মহারাজার দিঘী

share on:
মহারাজার দিঘী

মহারাজার দিঘী , দেখতে সাধারণ একটি দিঘী কিন্তু এর ইতিহাস মোটেও সাধারণ নয় । প্রায় দেড় হাজার বছর পুরনো সে ইতিহাস ।

সময় পেলে প্রায় দিঘীর পাড়ে শতবর্ষী গাছের নিচে ঝিরিঝিরি বাতাস গায়ে লাগিয়ে বসে ভাবি কেমন ছিল দেড় হাজার বছর আগের সময় কেমন ছিল রাজা রাজরা দের জীবন যাপন সংস্কৃতি, কত রকম জীব জন্তু পশু পাখি ছিল সে সময়।

বলছি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ দুর্গনগরী ভিতরগড় এর কথা । পঞ্চগড় শহর থেকে ১৫ (পনের) কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত ভিতরগড় দুর্গনগরী।

প্রাচীন যুগের একটি বিরাট কীর্তি। প্রায় ১২ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে এই বিশাল গড় ও নগরীর অবস্থান। মাঝামাঝিতে একটি বিশালাকায় দিঘী । বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস লুকিয়ে আছে এর মাটির নিচে । পুরো একটি সভ্যতা কালের বিবর্তনে মাটি চাপা পড়ে আছে ভিতরগড়ে । মাটি চাপা পড়ে আছে আমাদের গৌরবান্বিত ও সমৃদ্ধির ইতিহাস ।

প্রায় বারো বর্গ মাইল এলাকা জুড়ে এক দুর্গ নগরীর বিস্তৃত । ১৯৪৭ এ দেশ ভাগের সময় এর কিছু অংশ ভারতের মধ্যে পড়েছে । ঐতিহাসিকদের মতে এ দুর্গ নগরীর গোড়াপত্তন ঘটে শুদ্রবংশীয় রাজা দেবেশ্বরের উত্তরসূরি পৃথু রাজার হাতে । তিনি কামরূপে সম্রাট হর্ষবর্ধনের বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে এ অঞ্চলে এসে এই রাজ্য নির্মাণ করেন । নির্মাণ করেন রাজ প্রাসাদ , মন্দির , খনন করেন একটি বিশালাকায় দিঘী যেটা এখন মজারাজার দিঘী নামে পরিচিত ।

রাজ্যের সুরক্ষার জন্য রয়েছে চারটি আবেষ্টনী দেয়াল যা দিয়ে পরিবেষ্টিত ভিতরগড় দুর্গনগরী যা বাংলাদেশে অদ্বিতীয়।পৃথু রাজা রাজধানীকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য চার দিকে নির্মাণ করেন সুউচ্চ মাটির প্রাচীর । এর নাম ছিলো গড়। গড় মানে হচ্ছে, মাটির তৈরী উচু প্রাচীর। এখনো সেই মাটির প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ফিরোজ আল সাবাহ
ফিরোজ আল সাবাহ, আলোকচিত্রী।

চারটি বেষ্টনীর মধ্যভাগে রাজ প্রাসাদ অবস্থিত। তার পরের বেষ্টনী গুলোতে জাত অনুযায়ী রাজার প্রজারা থাকতেন। কথিত আছে পৃথু রাজা পরিবার-পরিজন ও ধনরত্নসহ ‘‘কীচক’’ নামক এক নিম্ন শ্রেণীর দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়ে তাদের সংস্পর্শে ধর্ম নাশের ভয়ে উক্ত দিঘীতে আত্মহনন করেন। তারপর কি হল এই রাজ্যের? জানতে বড় ইচ্ছে হয় ।

ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রত্নতাত্তিক দলের নেতৃত্বে সেখানে ক বছর আগে স্বল্প পরিসরে খনন কার্য পরিচালনা করা হয় । নদীর পানিকে কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য পাথরের বাধ এর ও নিদর্শন ও পাওয়া যায় । এযাবৎ আবিষ্কৃত আটটি স্থাপনার ভিত্তি কাঠামো থেকে লাল ও ধূসর রঙের নকশাখচিত মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ, লোহা ও তামার তৈরি জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। মৃৎপাত্রের মধ্যে আছে থালা, বাটি, হাঁড়ি ও মাটির প্রদীপ।

প্রায় আমরা দলবলে ছুটে যাই ভিতরগড় । সমতলের চা দেখতে, ঘুরে বেরাই ভিতরগড়ে এদিক সেদিক চোখ বন্ধ করলেই টাইম মেশিনের মত ফিরে যাই সে সময় । কল্পনার তোড়ে চোখের সামনে ভেসে উঠে একটি দুর্গনগরী , একটি রাজা ও তার রাজ্য । চোখ খুলে নগরীর নিদর্শন গুলো দেখলে মনে হয় কোন এক সময় সভাসদদের নিয়ে আলোচনায় বসতেন রাজা । রাজ্য নিয়ে বিস্তর আলাপ আলোচনা হত । শুনতেন প্রজাদের অভিযোগ । রাষ্ট্রে কখনো বিপদ এলে রাজা ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করতেন । যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে সৈনিকেরা তরবারি হাতে প্রস্তুত হতেন, ঘোড়ার খুড়ে আঘাতে প্রকম্পিত হয় সুরক্ষা গড় গুলো । কালের বিবর্তনে আজ সেখানে গড়ে উঠেছে নতুন সভ্যতা ।

একটি পুরো দুর্গ নগরী,একটি সভ্যতা হাজার নিদর্শন সমেত মাটি চাপা পড়ে আছে পঞ্চগড়ে ভাবা যায় । অযত্ন ও অবহেলায়, এমন মহামূল্য প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন রক্ষায় নেই কোন পদক্ষেপ । কর্তৃপক্ষ সাইনবোর্ড দিয়ে পগার পার । সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে যদি এই ভিতরগড় দুর্গনগরী কে তুলে ধরা যায় পৃথিবীর নিকট তাহলে সারা পৃথিবীর মানুষ ছুটে আসবে দেড় হাজার বছর পুরনো এই নগড় সভ্যতা দেখতে । হাজার মানুষের চিন্তার খোড়াক যোগাবে এই ভিতর গড় ।

এসব নিয়ে আমাদের মাথা ব্যাথা নেই , আমরা জাতি হিসেবে খুব কুলাঙ্গার , টাকার পিছনে ছুটতে ছুটতে ভুলে গেছি আমাদের সমৃদ্ধির ইতিহাস । মাটি খনন করে আমাদের পাথর তুলতে ভালো লাগে কিন্তু ইতিহাস বের করতে ভালো লাগে না । তাতে কাচা টাকা নেই যে ।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : জিম জারমুশ : সিনেমা নির্মাণে পাঁচ পরামর্শ

Facebook Comments
ফিরোজ আল সাবাহ

ফিরোজ আল সাবাহ

ফিরোজ আল সাবাহ শখের আলোকচিত্রী। ছবি তোলা ছাড়াও তিনি নিজ এলাকায় কাজ করছেন প্রাণী সংরক্ষণে মানুষকে সচেতন করতে। পারিবারিক ব্যবসা আর কৃষিজমি দেখাশোনার ফাঁকে ছুটে বেড়ান ক্যামেরা কাঁধে। সাবাহর তোলা ছবিটি ভাবনার খোরাক জোগায়, চোখকে স্বস্তি দেয়। স্বশিক্ষিত এই আলোকচিত্রী ছবি নিয়েই থাকতে চান; চান নিজের জেলা পঞ্চগড়ের রূপবৈচিত্র্য সবার সামনে তুলে ধরতে।