ঋতুপর্ণ ঘোষের সাক্ষাৎকার

share on:
ঋতুপর্ণ ঘোষ

ঋতুপর্ণ ঘোষের সাক্ষাৎকার পড়ে আপনি ব্যক্তি ঋতুপর্ণ ঘোষ, তার চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্র ভাবনা বিষয়ে সামগ্রিক একটি ধারণা পাওয়া যাবে। সাক্ষাৎকারটি ইন্টারনেটে পাওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে।

ঋতুপর্ণ ঘোষ, বাঙালি পরিচালকদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়, আলোচিত ও বিতর্কিত চলচ্চিত্র পরিচালকদের একজন। পারিবারিক বা মানবজীবনের পারস্পারিক-মানবিক সম্পর্কগুলোর মধ্যকার জটিল মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েনকে এতো সহজ করে তিনি সিনেমায় উপস্থাপন করেছেন , যেকোনো শ্রেণীর দর্শক তাতে মুগ্ধ না হয়ে পারে না।

আপনি যে ধরণের সিনেমা করেন তার পেছনে কলকাতার সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে আপনার বেড়ে ওঠার প্রভাব কতটুকু বলে মনে করেন?

আমার চলচ্চিত্র জীবন শুধু নয় ব্যক্তি হিসেবে আমার বর্তমান অবস্থানের উপর কলকাতার বিশাল প্রভাব আছে। আমি কিন্তু এখানে প্রভাব হিসেবে কলকাতার নাম করছি, বাংলার নয়; আর এই দুয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। কলকাতার কথা আসলেই আমাদের মুখে দুটো নাম চলে আসে: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সত্যজিৎ রায়। কিন্তু বাংলা মানে কেবল রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিৎ না, আরও অনেক কিছু। বাংলা এমন এক প্রদেশ যা দেশভঙ্গের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে। ভারতের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ অনেক প্রগতিশীল, তাই সেখানে থাকতে পেরে আমি গর্বিত। দেশজুড়ে যে মৌলবাদের উত্থান ঘটেছে মুম্বাই তার দ্বারা আক্রান্ত হলেও কলকাতায় তার কোন প্রভাব পড়েনি।

অনেক আগে কলকাতা ছিল ভারতের রাজধানী। এ কারণে প্রয়োজনীয় সব ধরণের অবকাঠামোই এখানে আছে। জ্ঞানের বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবেও কলকাতার জুড়ি নেই। এখানে আছে: National Library যা এশিয়ার বৃহত্তম। আছে এশিয়াটিক সোসাইটি। এছাড়া প্রচুর বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্থা আছে এখানে। আপনি যদি গুরুতর কোন বিষয়ে গবেষণা করতে চান এবং এর জন্য বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়জন পড়ে তাহলে আপনার জন্য কলকাতার চেয়ে ভাল কোন স্থান বাংলায় নেই।

এর পাশাপাশি আবার কলকাতা বর্ধিষ্ণু শহর না। এটা খুব সাধারণ, এখানে আপনি সব ধরণের লোকের সাথেই মেশার সুযোগ পাবেন। একে আমলাতান্ত্রিক শহর বলা যায় না, আবার ক্লিনিক্যাল সিটিও বলা যায় না। এখানে থাকলে এক ধরণের উষ্ণতা ও স্পন্দন অনুভব করা যায়, অনেকটা নিউ ইয়র্কের মত। লন্ডনের কিছু জায়গাও আমাকে কলকাতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে এটা অবশ্যই ব্যস্ত শহর। রাস্তায় সব সময়ই পথচারীদের ভীড় লেগে আছে, একে অন্যের উপর আছড়ে পড়ছে, কেউ কেউ রাগান্বিত হয়ে ওভার-রিঅ্যাক্ট করে ফেলছে। এখানে সবাই একটু উত্তেজিত। কলকাতার মানুষেরা যখন সুখে থাকে তখনও উন্মাদের মত আচরণ করে আবার যখন রাগান্বিত থাকে তখনও উন্মাদের মত আচরণ করে। বাংলায় যা আছে তার সবই কলকাতায় দেখতে পাওয়া যায়, তবে সবকিছুই এখানে একটু পরিশোধিত এবং ফিল্টার করা। এজন্যই শহরটা এত মজাদার।

বেড়ে ওঠার সময় কলকাতার সাংস্কৃতিক জীবনের সাথে আপনি নিজেকে কিভাবে এবং কতটা জড়িয়েছেন?

আমি বেড়ে উঠেছি কলকাতার বামপন্থী সংস্কৃতির মাঝে। আর ভারতের বাকি অংশের নেতৃত্বের আসনে ছিল ডানপন্থীরা। আমার যখন বোঝার বয়স হয়েছে (৭০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত) তখন থেকেই দেখে আসছি, কলকাতা বামপন্থী শহর। আমি ৩০ বছর আগের কথা বলছি। সে সময় আমরা বেশী কিছু জানতাম না। এখন তো মানুষ সবকিছুর সাথে খুব দ্রুত পরিচিত হয়ে পড়ে, অল্প বয়সেই তার চোখে অনেক কিছু ধরা পড়ে। আমি যখন স্কুল শেষ করছি, তখন কলকাতায় মাত্র টেলিভিশন এসেছে। সুতরাং রাজনীতি নিয়ে যখন থেকে ভাবতে শুরু করেছি তখন থেকেই কলকাতায় বামপন্থীদের রাজত্ব। এখানে বাম রাজনীতি অনেক ফ্যাশনের মত। জটিলতাগুলো চিন্তা না করেই এখানকার মানুষ বামপন্থী হয়ে যায়। ভার্সিটিতে অর্থনীতি পড়ার সময় আমি কার্ল মার্ক্স পড়েছি এবং এ নিয়ে আমার একটা বিশেষ গবেষণাপত্রও তৈরী করতে হয়েছিল।

তারপরও ঘুরেফিরে আবার সে কথায় আসতে হয়, কলকাতা অবশ্যই সত্যজিতের শহর। আমি যে ভার্সিটিতে পড়েছি সেখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কোন শেষ ছিল না। আমার দুঃখ হয়, কেন অর্থনীতি নিয়ে পড়েছিলাম। এটা আমার কোনই কাজে আসেনি। এর সাথে সংশ্লিষ্ট কোন পেশায়ও আমি যোগ দেইনি। এর চেয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বা ইতিহাস বা এ ধরণের কিছু পড়লে অনেক ভাল হতো। তারপরও আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই তখন সামগ্রিকভাবে আমার ভার্সিটি জীবন নিয়ে কোন দুঃখ হয় না। কারণ সে জীবনে অনেক কিছুর সাথে পরিচয় হয়েছিল। জাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ৫ বছর কাটিয়েছি, এই বিশ্ববিদ্যালয়টা ছিল বিপ্লবী, সেখানে সবকিছুই ছিল সংস্কৃতি কেন্দ্রিক। এই ভার্সিটিতে থাকার সময় আমি প্রথম ঋত্বিক ঘটকের ছবি দেখেছি, সত্যজিতের ছবি দেখেছি। এখান থেকেই আমার চলচ্চিত্রপ্রেমের সূচনা। জাদবপুরের নিজস্ব চলচ্চিত্র ও মঞ্চ সোসাইটি আছে। আমার প্রথম হাবিব তানভীর দর্শনও সেখানে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ৫ বছরে অনেক কিছু ঘটেছিল, সেই ঘটনাগুলোই আমার জীবন গড়ে দিয়েছিল।

