করোনার সময়কার প্রেম।মেঘদূত রুদ্র

share on:
করোনা সময়ের প্রেম

আমি একবার একটি মেয়ের প্রেমে পরেছিলাম। হ্যানা ত্যানা করার পর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে আমার মনে কথা জানিয়েছিলাম। এটা তখন বুঝি নি যে আমার বলার আগেই সে সেটা বুঝে গেছিল।

কিন্তু বলার পর সে না বলল। আমি তার এক বন্ধুকে আমার অবস্থা বললাম। সে হয়ত ওকে বুঝিয়ে ছিল। আমার অস্থির অস্থির লাগছিল কিন্তু আমি ধৈর্য ধরে ছিলাম। মেয়েটি বলল যে ‘আমরা বন্ধু হয়ে থাকতে পারি’। আমি বললাম ‘না’। আমি মনে মনে মেয়েটিকে প্রচুর খারাপ খারাপ কথা বললাম। তারপর কিছুদিন কেটে গেল। আমি ঠিক করলাম যে কোনদিনও মুখ দেখবো না। ওর থেকে সুন্দরী প্রেমিকা জুটিয়ে তাঁকে দেখিয়ে দেবো।

এরপর আমি আরেকটি মেয়ের প্রেমে পরেছিলাম। হ্যানা ত্যানা করার পর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে আমার মনের কথা জানিয়েছিলাম। এটা তখন বুঝি নি যে আমার বলার আগেই সে সেটা বুঝে গেছিল। এবার সে হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না। তারপর পর পর কিছুদিন ধরে ও আমাকে ওর বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কথা বলতে লাগলো। প্রথম প্রথম আমি শুনলাম। মনে জেদ ছিল। কিছু কথা বললাম। কি বললাম সেটা মনে নেই। কিন্তু ক্রমশ আমার মানসিক চাপ বাড়তে লাগল। বন্ধুরা বলল এই সমস্যাজনক মেয়েটাকে কাটিয়ে দে। আমি ওর শরীর কল্পনা করতাম তাই মন মানছিল না। আমি দ্বিধাগ্রস্ত হলাম। আমি ওর সাথে কথা বলতে চাইছিলাম কিন্তু কি বলব বুঝতে পারতাম না। ওর মুখে সেই সময় একটা স্মিত হাসি থাকত। আমার গা জ্বলে যেতো। এরকম হাসি ওর মুখে আগেও দেখেছি। তখন গা জ্বলে নি।  সেই সময় আমি ওকে নিয়ে মেলায় ঘুরতে যেতাম, কফি খাওয়াতাম। ওর কোন কথায় আমাকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কথা থাকত না। পুরটাই ক্যাসুয়াল কথা। আমার গা আরও জ্বলে যেত। এর পরেও আমি ওকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতাম, স্কুটিতে করে ঘোরাতাম। তারপর আস্তে আস্তে সব বন্ধ হয়ে গেল।

