মাহমুদ দারবিশ : বিশ্বের দরবারে ফিলিস্তিনের দূত

share on:
মাহমুদ দারবিশ

মাহমুদ দারবিশ ফিলিস্তিনের মানবতাবাদী কবি ও প্রতিবাদী কবি। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামের প্রতীক। তার বেশিরভাগ কবিতাই ফিলিস্তিনকে ঘিরে আবর্তিত। শুধু ফিলিস্তিন নয়, গোটা আরবজুড়েই তার সুখ্যাতি। তিনি ছিলেন আরবি কবিতার উন্নয়ন প্রতিভূ।

মাহমুদ দারবিশ ১৯৪২ সালের ১৩ মার্চ ফিলিস্তিনের পশ্চিম গ্যালিলির আল-বিরবা গ্রামে জম্মগ্রহণ করেন। তার বিপ্লবী ধারার কবিতা আরবি সাহিত্যকে নতুন ধরনের আমেজ দিয়েছে। তিনি বাস্তবতা ও মেটাফরের মাধ্যমে কবিতায় ফিলিস্তিনকে হাজির করেছেন। তার লেখনি পরবর্তীকালের অনেক সাহিত্যিককে প্রভাবিত করেছে।

তার বাবার নাম সেলিম ও মা হাওরিয়াহ। এ দম্পতির দুই ছেলের মধ্যে তিনি কনিষ্ঠ। তার পড়াশোনার হাতেখড়ি দাদার কাছে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন দখলের সময় তার বয়স ছিল ছয়। ইসরাইলি সৈন্যদের দ্বারা গ্রাম আক্রান্ত হলে তারা প্রায় ৩৬ ঘণ্টা ক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে ছিলেন। পরে আশ্রয় নেন লেবাননে। ১ বছর পর ফিরে আসেন ফিলিস্তিনে। কিন্তু ততদিনে তাদের গ্রামের কোনো অস্তিত্ব নেই। তারা দাইরুল আছাদ নামক স্থানে স্থিতু হন। তবে ইসরাইলি সরকারের দৃষ্টিতে তারা ছিলেন অবৈধ অভিবাসী। কাফার ইয়াসিফ গ্রামে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন।

১৯৬০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর হাইফা চলে যান। সেখানে জড়িয়ে পড়েন কমিউনিস্ট পার্টি ‘রাকা’র সঙ্গে। সে সময় দলটির মুখপত্র আল ইত্তেহাদ সম্পাদনা ও অনুবাদের কাজ করতেন। পরে সাপ্তাহিক আল জাদিদ সম্পাদনা করেন। তখন থেকেই ফিলিস্তিন মুক্তি সংগ্রামের একটি শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠেছিল তার কবিতা। গ্রামে গ্রামে আমছিয়া বা সান্ধ্য কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান করতেন। কিন্তু শঙ্কিত ইসরাইলি সরকার এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সৈন্যরা তাকে সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত গৃহবন্দি করে রাখত।

১৯৭০ সালে ইউনিভার্সিটি অব মস্কোতে ১ বছরের জন্য পলিটিক্যাল ইকনমি পড়তে যান। ১৯৭১ সালে কায়রোতে দৈনিক আল আহরামে কাজ করেন। ১৯৭৩ সাল থেকে বৈরুতের সেন্টার ফর প্যালেস্টাইন এফেয়ার্স প্রকাশিত প্যালেস্টাইন এফেয়ার্সের সম্পাদনা করেন। সে সময় তিনি পিএলও (প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন)-তে যোগ দেন। এক পর্যায়ে তাকে আন অফিসিয়াল পয়েট অব প্যালেস্টাইন ঘোষণা করলে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি দলের এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও লেখেন। কিন্তু ১৯৯৩ সালে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পাদিত ‘অসলো’ চুক্তির প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। ১৯৮২ সালে ইসরাইল যখন লেবানন আক্রমণ করলে তিনি প্রথমে তিউনিস ও পরে কায়রো চলে যান। অবশেষে প্যারিসে স্থায়ী হন। এ ছাড়া ১৯৮১ সালে আল কারমেল নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন।

ফিলিস্তিনি জনগণের সর্বস্তরেই তার জনপ্রিয়তা ছিল। তিনি ছিলেন বিশ্বের দরবারে ফিলিস্তিনের দূত। আত্মপরিচয় ও মুক্তির দাবি ছিল তার কবিতার পরতে পরতে। কবিতা ও গদ্য মিলিয়ে তার ৪০টির বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে। কবিতার বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- আসাফির বিলা আজনিহা (১৯৬০), আওরাক আল-জায়তুন (১৯৬৪), আসিক মিন ফিলিস্তিন (১৯৬৬), আখির আল-লাইল (১৯৬৭), আহাদ আসের কাওকাবান (১৯৯২), জিদারিয়াহ (২০০০), হালাত হিসসার (২০০২), আল আমাল আল জাদিদা (২০০৪) এবং দ্য বাটারফ্লাই বার্ডেন (২০০৭)।  বিশ্বের প্রায় পঞ্চাশটি ভাষায় তার লেখা গ্রন্থ অনুবাদ হয়েছে এবং সকল ভাষায় অনুবাদকৃত বই ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।  বাংলাদেশে তার অনুদিত কবিতা ও কবিতা নিয়ে প্রবন্ধের বেশ ক’টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

জীবদ্দশায় তিনি অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- দ্য লোটাস প্রাইজ (১৯৬৯), লেনিন পিস প্রাইজ (১৯৮৩), দ্য নাইট অব দ্য অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটারস (১৯৯৩), দ্য লেননান ফাউন্ডেশন প্রাইজ ফর কালচারাল ফ্রিডম (২০০১), প্রিন্স ক্লস এওয়ার্ড (২০০৪), বসনিয়ান স্টিকেক (২০০৭) ও গোল্ডেন রিদ অব স্ট্রাগা পোয়েট্রি ইভিনিংস (২০০৭)।

তিনি দুইবার বিয়ে করেন। দুইবারই ডিভোর্স হয়ে যায়। তার কোনো সন্তান ছিল না।

মাহমদ দারবিশ ২০০৮ সালের ৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এক উইলে তাকে ফিলিস্তিনে দাফন করার জন্য বলে যান। তাকে রামাল্লায় দাফন করা হয়। শেষকৃত্যে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তার মা।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : জীবনানন্দ দাশ : বাংলা ভাষার শুদ্ধতম কবি

Facebook Comments