আমার বাবা ছিলেন প্রামান্য চিত্র নির্মাতা। মূলত তিনি ছিলেন চিত্রকর, পরে প্রামান্য চিত্র বানানো শুরু করেন। আমার মাও চিত্রকর ছিলেন। বাবা তার প্রথম প্রামান্য চিত্র করেছিলেন এক ভাস্করের ওপর যিনি আবার তার শিক্ষক ছিলেন। তখন আমার বয়স ১৪ বছর, বাবার সাথে শ্যুটিং এ যেতাম। তিনি ১৬মিমি হ্যান্ড-ক্র্যাক ক্যামেরা দিয়ে শ্যুটিং এর কাজ চালাতেন। ছবির এডিটিং হতো আমাদের বাসার ডাইনিং টেবিলে, সেদিন আমাদেরকে অন্য কোথাও খেতে হতো। বাবার সাথে বসে শট বাছাই করার কথা এখনও মনে পড়ে। এসবই সিনেমার জগৎটাকে আমার সামনে তুলে ধরে। ছোটবেলায়ই জানতাম, চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার জন্য কোন বিশেষ প্রশিক্ষণ লাগে না, বিশেষ কোন যোগ্যতাও লাগে না। ১৪ বছর বয়সেই সিনেমার অনেক কিছু জানতাম। রাশ প্রিন্ট কাকে বলে? সিনেমার সম্পাদনা কিভাবে হয়? ফাইনাল প্রিন্ট কি জিনিস? মিক্সিং কখন করতে হয়? সাউন্ডের লেয়ারগুলো কি কি? কিভাবে সেগুলো মিক্স করতে হয়, কতগুলো ট্র্যাক করা সম্ভব? টেকনিক্যাল সব বিষয় আমার জানা ছিল, কারণ আমাদের বাসায়ই এসব হতো। সিংক সাউন্ড কি? ফোলি সাউন্ড কি? নন-সিংক সাউন্ডই বা কি? এর সবকিছু আমি জানতাম।

একসময় আমি চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু বাবার প্রামান্য চিত্রের বদলে গল্প বলাকে বেছে নেই। প্রামান্য চিত্রটা আমার সাথে ঠিক যেতো না। অনেক সময় বাবাকে সাহায্য করেছি, স্ক্রিপ্ট নিয়ে একসাথে আলোচনা করেছি। এটা একটা পারিবারিক বিষয়ের মত ছিল। সবাই স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলোচনা করতো। আমার মা চিত্রকর ছিলেন, যে ভাস্করের উপর প্রামান্য চিত্র হচ্ছে তাঁকে তিনি চিনতেন। তাই সবাই মিলে ভাল আলোচনা হতো। আমি কিছু পরামর্শ দিতাম, কিন্তু বাবা সেগুলো অধিকাংশ সময়ই গ্রহণ করতেন না। কারণ বাবা চাইতেন হার্ড-কোর ডকুমেন্টারি বানাতে। তার কথা ছিল, what has not happened has not happened. সত্যকে একটুও এদিক-ওদিক করতে চাইতেন না, সত্যের ব্যাঘাতও তিনি সহ্য করতেন না। পরে আমি বুঝেছিলাম, আমার পরামর্শগুলো সত্যকে ইন্টারাপ্ট করার মত, কিন্তু সেগুলো বাবা সত্যের বিকৃতি হিসেবে নিতেন।

বাংলায় “book” এবং “film” এই দুটোর প্রতিশব্দই নাকি এক? আপনার অনেকগুলো সিনেমাও তো উপন্যাস আর ছোটগল্প থেকে করা।

হ্যা, এটা ঠিক। দুটোর প্রতিশব্দই “বই”। কিন্তু আমার যদ্দুর মনে হয়, আমার সবগুলো ছবিই মৌলিক। এটা সত্য যে, রেইনকোট ও’হেনরি থেকে করা আর চোখের বালি তো সরাসরি রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প থেকে করা। কিন্তু যদি দেখে থাকেন তাহলে বুঝবেন, সেগুলোতে আমি অনেক পরিবর্তন এনেছি। রেইনকোট দেখলেই বুঝবেন যে এর সাথে ও’হেনরির “দ্য গিফ্ট অফ ম্যাজাই” এর খুব বেশী মিল নেই। ও’হেনরির গল্প ছিল তিন পৃষ্ঠার, আমার রেইনকোটের সাথে এর তেমন কোন মিল নেই। গল্পের কাহিনী ছিল এরকম: জিম ও ডেলা স্বামী-স্ত্রী। তারা ক্রিসমাস উপলক্ষ্য একে অপরের জন্য উপহার কিনে। ডেলা তার চুলের জন্য সবসময় tortoise-shell চিরুনী চাইতো, তার চুল ছিল অনেক লম্বা ও সুন্দর। জিম সবসময় তার ঘড়ির জন্য একটি সুন্দর চেইন চাইতো। জিম তার ঘড়ি বিক্রি করে চিরুনী কিনে বাসায় এসে দেখে, ডেলা তার চুল বিক্রি করে চেইন কিনে বসে আছে।

আমার প্রথম ছবি একটা উপন্যাস থেকে করা। সেটা ছিল শিশুতোষ। আমার তৃতীয় ছবিও উপন্যাস থেকে করা যে উপন্যাসটা আবার সত্য কাহিনী অবলম্বনে লেখা হয়েছিল। মোট ১১টি ছবি করেছি। রেইনকোট ছিল ১০ম, আর এটা ১১তম। এখন অন্তরমহল ছবির কাজ চলছে। এর মধ্যে আমার মাত্র চারটি ছবি উপন্যাস বা গল্প থেকে করা।

যদ্দুর জানি আপনার প্রায় সব ছবির পরিচালক ও চিত্রনাট্য লেখক আপনি নিজেই। এটা কি সত্যি?

হ্যা, একইসাথে গল্পের লেখকও আমি। সব ছবিতেই আমি নিজে চিত্রনাট্য লিখি। সত্যজিৎ এমনটিই করেছেন, ঋত্বিক অধিকাংশ সময় করতেন, মৃণালও করেন। আমার মনে হয়, চিত্রনাট্যের ভাবগুলো আমার মধ্যে খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে। অভিনয় করার জন্য যে ধরণের কথোপকথন দরকার সেগুলো খুব দ্রুত মাথায় এসে যায়। আর যখন চিত্রনাট্য লেখার সময়ই আসলে আমি মনে মনে সিনেমার পরিকল্পনা করে ফেলি, তাই সবকিছু খুব সহজ হয়ে যায়।

আপনার অধিকাংশ সিনেমাই তো বাংলায়?

হ্যা, আসলে রেইনকোট ছাড়া আমার বাকি সব সিনেমাই বাংলা। ১১টির মধ্যে ১০ টিই। রেইনকোট আমার একমাত্র হিন্দি ছবি।

কেন? অন্য ভাষায় বেশী সিনেমা বানান না কেন?