এরপর আমি আরেকটি মেয়ের প্রেমে পরেছিলাম। হ্যানা ত্যানা করার পর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে আমার মনে কথা জানিয়েছিলাম। এটা তখন বুঝি নি যে আমার বলার আগেই সে সেটা বুঝে গেছিল। এবার সে না বলল। জানতাম কিছুদিন আগে ব্রেক-আপ হয়েছে। বুঝলাম সেটা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু কেন জানিনা এবার আমি ভেতরে ভেতরে খুবই নাছোড়বান্দা হয়ে পড়লাম। ঠিক করালাম যাই হয়ে যাক এই প্রেম আমি করেই ছাড়ব। ও যতই প্রথম আর দ্বিতীয় মেয়েটির মত কথাবার্তা বলত আমি ততই তাকে বুঝিয়ে দিতাম যে ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না। মনের গভীরে যা যা কথা তৈরি হচ্ছিল সেগুলো ওকে বলতে লাগলাম। ও স্মিত হাসত। আমার গা জ্বলত না। ও বলত আমরা দুজন সম্পূর্ণ আলাদা লোক। আমাদের কিছু মেলেনা। এটা অবশ্য দ্বিতীয় মেয়েটিও বলেছিল। কিন্তু আমি তত বলতাম যে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। অন্য প্রায় কোন কথার গুছিয়ে উত্তর দিতে পারতাম না। কিন্তু নিজের সত্যে অবিচল থাকতাম। কখনো হয়ত দু’দিন কথা হল না। তীব্র যন্ত্রণা হত। মন ভেঙ্গে খান খান হয়ে যেত প্রতিটা মুহূর্তে। অনেক রাতে ঘুমিয়ে পরতাম। পরেরদিন আমার নতুন করে চেষ্টা শুরু করতাম। নিজের অজান্তে যতটা অ্যাটেনশন আমার ওকে দেওয়া সম্ভব ছিল সেটা দিচ্ছিলাম। তখন উপেক্ষাতে অভিমান হত কিন্তু রাগে গা জ্বলত না। আমি ওর শরীর কল্পনা করতাম এবং সেটা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমাকে দিয়ে অসাধ্য কাজ করিয়েছিল। একদিন বরফের চাই ভাঙল। চুমু খেয়েছিলাম। অনুমতি নেই নি। পরে বলেছিল যে ‘নেওয়া উচিত ছিল’। কিন্তু বরফ গলে জল হয়েছিল। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু কিছু বছর পর আমার এই প্রেমটা কেটে গেছিল। দুঃখ হয়েছিল। কিন্তু সেই চুমুর স্বাদ এখনও মাঝে মাঝে মনে পরে। খারাপ অভিজ্ঞতা গুলো আর মনে পরেনা। তারপর আবার আমার প্রেম হয়েছিল। কারণ আমি প্রেমে বাঁচতে চাই। কারণ আমি বাঁচতে শিখে গেছি।

আপনারা ভাবছেন এর সাথে করোনা ভাইরাসের কি সম্পর্ক। মেয়েরা কি চায় সেটা আন্তরিক ভাবে চেষ্টা করলে একটা সময় পর সেটা বুঝে ফেলা যায়। তখন আর ব্যাপারটা অতটা জটিল মনে হয়না। সরল মনে হয়। করোনা ভাইরাসের সাথে আমার হ্যানা ত্যানা প্রেমগুলিরও সেরকমই সরল সম্পর্ক। প্রথম দু-বারের ব্যর্থতা থেকে আমি যা বুঝেছিলাম সেটা হল হয়ত আমার ভালোবাসায় ততটা জোর ছিলনা। মিথ্যে ছিল এটা বলব না কিন্তু কিছু একটার অভাব ছিল। তৃতীয় বারেও সেই অভাবটা ছিল (এ বিষয়ে আজীবন কিছু না কিছু অভাব থাকে। থাকবে। আলাদা প্রসঙ্গ।)  কিন্তু প্রথম দুবারের ব্যর্থতা আর না পাওয়ার তীব্র বেদনা আমার সহ্যশক্তিকে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। অনেকটা মরিয়া করে দিয়েছিল। বাধ্য করেছিল নিজের ইগোকে ওভারকাম করতে। সত্যের অনেকটা কাছাকাছি এনে দিয়েছিল আমাকে।

