান নির্মানের মধ্য দিয়ে যার যাত্রা শুরু। যদিও আবহমানের মাধ্যমে আবার দূর্দান্তভাবে ফিরে এসেছিলেন নির্মাণে। শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার এসেছিলো ঘরে। সেই সঙ্গে সমালোচকদের অকুণ্ঠ প্রশংসাও। কিন্তু নৌকাডুবির পর থেকে যেন কিছুটা পথ হারালেন পরিচালক ঋতুপর্ণ। পরিচালক ঋতুপর্ণ ঢাকা পড়ে গেলেন অভিনেতা ঋতুপর্ণের আড়ালে। অভিনয় করার নেশা ক্রমান্বয়ে ঘিরে ধরল তাকে। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের আরেকটি প্রেমের গল্প ও সঞ্জয় নাগের মেমরিজ ইন মার্চ তাকে ঠেলে দিলো অন্য জগতে। নির্মাণ করলেন চিত্রাঙ্গদা। একই সঙ্গে অভিনয়ও করলেন। এটাই তার পূর্ণাঙ্গ শেষ চলচ্চিত্র। শ্যূটিং করে গেছেন বোমকেশ বক্সি সিরিজের সত্যাণে¦ষী। যদিও চিত্রাঙ্গদা এর আগে হিন্দী ভাষায় সানগ্লাস নামের একটি চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করেছিলেন কিন্তু শেষ হয়নি।

বায়োলজিকাল কারণে ঋতুপর্ণ ঘোষ এফিমিনেট ছিলেন। আমাদের সমাজে এফিমিনেটরা নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে থাকে। সমাজেও তাদের তেমন গ্রহণযোগ্যতা নেই। কিন্তু কাজ ও উদ্দমতার গুণে তিনি তা উতরে গিয়েছেন এবং এফিমিনেটদের জন্য পথপ্রদর্শকের ভূমিকা রেখেছেন। কৌশিকের আরেকটি প্রেমের গল্প এর অবিরূপ সেন ও সঞ্জয়ের মেমোরিজ ইন মার্চ এর সিদ্ধার্থের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত জীবণাচরণের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন বলেই হয়তো তার এ পর্যায়ে আত্মনিমগ্নন।

ভারতীয় চলচ্চিত্রে ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার মানুষ। যদিও একটা বদনাম আছে তার চলচ্চিত্রে বেশি কথা থাকে। কিন্তু এ কথাও সত্যি বাঙালি জাতি একটু বেশি কথাই বলে থাকে। তাছাড়া বলিউডের বড়ো বড়ো স্টাররা ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্র ঘোষের চলচ্চিত্রে কাজ করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। তার কারণ হিসেবে শোনা যায় দুইটি কারণকে। এক. অবশ্যই পরিচালক হিসেবে ঋতুপর্ণ ঘোষ অনেক বড়ো। দুই. ঋতুপর্ণ ঘোষের অসাধারণ কনভিনসিং পাওয়ার। এছাড়া ঋতুপর্ণ কেবল চলচ্চিত্রকারই ছিলেন না একাধারে ছিলেন কবি, সঞ্চালক, সম্পাদক ও অভিনেতা। সবোর্পরি একজন স্বার্থক শিল্পীর নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র

Facebook Comments
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।