কারণ বাংলা আমার মাতৃভাষা এবং কলকাতা অতোটা কসমোপলিটান না। ভারতের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কসমোপলিটান হল বোম্বে। বোম্বের লোকেরা হিন্দি বলতে পারে না, কারণ তাদের এক শহরে অনেকগুলো সম্প্রদায়ের মানুষ থাকে এবং পারষ্পরিক যোগাযোগের জন্য তারা খুব মিশ্র ধরণের একটি হিন্দিকে বেছে নিয়েছে। তাই বোম্বেতে মাতৃভাষার ধারণাটা পাকপোক্ত না। কিন্তু কলকাতায় বাংলার প্রভাব অনেক বেশী, মাতৃভাষা হিসেবে এর গুরুত্ব অনেক বেশী। এখানে বাংলা সিনেমা সবাই দেখে, এ শহরের সবগুলো লাইব্রেরিতে বাংলা সিনেমা পাওয়া যায়। এর থেকে আমরা আরও একটা বিষয় খুব ভালভাবে বুঝতে পারি: মাতৃভাষায় সিনেমা নির্মাণ করেও আন্তর্জাতিক পরিচালক হওয়া সম্ভব।

তাছাড়া আমি বাংলায় খুব সাচ্ছ্যন্দ বোধ করি। নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাদের মাতৃভাষার মূল হারিয়ে ফেলতে বসেছে। কিন্তু আমার অবস্থা সেরকম নয়, আমার বাংলার মূল খুব শক্ত। আমি বড়ও হয়েছি পারিবারিক পরিবেশে যেখানে সবার মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। বর্ধিত পরিবারের মধ্যেই আমার বাস। আমার শৈশব খুব উষ্ণ ছিল, সেখানেই আমার মূল, সেখানেই বাংলার সাথে আমার সম্পর্ক।

ভারতে প্যারালাল বা আর্ট সিনেমার যে ট্রেডিশন চলছে আপনি কি নিজেকে তার অংশ মনে করেন?

এই বিষয়ে অনেক বিতর্ক আছে: প্যারালাল সিনেমা বলতে কি বোঝায়? আর্ট সিনেমাই বা কি? এক সময় মানুষ মনে করতো, এ ধরণের বিভাজন থাকা দরকার। সব সিনেমাই মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরী করা হয় না। এটা সত্যি কথা। কিন্তু মনি কাউল ও কুমার সাহানিরা এসে এতই দুর্বোধ্য সিনেমা বানানো শুরু করলেন যে সেগুলো দেখার মত কোন দর্শকই আর রইল না। তখন নন-ন্যারেটিভ পদ্ধতি সিনেমায় আসতে শুরু করেছে। ভারতের গল্পভাণ্ডারের কোন শেষ নেই। এদেশের নিজস্ব গল্প, উপকথা, রূপকথা আছে। এর নিজস্ব ন্যারেটিভ ট্রেডিশন আছে। তাই হঠাৎ করে নন-ন্যারেটিভ পদ্ধতি কেউ গ্রহণ করেনি। তাই সেই নন-ন্যারেটিভ সিনেমাগুলোকে “আর্ট” সিনেমা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।

আগে সবাই সে ধরণের সিনেমা দেখতে যেত। সত্যজিতের ছবি দেখতে কারোই কোন সমস্যা ছিল না। তারা মনে করতো, এগুলোকে “বুদ্ধিবৃত্তিক চলচ্চিত্র” (intellectual film) ডাকা যায়। যে সিনেমায় বুদ্ধিবৃত্তির (intellect) ব্যবহার আছে তাকেই বুদ্ধিবৃত্তিক সিনেমা বলা যেতে পারে। কলকাতায় কিন্তু আমরা কখনোই “আর্ট” বা “প্যারালাল” শব্দটি ব্যবহার করিনি। এ ধরণের সব সিনেমাকে আমরা ইন্টেলেকচুয়াল ছবি বলতাম, এটা কেবল বলার জন্য বলা নয়, সবাই সংজ্ঞা বুঝে তারপরই সেগুলোকে ইন্টেলেকচুয়াল সিনেমা ডাকতো। সুতরাং যে ছবি করতে গিয়ে আপনাকে বুদ্ধিবৃত্তির ব্যবহার করতে হবে, যেটা কেবল মনোরঞ্জনের জন্য নির্মীত হবে না সেটাকেই বুদ্ধিবৃত্তিক ছবির শ্রেণীতে ফেলে দেয়া যায়।

তার মানে এই প্রেক্ষিতে আপনি নিজেকে ভারতের ইন্টেলেকচুয়াল চলচ্চিত্র ধারার অন্তর্ভুক্ত মনে করেন?

হ্যাঁ।

অনেক সমালোচক আপনার চোখের বালির সাথে সত্যজিৎ রায়ের চারুলতার (এটাও রবীন্দ্রনাথের গল্প থেকে করা) মিল দেখিয়েছেন। আপনি কি আপনার এই ছবিকে সত্যজিতের প্রতি ট্রিবিউট হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান?

না, আমি তেমনটি বলব না। তবে কিছু অংশ অবশ্যই সত্যজিতের প্রতি ট্রিবিউট ছিল। সবাই চারুলতার থিয়েটার বাইনোকুলার আর দোলনায় দোল খাওয়া মনে রেখেছে এবং তার সাথে আমারটা মিলিয়েছে। কিন্তু চারুলতায় বাইনোকুলার একেবারে ভিন্ন কারণে ব্যবহার করা হয়েছিল। চারুলতায় বাইনোকুলার ব্যবহার করা হয়েছিল উন্মুক্ত বিশ্বের দিকে একটি জানালা হিসেবে, আর চোখের বালিতে ব্যবহার করা হয়েছে ইক্ষণকামের (voyeuristically) জন্য। সেই সময় এবং এই সময়ের মধ্যে বেশ কিছু জিনিস সাধারণ আছে। যেমন ফোর-পোস্টার বিছানা, সব বাংলা সিনেমাতেই এটা ব্যবহার করা হয়েছে। থিয়েটার বাইনোকুলার পরে এসেছে বলে খুব কম সিনেমাতে এর ব্যবহার আছে। কিন্তু আমি সেটা আবার ব্যবহার করেছি।

আমি অবশ্যই এমন কেউ যে সত্যজিৎ ধারায় সিনেমা বানায়। কিন্তু এটাকে আমি অস্বীকার করার চেষ্টা করি না, বরং এতে আমি খুব খুশী; আমি মনে করি বাচ্চা-কাচ্চাদের দেখতে বাবা-মার মতোই হওয়া উচিত [হাসি]। আমি অবশ্যই সত্যজিতের উত্তরসূরি, তাঁর সিনেমার মধ্যেই আমরা বেড়ে উঠেছি।

সত্যজিতের সাথে আমার পার্থক্যগুলো এরকম: প্রথমত, চোখের বালি রঙিন, চারুলতা রঙিন না। চারুলতার জন্য সত্যজিৎ কোন ধরণের রং বেছে নিতেন আমি জানি না। তবে চোখের বালিতে রং এর বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। the whole copperish tint with the red- এর ভূমিকা এখানে খুব বেশী। চারুলতায় কোন ধরণের রং ব্যবহার করা হতো তা আমরা জানি না। রবীন্দ্রনাথের একটি উপন্যাস থেকে সত্যজিৎ সিনেমা করেছেন যার নাম “ঘরে-বাইরে”। সিনেমা বা অ্যাসথেটিক পিস হিসেবে ঘরে-বাইরে একটি কমপ্লিট ডিজাস্টার। দেখা যায়, সমালোচকরা সব সময়ই চারুলতার সাথে তুলনা দেন, ঘরে-বাইরের কথা উল্লেখই করেন না। ঘরে-বাইরে উপন্যাসটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এ থেকে সত্যজিৎ যে সিনেমা বানিয়েছেন তা তার ভাল কাজগুলোর মধ্যে পড়ে না। আর চারুলতা আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে ত্রুটিহীন সিনেমাগুলোর একটি।