এবার ‘প্রেমিকার’ যায়গায় ‘বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছা’কে নিয়ে আসুন। অদল বদল করে নিন। তারপর বেঁচে থাকার যে অসম্ভব আনন্দ তাকে সম্মান করুন, শ্রদ্ধা করুন, মনে মনে মনে শত সহস্র বার তাকে লালন করুন। একদা প্রেমিকার কাছে নিজের আকুল বক্ষ অঙ্গন যেভাবে খুলে দিয়েছিলেন সেই ভাবে জীবনের কাছে আরেকবার সেই অঙ্গন খুলে দিন। এই ইচ্ছা আপনাকে বাধ্য করবে স্বাস্থ্য বিভাগের সমস্ত নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে। মেনে চলুন। প্রিকশন গুলো নিন। মনে হতে পারে ‘আমি তো ইয়াং। আমার নিশ্চয়ই হবেনা’। কিন্তু আপনার এই মনে হওয়াটা ঠিক নয়। এটা মেনে নিতেও কষ্ট হবে। কিন্তু দাঁত চেপে কষ্ট সহ্য করুন। আর যখন ভয়ে দম বন্ধ হয়ে আসবে তখন আরেকবার বেঁচে থাকার উত্তাল আনন্দকে কল্পনা করুন। সর্তক হোন। কিন্তু ভয় পাবেন না। ‘করোনা’ আপনাকে মারতে পারে আবার নাও মারতে পারে। কিন্তু ভয় আমাদের প্রতি মুহুর্তে মেরে ফেলে। বরং আপনি যা যা করতে চেয়েছিলেন, যা যা আপনার স্বপ্ন সেগুলোকে আরেকবার মনে করুন। নিজেকে প্রতিজ্ঞা দিন ‘একদিন এগুলো আমি করেই ছাড়ব’। ‘একদিন আমি সিনেমা বানিয়েই ছাড়ব’, ‘একদিন আমি লক্ষ মানুষের সামনে গান গেয়েই ছাড়বো’, ‘একদিন আমি দারুণ এক পাত্রের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে হওয়াটা দেখেই ছাড়ব’, ‘একদিন আমি চাকরির সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেই ছাড়বো’, ‘একদিন আমি একটা নির্জন পাহাড়ের কোলে একা একা নেচে বেড়াবো’, ‘একদিন আমি সিঙ্গাপুরে আমার একটা বিজনেস আউটলেট খুলেই ছাড়বো’।

করোনা সময়ের প্রেম
করোনা সময়ের প্রেম

“আমি কোয়ারান্টিনে যাব। দরকার পরলে আইসোলেশনকে মানিয়ে নেবো। মাধবী, এই উত্তাল করোনা সময় পেরিয়ে আমি তোমায় আদর করতে চাই… চূড়ান্ত”।

দেখবেন সব সহ্য হয়ে যাচ্ছে। সব ইগো চলে গেছে। আপনি মরিয়া হয়ে পরেছেন বাঁচবেন বলে। সত্যের অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছেন। আপনি বাধ্য হচ্ছেন সব নিয়ম মেনে চলতে। যদি দেখেন হচ্ছেনা তাহলে পুরো প্রসেসটা আরেকবার করুন। বারবার করুন। ততক্ষণ করুন যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি চিৎকার করে বলতে পারছেন যে ‘আমি বাঁচতে চাই। আমি বাঁচতে যে বড় ভালোবাসি। বাঁচার জন্য আমি আকুল’। এবার দেখি কোন করোনা আপনাকে কব্জা করতে পারে। আসুন সবাই মিলে একসাথে এই করোনাকে হারিয়ে দিই। তারপর এই অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তি জীবনে বাঁচতে শিখে যাই।

পুনশ্চ : প্রিকশন নেওয়ার নির্দেশিকা গুলির জন্য সঠিক যায়গা গুলিতে খোঁজ করুন। সরকারি স্বাস্থ্য দপ্তরে যান। মনে রাখবেন সরকার বিভিন্ন বিষয়ে ধান্দা বাজি করলেও এক্ষেত্রে করবে না। কারণ তাদেরও বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা প্রবল। আগে তো বাঁচতে হবে। তাহলে পরে নাহয়…

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : দ্বিতীয় পুরুষ : তৃতীয় শ্রেণীর একটি ছবি

Facebook Comments
মেঘদূত রুদ্র

মেঘদূত রুদ্র

মেঘদূত রুদ্র, একজন বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাতা , চলচ্চিত্র গবেষক ও আলোচক। নির্মাণ করেছেন ‘জাদু কড়াই’ শিরোনামের চলচ্চিত্র। প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি খ্যাতনামা পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসাবে কাজ করেছেন। এ ছাড়াও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চলচ্চিত্র বিষয়ক আর্কাইভেও বহু বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে মেঘদূতের। সেই সুবাদে বেশ কিছু ডকুমেন্টারিও বানিয়েছেন। অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে ‘বাংলা চলচ্চিত্রের প্রযুক্তি ও আঙ্গিক (১৯৫০-১৯৭০)’ বিষয়ে করেছেন পিএইচডি'র থিসিস। চলচ্চিত্র নিয়ে নিয়মিত রিভিউ লিখছেন পত্রিকায়।