হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড : ‘লস্ট ওয়ার্ল্ড’ সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা

share on:
হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড

হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড একজন বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক। তিনি ইতিহাস আশ্রিত দুঃসাহসিক কাহিনী নিয়ে উপন্যাস লিখে খ্যাতিলাভ করেন।  তিনি এমনসব অঞ্চল নিয়ে লিখেছেন যেগুলো ইংরেজদের কাছে ছিল অনেকটাই অপরিচিত এবং তথাপি অদ্ভুত। সলোমনের গুপ্তধন তার সেরা কীর্তি হিসেবে পরিগণিত। তিনি ‘লস্ট ওয়ার্ল্ড’ ঘরানার সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা।

হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড ১৮৫৬ সালের ২২ জুন ইংল্যান্ডের নরফোকে জন্মগ্রহণ করেন। ডেনিশ বংশোদ্ভূত এই লেখক ছিলেন ১০ ভাই-বোনের মধ্যে অষ্টম। তার বাবা ছিলেন আইনজীবী স্যার উইলিয়াম মেবম রাইডার হ্যাগার্ড এবং মা ইলা ডভেটন ছিলেন লেখক ও কবি। বেশ কয়েকটি প্রাইভেট স্কুলে পড়েন তিনি। মাত্র ১৯ বছর বয়সে নেটাল সরকারের চাকরি নিয়ে চলে যান দক্ষিণ আফ্রিকায়।

৬ বছর পর ফিরে আসেন ইংল্যান্ডে। এর পর তিনি আইনশাস্ত্রে লেখাপড়া শুরু করেন, পাশাপাশি মনোনিবেশ করেন লেখালেখিতে। লিখতে থাকেন একের পর এক চমকপ্রদ কাহিনী। এর মধ্যে আফ্রিকার রাজনীতি নিয়েও লেখা আছে। কিন্তু প্রথম দিকের বইগুলো সফল হয়নি। সাফল্য আসে কিং সলোমনস মাইনস বই থেকে। ভাইয়ের সঙ্গে বাজি ধরেছিলেন, রবার্ট লুই স্টিভেনশনের ট্রেজার আইল্যান্ডের চেয়ে রোমাঞ্চকর বই লেখার ক্ষমতা তার আছে। কিং সলোমন্স মাইন্স লিখে তা প্রমাণ করে দেন। বইটি প্রকাশিত হলে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান। তার অন্য একটি বই ‘শি’ ১৯৬৫ সালের মধ্যে ৮৫ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়।

চাকরিসূত্রে আফ্রিকা মহাদেশ সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞানলাভ করেন হ্যাগার্ড, সে সব অভিজ্ঞতাই ছিল তার বইগুলোর মূল উপজীব্য। তবে এমন সব অঞ্চল নিয়ে লিখেছেন, যেগুলো ইংরেজদের কাছে ছিল অনেকটাই অপরিচিত ও অদ্ভুত। এ বইগুলোতে আফ্রিকা ও প্রাচ্য সম্পর্কে প্রচলিত শ্বেতাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ রয়েছে। বিশেষ করে অ-ইউরোপীয় দেশগুলো এসেছে জাদু, কুসংস্কার ও প্রেম-প্রতারণার কাহিনীর প্রেক্ষাপটে। তা সত্ত্বেও আফ্রিকানদের অনেকটা সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখেছেন ও তারা হয়ে উঠেছে অনেক কাহিনীর প্রধান চরিত্র। তার কাহিনীর বড় একটি অংশজুড়ে আছে আফ্রিকার জুলু ও ইগনসি উপজাতি। এ ছাড়া ভাইকিং, প্রাচীন মিসর ও ইসরাইলকে তিনি কাহিনীর প্রেক্ষাপট করেছেন।

তার দুটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র অ্যালান কোয়াটারমেইন ও আয়শা। এর মধ্যে অ্যালান কোয়াটারমেইন ইংরেজি সাহিত্যের একটি টার্ম ‘দ্য লিগ অব এক্সট্রা অর্ডিনারি জেন্টলম্যান’ এর প্রধান চরিত্র। অ্যালান কোয়াটারমেইন চরিত্রটি স্টিভেন স্পিলবার্গের চলচ্চিত্রের ইন্ডিয়ানা জোন্সসহ অনেক নায়ক চরিত্রের অনুপ্রেরণা। ফ্রয়েডের মনসমীক্ষণে আয়শা চরিত্রটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অ্যালান কোয়াটারমেইনকে সর্বকালের সেরা অ্যাডভেঞ্চারাস চরিত্র হিসেবে ধরা হয়। তিনি মূলত একজন শিকারি, জন্ম ইংল্যান্ডে। তবে জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই কাটিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্বর জংলীদের সাথে।

যদি প্রশ্ন করা হয়, আসলে কে বেশি জনপ্রিয়? হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড নাকি তার সৃষ্ট চরিত্র অ্যালান কোয়াটারমেইন? স্যার আর্থার কোনান ডয়েল শার্লক হোমসকে মেরে ফেলেছিলেন “দ্য ফাইনাল চ্যাপ্টার”-এ। হ্যাগার্ডও তাই করেছিলেন “অ্যালান কোয়াটারমেইন” উপন্যাসে। কিন্তু পাঠকদের চিঠির তোড়ে দুইজনকেই ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হয় তাদের সৃষ্টি করা চরিত্রগুলোকে। হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড ইতিহাসের সাথে উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে এমনভাবে মিশিয়ে ফেলেছিলেন যেন বাস্তবেও ঠিক তাই ঘটেছিল!