আবেগের দিক দিয়ে চারুলতায় যে নিয়ন্ত্রণ দেখানো হয়েছে তার কোন তুলনা হয় না। শুধু আবেগ না, যেকোন দিক দিয়েই এর নিয়ন্ত্রণটা অনন্যসাধারণ। এখানে বাঙালি সংস্কৃতির অ-হিন্দু অংশকে দেখানো হয়েছে। ব্রাহ্ম ধর্ম নামে একটি ধর্ম ছিল যাতে মূর্তিপূজা ছিল না। চারুলতার কনটেক্সট এবং সমসাময়িকতা এই ব্রাহ্ম যুগের। সে যুগে সব আলোকিত ব্যক্তিই ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণভাবে সব অজ্ঞেয়বাদীরাও এই ধর্মে যোগ দিয়েছিলেন। অপরদিকে চোখের বালির প্রেক্ষিত হল অভিজাত গোঁড়া হিন্দু পরিবার। এ ধরণের পরিবারের সব দোষত্রুটি আর একঘেয়ে জীবনাচার এতে ফুটে উঠেছে। যেমন, ব্রাহ্ম সমাজে বিধবাদের অবস্থা এত খারাপ ছিল না। কিন্তু গোঁড়া হিন্দুদের মধ্যে সেটা প্রকট ছিল। এটাকে আমি চারুলতার সাথে চোখের বালির আরেকটা পার্থক্য বলব।

আপনার চোখের বালি শুরু হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি উক্তি দিয়ে যেখানে তিনি উপন্যাসের শেষটা সম্পর্কে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন: “Ever since Chokher Bali was published, I have always regretted the ending. I ought to be censured for it” আপনি রবীন্দ্রনাথের এই উক্তিকে কিভাবে দেখেন, আর আপনার সিনেমায় কি কোনভাবে এই বিষয়টা নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন?

হ্যাঁ, কারণ সিনেমার শেষটা উপন্যাস থেকে একেবারেই আলাদা। উপন্যাসে সমাপ্তিটা বেশ হাস্যকর: হঠাৎ করেই সবাই সুখী-সুখী হয়ে যায়, পরিবারটাকে খুব ভাল মনে হতে থাকে এবং তারা দুজনেই বিনোদিনীর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে। দুই পুরুষ মহেন্দ্র ও বিহারী বলে, “ভাবী, আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমার ভুল হয়েছে।” সেও তাদের ক্ষমা করে দেয়। এরপর সে বেনারসে গিয়ে তপস্বীর মত জীবনযাপন শুরু করে। সব সাধ-আহ্লাদ ত্যাগ করে, কারণ বিধবাদের সেভাবেই থাকা উচিত।

দেখুন, এটা এক ধরণের serialized উপন্যাস। ঠাকুর শুরু করেছিলেন বিধবার নিষিদ্ধ আবেগ দিয়ে। এর কারণ হিসেবে পাঠকপ্রিয়তা বাড়ানোর কথা আসতে পারে, কারণ ঠাকুর নিজে সাময়িকীটি সম্পাদনা করছিলেন, তার পাঠকের প্রয়োজন ছিল। উপন্যাসটা অর্ধেকের মত লেখার পরই খানিকটা প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং সব ব্রাহ্মরা মিলে তাকে রীতিমত ভর্তসনা করতে শুরু করে। ঠাকুর নিজে হিন্দু ছিলেন না, ছিলেন ব্রাহ্ম যা নিয়ে আমি একটু আগেই বলেছি। তো ঠাকুর হিন্দুদের আবেগকে খুব বেশী নাড়াতে চাননি।

এজন্যই বিনোদিনীকে সমাজের চিরন্তন নিয়মের কাছে আত্মসমর্পণ করান। কিন্তু মৃত্যুর দুই মাস আগে যখন হারাবার কিছুই ছিল না তখন তিনি আক্ষেপ করেছিলেন এই বলে যে, “আমি এটা কেন করেছিলাম? আমার পাঠকদেরও সন্তুষ্ট করতে পারিনি নিজেকেও সন্তুষ্ট করতে পারেনি, তাহলে কেন করেছিলাম?” এ নিয়ে একটা ভাল সমালোচনাও হয়েছিল: বিনোদিনীকে যদি শেষে আজীবন নির্বাসনেই পাঠাবেন তবে তাকে দিয়ে কেন নিষিদ্ধ কাজ করালেন, কেন তার মধ্যে এত কামনার জন্ম দিলেন? এই সমালোচনা রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

রবীন্দ্রনাথ হয়ত বিনোদিনীকে এমনই করতে চেয়েছিলেন: তার মধ্যে আরও জীবনীশক্তি দিতে চেয়েছিলেন, আরও কামনা ও জীবনের প্রতি আরও ভালবাসা ভরে দিতে চেয়েছিলেন। হয়ত তার জীবনের পুরো চাহিদাটাকে পরিতৃপ্ত করতে চেয়েছিলেন। মৃত্যুর মাত্র দুই মাস আগে ঠাকুর এটা প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছিলেন: “I need to be seriously criticized for it, I deserve this criticism. I should be punished for it.”

আজকেও উপন্যাস পড়লে বোঝা যায়, এই উপন্যাসের এমন সমাপ্তি হতে পারে না। অনেক পাঠক চেয়েছিলেন বিনোদিনীর সাথে বিহারীর বিয়ে হোক। আমি মনে করি, আজ থেকে ৩০ বছর আগে হলে বিনোদিনীর সাথে বিহারীর বিয়ের মাধ্যমে সমাপ্তি দেয়া যেতো। কারণ তখন বিধবা বিয়েকে উৎসাহিত করা হচ্ছিল, এ নিয়ে রীতিমত প্রচার চলছিল। সবাই তখন মনে করতো, আরেকটি বিয়ে হলে সে আবার জীবন শুরু করতে পারবে। কিন্তু আজকের অবস্থা ভিন্ন। এখন নারীর জীবন চালানোর জন্য কোন পুরুষের শেষ নাম, উপাধি বা কোন ধরণের সাহায্যের প্রয়োজন হয় না।

বিনোদিনী আগে বিয়ে করেছে এবং বিয়ে তাকে কিছুই দেয়নি, এতে তার কোন সাহায্য হয়নি। একা থাকাটাই তাকে সবচেয়ে বেশী সাহায্য করেছে। তার অর্জন, তার শক্তি, তার হেঁয়ালিই তার সবচেয়ে বড় সহায়। সুতরাং তার পক্ষে একা থাকার শক্তি অর্জন করা সম্ভব।

পরবর্তীতে চলে যাওয়ার সময় সে তার নিজের “দেশ” এর কথা লিখে। এখানে দেশ বলতে স্থায়ী ঠিকানা বোঝায় না, দেশ বলতে “স্থান” বা ডোমেইন বোঝানো হয়েছে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন আর বিনোদিনীর জীবনের ঘটনাগুলো একসাথে ঘটছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা আন্দোলনে আবার নারীর কোন স্থান নেই। সুতরাং নারীর কোন নিজস্ব দেশ নেই, সে যেমন তার স্বামীর নাম বহন করে তেমনি স্বামীর দেশই তার দেশ, স্বামী যে দেশের সেও সেই দেশের।

কিন্তু একজন নারীর নিজস্ব দেশ থাকতে পারে। নারীর কোন নির্দিষ্ট দেশ বা কোন নির্দিষ্ট পরিচয়ে আবদ্ধ হয়ে যাওয়া উচিত না। পুরুষ কখনও তার পরিচয় পরিবর্তন করতে পারে না, কিন্তু নারী পারে। একজন স্বাধীন নারীর জন্য আমি তাই একে “দেশ” হিসেবে আখ্যায়িত করব। সিনেমার শেষে গিয়ে বিনোদিনী এই “দেশ” এর কথাই বলে।

তার মানে আপনার সমাপ্তিটা মুক্তি এনে দিয়েছে, মুক্তির ভাব জাগ্রত করেছে?

হ্যাঁ, আমি তাই ভেবেছিলাম। আমি অবশ্যই কোন সুনির্দিষ্ট সমাপ্তি দিতে চাইনি। ন্যারেটিভ দিক দিয়ে সবকিছুর সমাধান দিয়ে দেইনি।

রেইনকোট আর চোখের বালি দুটো সিনেমার সঙ্গীতই চমৎকার। গুলজারকে দিয়ে গানের লিরিক লিখিয়েছেন?

না, রেইনকোটের সব গানের লিরিক আমিই লিখেছি, শুধু বিয়ের দুটো গান বাদে। Mathura nagarpati kahay tum gokoli jao, Piya tora kaisa abhiman এবং Akele hum nadiya kinare- এই তিনটি গানের লিরিকই আমার নিজের। এই গানগুলো কিন্তু হিন্দি না, আমি হিন্দি জানি না। এগুলো মৈথিলী, যা একটা মিশ্র ভাষা। সংস্কৃত, খানিকটা হিন্দি এবং ব্রজভাষা মিলে মৈথিলী হয়েছে।

সঙ্গীত ও কবিতার কোন ধারাটির সাথে আপনার পরিচয় হয়েছে?

আমি অনেক কবিতা পড়েছি। অবশ্য, বাঙালিদের জন্য কবিতা পড়া একটা ফ্যাশনের মতো, সবাই পড়ে। সেখানে কবিতা পড়া শুরু হয় Lorca দিয়ে, এরপর আসে বামপন্থী কবিদের কবিতা। অ্যালেন গিন্সবার্গের নাম করতে হয়। তিনি কলকাতায় ছিলেন, ইংরেজিতে লিখলেও তার কবিতা দিয়ে অনেকে প্রভাবিত হয়। তারপর অবশ্যই ইলিয়াডের নাম করতে হয়। বাংলা ভাষায়ও আমাদের অনেক প্রখ্যাত কবি আছেন, তাদের কারও কবিতাই বাদ যায় না। মাও সেতুং এর কবিতাও সবাই পছন্দ করে। সুতরাং কলকাতায় কাব্য রুচির কোন নির্দিষ্ট ধারা নেই, মিশ্র।

সঙ্গীতের কথা বললে প্রথমেই আসবে পশ্চিমা ধ্রুপদী সঙ্গীতের কথা। কারণ ব্রিটিশ রাজত্বের প্রথম রাজধানী হওয়ার সুবাদে কলকাতায় সঙ্গীতের এই ধারাটি খুব প্রভাব বিস্তার করেছে। কলকাতার পুরাতন অভিজাত এলাকায় গেলে আপনি long-playing রেকর্ড, high-brow সঙ্গীত শুনতে পাবেন। এটাই সেখানকার ট্রেডিশন। বিখ্যাত পশ্চিমা ধারার সঙ্গীতজ্ঞরা সবাই কলকাতার, প্রথম দিককার চেলো ও বেহালা বাদকরা সবাই কলকাতার। কলকাতা থেকেই ধীরে ধীরে তা বোম্বেতে গেছে।

রবীন্দ্রনাথ নিজেও পশ্চিমা সঙ্গীতের ট্রেডিশনে বড় হয়েছেন, পরবর্তীতে এই সঙ্গীতকেই নিজের স্বতন্ত্র ট্রেডিশনে রূপান্তরিত করেছেন। তার গানের গভীরে গেলে পশ্চিমা ধ্রুপদী সঙ্গীতের অনেক উপাদান পাওয়া যায়। চোখের বালির সব গানই রবীন্দ্রনাথ থেকে নেয়া হয়েছে; এগুলো প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের ইন্টারল্যড। চোখের বালিতেই সেই ধারার সঙ্গীতের বিশালত্ব বোঝা যায়, এর কথা ও গভীরতা স্পষ্ট হয়ে পড়ে, আর গভীরে গেলে পশ্চিমা ধ্রুপদী সঙ্গীতের প্রভাবটাও ধরা পড়ে।

আর আমি মনে করি, চোখের বালির ধ্রুপদী মান তার সঙ্গীতের কারণেই প্রকট হয়ে উঠেছে। যারা রবীন্দ্রনাথ পড়েননি তারা এই বিষয়টা ধরতে পারেন না: তিনি চোখের বালির এই চারটি চরিত্র নিয়েই একটা অপেরা লিখেছিলেন যা প্রায় একই রকম। এই অপেরাই সিনেমাটির মিউজিক্যাল টেক্সট গঠন করেছে। যেমন টাইটেল মিউজিকটা হুবহু সেই অপেরা থেকে নেয়া হয়েছে। এতে চারটি নারী-পুরুষ প্রায় উচ্চমার্গীয় একদল সঙ্গীতজ্ঞের সাথে মিলে এক ভালবাসার খেলায় মেতে উঠেছে, অনেকটা Midsummer Night’s Dream এর মত।

কিংবা ওরাকলের মত, গ্রিক কোরাসের মত, যেখানে সবাই আবেগকে গানে রূপান্তরিত করছে এবং এর মাধ্যমেই নিজেদের কাজগুলো সচক্ষে দেখতে পাচ্ছে। এই গ্রিক ট্রেডিশনে কিন্তু চরিত্রগুলো মঞ্চে এসে প্রথমেই পুরো কাহিনীটা বলে দেয়, এরপর কি কি ঘটবে তাও বলে দেয়।

চোখের বালিতে আসলে আমি সঙ্গীতের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছি, কারণ এতে তার প্রয়োজন ছিল। আমার অন্য ছবিগুলোতে কিন্তু সঙ্গীতের এত ব্যবহার নেই। যেমন রেইনকোটে ভারতের স্বদেশী খেদসূচক সঙ্গীত ব্যবহার করা হয়েছে। সেই ছবি করতে গিয়ে আমরা ইচ্ছে করেই তেমন গান বেছে নিয়েছি, কারণ তার গল্প ছিল সাধারণ এবং সঙ্গীতেও তার প্রতিফলন থাকা উচিত ছিল।

আপনি রায় এবং ঘটকের কথা বলেছেন। কিন্তু আর কোন কোন চলচ্চিত্র নির্মাতা দ্বারা আপনি প্রভাবিত হয়েছেন?