তিনি কৃষি সংস্কারের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ভূমি ও ভূমিসম্পর্কিত বিভিন্ন কমিশনের সদস্য ছিলেন। কৃষি সম্পর্কে আগ্রহ থেকে বিভিন্ন উপনিবেশে ভ্রমণ করেন। ১৯০৯ সালে সে সূত্রে একটি উন্নয়ন বিল আনেন। নানারকম পেশায় জড়িত থাকা ছাড়াও রাজনীতির প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল। কয়েকবার নির্বাচনে কনজারভেটিভ দলের প্রার্থী হয়ে সামান্য ব্যবধানে হারেন।

ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যযুগের শেষাংশে তার রচিত গল্প ও উপন্যাস আকাশচুম্বী খ্যাতি লাভ করে, অনুপ্রেরণা যোগায় বহু পাঠক ও সাহিত্যিককে।তার লেখা উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে- আ টেইল অব থ্রি লায়ন্স (১৮৮৭), ক্লিওপেট্রা (১৮৮৯), দ্য ওয়ার্ল্ডস ডিজায়ার (অ্যান্ড্রু ল্যাঙের সঙ্গে যৌথভাবে, ১৮৯০), এরিক ব্রাইটিজ (১৮৯১), মন্টেজুমাস ডটার (১৮৯৩), দ্য স্প্রিং অব লায়ন (১৮৯৯), ব্ল্যাক হার্ট অ্যান্ড হোয়াইট হার্ট (১৯০০), আ উইন্টার পিলগ্রিমেজ (১৯০১), পার্ল মেইডেন (১৯০৩), রিপোর্ট অব স্যালভেশন আর্মি কলোনিস (১৯০৫), বেনিটা (১৯০৬), কুইন সেবাস রিং (১৯১০), রিজেনারেশন : অ্যান অ্যাকাউন্ট অব দ্য স্যোশাল ওয়ার্ক অব দ্য স্যালভেশন আর্মি (১৯১০), মর্নিং স্টার (১৯১০), দ্য মহাত্মা অ্যান্ড দ্য হেয়ার (১৯১১), রুরাল ডেনমার্ক (১৯১১), মুন অব ইসরাইল (১৯১৮), স্মিথ অ্যান্ড ফারাওস (১৯২০) ও দ্য ডেইস অব মাই লাইফ (আত্মজীবনী, ১৯২৬)। অ্যালান কোয়াটারমেইন : কিং সলোমন্স মাইন্স (১৮৮৫), অ্যালান কোয়াটারমেইন (১৮৮৭), অ্যালান্স ওয়াইফ (১৮৮৭), দ্য ওয়ার অব দ্য লিটল হ্যান্ড (১৮৮৮), মেরি (১৯১২), চাইল্ড অব স্টর্ম (১৯১৩), দ্য হলি ফ্লাওয়ার (১৯১৫), ফিনিশ্‌ড (১৯১৭), দ্য আইভরি চাইল্ড (১৯১৬), দ্য অ্যানসিয়েন্ট অ্যালান (১৯২০), শি অ্যান্ড অ্যালান (১৯২০), দ্য মনস্টার (১৯২৪), দ্য ট্রেজার অব দ্য লেক (১৯২৬), অ্যালান অ্যান্ড আইস গড্‌স (১৯২৭) ও হান্টার কোয়াটারমেইনস স্টোরি : দ্য আনকালেক্টেড অ্যাডভেঞ্চার্‌স অব অ্যালান কোয়াটারমেইন। আয়েশা : শি (১৮৮৭), রিটার্ন অব শি (১৯০৫), শি অ্যান্ড অ্যালান (১৯২১) ও উইসডমস ডটার (১৯২৩)। তার লেখা কাহিনী থেকে কমিক, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। বাংলা ভাষায় তার অনেকগুলো বইয়ের অনুবাদ প্রকাশ করেছে সেবা প্রকাশনী।

১৯১২ সালে স্যার উপাধি পান। ১৯১৯ সালে অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ অ্যাম্পায়ার লাভ করেন। তার নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হেনরি রাইডার সোসাইটি। ইংরেজ ঔপন্যাসিক স্যার হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড ১৯২৫ সালের ১৪ মে মৃত্যুবরণ করেন।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : ওরহান পামুকের সাক্ষাৎকার

Facebook Comments