নিঃসন্দেহে বারিমান (Ingmar Bergman)। এরপরেই আসবে কিয়েশলফস্কি। Bille August (Pelle the Conqueror, The Best Intentions), তার ছবি আমার খুবই ভাল লাগে। কোয়েন্টিন ট্যারান্টিনো, আমি তার মত সিনেমা বানাতে চাই না, কিন্তু সে আমাকে মুগ্ধ করে। গডফাদারকে সর্বকালের অন্যতম সেরা সিনেমা মনে করি। আব্বাস কিয়ারোস্তামি, আমি কিয়ারোস্তামির পরেই জাফর পানাহি ও মোহসেন মাখমালবফের সিনেমা পছন্দ করি। অনেক সময় ওং কার-ওয়াই ও পেদ্রো আলমোদোবার আমার ফেভারিট হয়ে উঠে, তাদের ছবি অনেক সময়ই আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয়। বিশ্ব চলচ্চিত্রের আরেকটি সেরা ছবির নাম “লাইক ওয়াটার ফর চকোলেট”, আলফোনসো আরাউ এর। কিন্তু আরাউ এর পর আর কোন উল্লেখযোগ্য সিনেমা করেননি।

ভারতের বেশ কিছু চলচ্চিত্রকার আছেন যারা স্বতন্ত্রভাবে চিত্রনাট্য লিখছেন, আপনি তাদের মধ্যে একজন। চলচ্চিত্রকার হিসেবে ভাবার আগে আপনি কি নিজেকে একজন লেখক হিসেবে মনে করেন?

একটা বিজ্ঞাপন সংস্থার কপি রাইটার ছিলাম আমি। হ্যাঁ, শব্দ নিয়ে খেলতে আমি অভ্যস্ত। তবে নিজের চলচ্চিত্রের জন্য লিখতে আমি পছন্দ করি। এবং ঠিক যেমন অন্যের জন্য চিত্রনাট্য লিখতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, তেমনি অন্য কারো চিত্রনাট্যে কাজ করতেও আমার অস্বস্তি লাগে।

চলচ্চিত্রে আসার আগে আপনার মাথায় কয়টি চলচ্চিত্রের গল্প প্রস্তুত ছিল?

চলচ্চিত্রে সংশ্লিষ্ট হওয়ার অন্যতম দিক হচ্ছে আমার লেখালেখি। একটা লাইন যখন লিখি তখন আমি ঠিক জানি, এটার নির্দেশনা আসলে কেমন হবে, কীভাবে করা উচিত। তাই আমি খুব কারিগরি উপায়ে নির্দেশনা করি। নির্দেশনার কাজটা হচ্ছে কারিগরি, যেখানে লেখালেখিটা মুক্ত-বহমান। ঠিকঠাক ডায়ালগ পেতে চিত্রনাট্য নির্দেশনার জন্যে আগে আমার একজন লেখক ছিল। কিন্তু এখন এটা করার কোন প্রয়োজন আমার নেই। প্রধানত আমি কখনোই আমার চিত্রনাট্যকে সেভাবে ভালোবাসিনি, মাঝে মাঝে আমার সহকারী পরিচালকরা খুব বিস্মিত হতো যখন আমি বলতাম তারা কিছু পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এটা একবারে কংক্রিট কিছু না, আমি শুধুমাত্র এটা লিখেছি।

নিজের ধারণা থেকে নির্মিত চলচ্চিত্র যেমন ‘তিতলি’ কিংবা ‘উৎসব’ এই দুইটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে অন্যের কাহিনী নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র- ধরুন ‘চোখের বালি’ কিংবা ‘দহন’ চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে সেরকম তুলনামূলক কোনো সম্পর্ক আছে কিনা?

আদৌ না। উপন্যাসের মূল ধারণাটা আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। আমি শুধুমাত্র গল্পের চেতনাটাকে বিশ্বাস করি; গল্পের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত থাকার কোন প্রয়োজন মনে করি না। উদাহরণস্বরূপ, ‘চোখের বালি’ লেখা হয় ১৯০২ সালে এবং আমি এটাকে চলচ্চিত্রে রূপ দিই ২০০৩-এ। ঠাকুর নিজেও এই গল্পের শেষটা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তার উপন্যাসটি শেষ হয় সব আশা-আকাঙ্খা পরিত্যাগ করে বিধবা বিনোদিনী বসবাস করতে যাচ্ছেন বেনারসে-এই ঘটনা দিয়ে। তবে আমার চলচ্চিত্র তার স্বাধীনতার উপর আলোকপাত করেছে। যখন বিনোদিনী তার চিঠিতে নিজের দেশ নিয়ে লিখছেন, যেটা শুধুমাত্র দেশ হিসেবে নয়, কোন জায়গা বা রাজ্য হিসেবে বিবেচনা করে পড়া উচিৎ। আমার চলচ্চিত্রের আরেকটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, বিনোদিনীর চাদরে লাল রঙের ব্যবহার। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে লাল এর অর্থ ছিল ‘আবেগ’। কিন্তু পুরো বিশ শতক আমাদের শিখিয়েছে, বিপ্লবের প্রতীকও লাল। তাই ২০০৩ সালে আমি যখন লাল রং ব্যবহার করছি তখন সেটা আর ‘আবেগ’ থাকেনি, বিপ্লবে পরিণত হয়েছে। এখানে আমি ঠাকুরের চেয়ে এগিয়ে, কারণ গত একশ বছরে তার কোন অর্জন নেই।

কলকাতার শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ঐতিহ্য একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে আপনাকে কতটুকু প্রভাবিত করেছে?

প্রচুর। চিত্রকর পরিবারে জন্মেছি আমি, তাই ঠিক ছোটবেলা থেকেই চিত্রপ্রদর্শনীতে যুক্ত ছিলাম। এখন আমি বুঝতে পারি, আমার ভিজু্য়্যাল ট্রেনিং তখন থেকেই শুরু। আমি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়লেও বাড়িতে মাতৃভাষা চর্চার কমতি ছিল না। আমার বয়স যখন ছয়, আমার বাবা আমাকে বাংলাভাষায় অনূদিত ‘মহাভারত’ উপহার দিয়েছিলেন। এবং আমি একটার পর একটা অধ্যায় সশব্দে পড়ে ফেলি। যদি কোন শব্দের অর্থ আমি বুঝতে না পারতাম যেমন, ভ্যু (চক্রভ্যু); তখন বাবা বলতেন, পড়তে থাকো, বুঝতে পারবে। আমাকে অভিধান দেখার চর্চার মধ্যে রাখতেন তিনি। এবং পেন্সিল ছাড়া অন্যকিছু দিয়ে বই দাগাতে নিষেধ করতেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পত্রিকা পড়তে গেলে আমার হাতে একটা পেন্সিল থাকে।

সাউথ পয়েন্ট স্কুল থেকে যখন যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে গেলাম, তখন সেটা ছিল পটভূমি ও আদর্শের গলনপাত্র। কলকাতা তখন বামদের শহর হয়ে উঠেছে। বামপন্থী হয়ে ওঠা তখন প্রায় ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতিতে পড়ার সময় আমিও মার্ক্স পড়েছিলাম। আমি চলচ্চিত্র উৎসবে যেতাম। সেখানে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র দেখে সিদ্ধান্ত নিই, চলচ্চিত্র নির্মাতাই হব আমি। এর আগেও তার কিছু চলচ্চিত্র আমি দেখি। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ‘কলকাতা দূরদর্শন’ আসার পর সত্যজিতের সবগুলো চলচ্চিত্র দেখার পর আমার চোখ খুলে যায়। এ জন্যে টেলিভিশনের প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

আপনি সত্যজিৎ রায়ের কথা বললেন। ৬০-এর দশক পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্র খুব জনপ্রিয়। গত কয়েক দশকে সেরকম কিছু পরিবর্তন কি ঘটেছে?

আপনি জানেন, তপন সিনহা এবং তরুণ মজুমদারের মতো বাঙালি পরিচালকেরা জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের দলে জায়গা করে নিয়েছেন। কারণ, তাদের জন্যে অন্য কোন জায়গা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। তারাও কিন্তু বাস্তববাদী। তবে তাদের বাস্তবতা নির্মাণের পদ্ধতিগুলো সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক কিংবা মৃনাল সেন-এর থেকে ভিন্ন। বর্তমানে অভিনেতারা গ্রহণযোগ্য অভিনয়ের জন্যে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের চলচ্চিত্রে কাজ করেন। বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে এটা কোনো ব্যাপারই ছিল না।

এই বছর (২০০৮) সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যখন সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেলেন। আমি বলছি, আপনি যদি তার একই ধাঁচের চলচ্চিত্রের অভিনয়টাকে পাশে সরিয়ে রাখেন তাহলে দেখবেন, শুধুমাত্র জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তার নিজস্ব ভূমিকার জন্যে তিনি এই পুরস্কার পেতে পারেন। একই লেখক, একই ধরনের ভাবপ্রবণতায় চলচ্চিত্রায়ণ করা হলো: অজয় কর-এর ‘সপ্তপদী’ এবং সত্যজিৎ রায়-এর ‘জলসাঘর’ দুটোই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পে নির্মিত। শুধুমাত্র চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলীটা আলাদা।

আমি মনে করি এখন বাংলা চলচ্চিত্র তার সাহিত্যের শেকড় থেকে বিচ্যুত হয়েছে। সংস্কৃতির সঙ্গে এর যে গভীর সম্পর্ক তাও নুইয়ে পড়েছে। তবে চলচ্চিত্র যে শুধু সাহিত্যিক সংশ্লিষ্টতায় থাকবে তা নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই বলেছেন, এটা (গল্প-উপন্যাস) যদি শুধুমাত্র মূল গল্প থেকে একটু সরে যায় তাহলেই সেটা প্রকৃত চলচ্চিত্র হয়ে উঠবে। কিন্তু চলচ্চিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি বাংলায় এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এরা বর্ণনা করার প্রবণতা ছাড়তে পারে না, যে কারণে চলচ্চিত্রের গল্প নিকৃষ্ট মানের হয়ে ওঠে।

কোন ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতার কাজ আপনার ভালো লাগছে?

আবারো বলছি, ‘কলকাতা দূরদর্শন’ থেকে আমি হিন্দী, বাংলা সব ধরনের চলচ্চিত্র দেখেই বড় হয়েছি। আমি চলচ্চিত্রের বিচারক নই। যে কারণে আমি সব ধরনের চলচ্চিত্র বানাতে পারি নি কিন্তু সব ধরনের চলচ্চিত্র দেখতে পারি। আমার ইচ্ছানুযায়ী ‘রক অন’ও দেখতে পারি কিংবা ‘তারে জামিন পার’ও দেখতে পারি। আমি ফারহান আখতারের কাজও যেমন উপভোগ করতে পারি তেমনি ফারাহ খানের কাজও।

নাসিরউদ্দীন শাহ’র প্রথম চলচ্চিত্র ‘ইউ হোতা তো কিয়া হোতা’ (২০০৬) আমার খুবই পছন্দ। বিশাল ভরদ্বাজের কাজও আমার খুব পছন্দ। এবং ‘হানিমুন ট্রাভেলস’ ও ‘মিথ্যা’সহ সব ধরনের নতুন চলচ্চিত্রই আমার খুব ভালো লাগে। আমি মনে করি, সঞ্জয় লীলা বানসালি একজন গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাতা। যদিও তার কিছু চলচ্চিত্র নিয়ে আমার ভিন্নমত রয়েছে। মনিরত্নম, আদর গোপালকৃষ্ণ, অপর্ণা সেন, শ্যাম বেনেগালসহ আরো অনেকের চলচ্চিত্রই আমার পছন্দের। শ্যাম বেনেগালকে আমি সর্বশেষ ভারতীয় রেঁনেসা বলে মনে করি।

আপনি শুধু বাঙালি অভিনেতাদের সঙ্গেই কাজ করেননি, প্রায় সময় বোম্বের অভিনেতাদের সঙ্গেও কাজ করেছেন। এমনকি দুটি চলচ্চিত্র বাংলা ভাষা ছাড়াও অন্য ভাষায় বানিয়েছেন। ‘রেইনকোট’ এবং ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ চলচ্চিত্র দুটি যে হিন্দী ও ইংরেজি ভাষায় নির্মাণ করলেন, সেটার কি অন্তর্নিহিত কিছু ব্যাপার ছিল?

‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ শুধুমাত্র ইংরেজিতেই নির্মাণ করা যেতে পারে। কিন্তু ‘রেইনকোট’ খুব সহজেই বাংলাতে হতে পারে। এটা সম্ভবত হিন্দীতে নির্মাণ করাই উচিৎ ছিল। কিন্তু আমি যদি শুধুমাত্র বাঙালি অভিনেতা নিয়েই কাজ করতে থাকি, তাহলে প্রতিভার এক বিশাল জায়গাকে আমার অস্বীকার করতে হবে। হিন্দীভাষী অভিনেতা দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণের চেয়ে, হিন্দীতে চলচ্চিত্র নির্মাণই আমার কাছে সহজ মনে হয়। ‘সানগ্লাস’ চলচ্চিত্রে যেমন বাংলা ও হিন্দী ভাষায় নাসিরউদ্দীন শাহ’র একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। হিন্দী-বাংলা দুই ধরনের ডায়ালগেই তিনি হিন্দী ভাষা ব্যবহার করেছেন, কারণ তিনি বাংলা বলতে পারেন না।

আমি মনে করি, বহুভাষী চলচ্চিত্রের ধারণা নিয়ে আমাদের একটু ভেবে দেখা দরকার। যখন আমরা চলচ্চিত্রের সমন্বয় নিয়ে কথা বলি, তখন শুধু ভারতীয় চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক চেতনা নিয়েই কথা বলি। কিন্তু দেশের ভিতরের চলচ্চিত্র নিয়ে আমরা ব্যাপক আলাপ করতে পারি। ‘রোজা’র মতো চলচ্চিত্রের কথাই ধরুন, যেখানে একজন তামিল মেয়ে বুঝতে পারে সে আর কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না এবং ভাষার পরিবর্তে সে প্রতীকী ভাষা ব্যবহার করে-এই ধরনের তিক্ততা হিন্দী ডাবিং থেকে হারিয়ে গেছে। এরকম সম্ভাবনাময় চলচ্চিত্রের বাজারজাত করার বুদ্ধি কেউ দেয় নি। আমরা রীতিবিরুদ্ধ চলচ্চিত্র নির্মাণ করি এবং গতানুগতিক চলচ্চিত্রের বাজারের সঙ্গে সেগুলোকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু যদি নির্মিত চলচ্চিত্রের এক-পঞ্চমাংশও ঠিকঠাক বাজারজাত করা হয় তাহলে আমি আশা করি ভিন্ন ধরনের একটা চলচ্চিত্র শিল্প আমাদের গড়ে উঠবে।

আপনার চলচ্চিত্রে যেমন ‘দহন’ ‘বাড়িওয়ালি’ ‘অন্তরমহল’ ‘শুভ মহরত’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে জটিল নারীচরিত্র দেখা যায়। যেখানে পুরষ চরিত্র অনুপস্থিত থাকে, অনেক সময় পুরুষ চরিত্রকে দুর্বলভাবে কিংবা দানবীয়ভাবে হাজির হতে দেখা যায়। এই চরিত্রায়ণের সঙ্গে আপনি কি একমত?

আমি মনে করি ‘দহন’-এ নারীকে মহিমান্বিত করেছি এবং পুরুষের প্রতি ভয়ঙ্কর বিচার করেছি, যেটা খুবই সোজা ছিল। কিন্তু দুর্বলতার বিষয়টি নিয়ে আমি খুবই আগ্রহী ছিলাম। আমি পিতৃতান্ত্রিকতার বিরোধী। একজন নারী ও অপরজন পুরুষ হলেও ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’-এর হ্যারি চরিত্রটি থেকে ‘বাড়িওয়ালি’র বনলতার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। দু’জনই একটা ক্ষমতা কাঠামোর লোভ ও রাজনীতিতে পীড়িত। এটাকে আপনি ‘ধূর্ত পিতৃতন্ত্রশাসিত সমাজ’ বলতে পারেন।

কার্যত, শিল্পবিশ্বে, বিশেষভাবে চলচ্চিত্রে তারকার ধারণা যা আপনার অনেক চলচ্চিত্রের মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায় সেই ‘উনিশে এপ্রিল’ এরপর ‘তিতলি’, ‘বাড়িওয়ালি’ এবং ‘শুভ মহরত’ থেকে ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’-এর মধ্যে।

খ্যাতির সঙ্গে আসা ক্ষমতাগুলো অনুধাবনে আমার বেশ আগ্রহ আছে। এবং যেটার পেছনে মানুষের দুর্বলতা রয়েছে তা মানুষ অস্বীকার করতে চায়। এবং যে কারণে আমার কাজ দেখানো, ক্ষমতার চর্চা, নিয়ন্ত্রণ ও কারসাজির বিষয়গুলো সেখানে উপস্থিত রয়েছে।

মাঝে মাঝে একটা কথা শোনা যায় যে, আপনার চলচ্চিত্র পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নয় কিংবা অনেকেই মনে করেন এগুলা ‘নাট্য-চিত্র’। এ ব্যাপারে আপনার জবাব কী?

যদি আউটডোরে শুট করা হয় তাহলে সেটা চলচ্চিত্র আর ইনডোরে করা হলে সেটা নাটক-এ ব্যাপারে মানুষের একটা সাধারণ ধারণা আছে। এই মানদণ্ডে বিচার করলে শুধুমাত্র কুরোশাওয়ারটা চলচ্চিত্র, বার্গম্যানেরটা নয়। তাহলে ‘চেম্বার নাটক’ (ছোট কক্ষে অল্প অভিনেতা নিয়ে নির্মিত)-কে আপনি কী বলবেন? যেটা বার্গম্যানের প্রমাণিত চমৎকার চলচ্চিত্র। আমি বলছি না, বার্গম্যানের কিংবা আমার নির্মিত ‘রেইনকোট’ একটি মহান চলচ্চিত্র। কিন্তু ন্যায়সঙ্গত ধারায় আমার চলচ্চিত্রকে স্বীকৃতি না দেয়াটাকে আমি অগণতান্ত্রিকভাবেই দেখি কিছুটা।

এমন কোনো চলচ্চিত্র কি নির্মাণ করেছেন যেখানে অন্যান্য চলচ্চিত্রের তুলনায় আপনি একটু বেশি সংযুক্ত করেছেন?

যে চলচ্চিত্রগুলো নিন্দিত হয়েছে কিংবা দর্শক জনপ্রিয়তা পায়নি সেগুলোকে সংরক্ষণ করে রাখার প্রবণতা একজন চলচ্চিত্রকারের মধ্যে সব সময়ই থাকে। তাই আমি বলবো ‘অন্তরমহল’র কথা, যেটাকে আমি খুব শক্তিশালী চলচ্চিত্র বলে মনে করি এবং ‘অসুখ’ এবং ‘দোসর’ যেগুলো অল্প দেখা। তবে বলতেই হয়, ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’র সঙ্গে আমি খুব বেশি যুক্ত।

‘হীরের আঙটি’ নামে আপনি শিশুতোষ চলচ্চিত্র এবং রহস্যমূলক চলচ্চিত্র ‘শুভ মহরত’ নির্মাণ করেছেন। এই ধরনের চলচ্চিত্র আবার জনপ্রিয়তা পাবে বলে আপনি কি মনে করেন?

রঙ্গ পিসিমা (‘শুভ মহরত’র চরিত্র রাখী) নিয়ে আমি একটি পুরো গোয়েন্দা সিরিজ নির্মাণ করতে চেয়েছিলাম। বাছ-বিচারহীন অপরাধের কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ একটু কঠিনই যেটা আমি ‘শুভ মহরত’-এ দেখানোর চেষ্টা করেছিলাম। একটা ধূসর চরিত্র, পুলিশের কোনো হস্তক্ষেপ নেই, কিচ্ছু নেই। গোয়েন্দা জানে অপরাধ কে করেছে কিন্তু তিনি কিছইু করছেন না। ইচ্ছাকৃতভাবেই নারীকে আমি অপরাধী এবং গোয়েন্দা হিসেবে দেখিয়েছি। কারণ জন্মগতভাবেই তারা অতিমাত্রায় সহনশীল। একটা খুব সাধারণ গল্প যেখানে শিকারী এবং শিকারের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক ছাড়া আর কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু কার্যকরীভাবে আপনি একজনের প্রতি আচ্ছন্ন না হলে কীভাবে এতোটা আবেগশূন্য হতে পারেন?

উৎপল দত্তের ‘আজকের শাহজাহান’কে কীভাবে আপনি ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ এ রূপান্তরিত করলেন? মূল নাটক থেকে চলচ্চিত্রের কি কিছু পরিবর্তন হয়েছে?

কলেজের ছাত্রাবস্থায় আমি ‘আজকের শাহজাহান’ দেখেছিলাম এবং এটা খুব চলছিল। থিয়েটারের সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক কী-সেই সময়ে এই প্রশ্নটি আমার মাথায় আসে। এবং উৎপলদাকে আমি বাংলার প্রেক্ষাপটে আনতে চেয়েছিলাম। হিন্দী চলচ্চিত্রে তিনি শুধুমাত্র কৌতুক অভিনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তার মধ্যে চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ করার সম্ভাবনা ছিল প্রবল। বয়স্কদের দূর্বলতা নিয়ে মূল নাটকটি লেখা। সেখানে শাহজাহান এবং তার কন্যা জাহানারার মধ্যে একটা সম্পর্ক রয়েছে অনুরূপভাবে লিয়ার এবং কর্ডেলিয়ার মধ্যেও এরকম সম্পর্ক রয়েছে। তাই যখন আমি বিশ্বজনীন আবেদন দিয়ে কিছু একটা করার চিন্তা করলাম তখন স্বাভাবিকভাবেই শেক্সপিয়রের কাছে চলে এলাম। আর এভাবেই ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ জন্ম নিল।

এখন কি নিয়ে কাজ করছেন?

অনেক কিছু নিয়েই। কিন্তু আমি বিশেষ করে মহাভারত নিয়ে কিছু করার চেষ্টা করছি। আর আমি মনে করি এখনই এ নিয়ে করা প্রয়োজন, কারণ অনেক সময়ই একে ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে যা সত্যি নয়। এটা মহাকাব্য। এর দিকেই আমার ঝোঁক সবচেয়ে বেশী।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : ঋতুপর্ণ ঘোষ : চলচ্চিত্র ও ভাবনায়

Facebook Comments