গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাক্ষাৎকার : তৃতীয় পর্ব

share on:
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাক্ষাৎকার সিরিজটি তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন সময় দেওয়া তার সাক্ষাৎকার থেকে। এ সাক্ষাৎকার সিরিজ পড়ে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সামগ্রিকতা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে বলে আমরা মনে করছি। এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পিটার এইচ. স্টোন। ছাপা হয়েছিল প্যারিস রিভিউ পত্রিকায়।

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস , গাবো নামেই যিনি সমধিক বেশি পরিচিত। সাম্প্রতিক বিশ্ব সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে আশ্চর্য—সুন্দর গল্পকথকদের একজন। গাবোর সাহিত্য বিষয়ে ধারণা পেতে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : আশ্চর্য-সুন্দর গল্পকথক লেখাটি পড়ুন।

একজন লেখকের নিঃসঙ্গতার বিষয়টি কী? এটা কি ভিন্ন কিছু?

এই নিঃসঙ্গতার ক্ষমতা দিয়ে করার মতো অনেক কিছু থাকে। লেখকের বাস্তবতার প্রতিকৃতি অঙ্কনের অত্যধিক প্রচেষ্টা তাকে প্রায়ই বাস্তবতার দর্শনকে বিকৃত করিয়ে ফেলার দিকে পরিচালিত করে। বাস্তবতার স্থান বদল করাতে গিয়ে সে এটার যোগসূত্র হারিয়ে ফেলে নিঃশেষ হয়ে পড়ে, একটি অবাস্তব কল্পনার মধ্যে, যেমন তারা বলে থাকে। সাংবাদিকতা এটার বিপরীতে একটি ভালো প্রতিরক্ষার কাজ করে। একারণেই আমি সবসময় সাংবাদিকতা করতে চেয়েছি, কারণ এটা আমাকে বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে যোগসূত্র ধরে রেখেছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক সাংবাদিকতা এবং রাজনীতি। একশত বছরের নিঃসঙ্গতা লেখার পরে আমাকে যে নিঃসঙ্গ জীবন ভয় দেখিয়েছে সেটা কোনো লেখকের নিঃসঙ্গ জীবন নয়; সেটা ছিল অত্যধিক খ্যাতির নিঃসঙ্গতা, যেটা ঠিক যেন ক্ষমতার নিঃসঙ্গতার অনুরূপ। আমার বন্ধুরা আমাকে প্রতিরক্ষা করেছে, আমার বন্ধুরাই তারা, যারা সবসময় সেখানে ছিল।

 কী করে?

কারণ আমি আমার সারা জীবন ধরে একই বন্ধুদের ধরে রেখেছি। আমি বোঝাতে চাইছি, আমি আমার পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে কখনো সম্পর্ক নষ্ট করিনি বা সম্পর্কচ্যুত হইনি, এবং তারাই ছিল যারা আমাকে আবার মাটির পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে; তারা সবসময়েই তাদের পা মাটিতে রাখে অর্থাৎ বাস্তব পৃথিবীতে বসবাস করে এবং তারা কিন্তু বিখ্যাত নয়।

বিষয়গুলো কিভাবে শুরু হলো? গোত্রপতির শরৎকাল-এ বারবার ঘটা একটি কল্পনা আছে এরকম যে অনেক বিলাসবহুল প্রাসাদের মধ্যে গরুগুলো থাকছে। এটা কি কোনো সঠিক কল্পনা?

আমি একটি ছবির বই পেয়েছিলাম যেটা আমি এক্ষুণি আপনাকে দেখাচ্ছি। আমি বিভিন্ন উপলক্ষে এটা বলেছি যে আমার সকল বই-ই কোনো একটা কল্পনা বা ছবি থেকে সৃষ্টি হয়েছে। গোত্রপতির শরৎকাল-এর কল্পনা আমি প্রথম পাই একজন খুবই বৃদ্ধ লোকের ভীষণ সমৃদ্ধশালী বিলাসবহুল একটি প্রাসাদে বসবাসের ঘটনায়। যেখানে গরুগুলো ঢুকে পড়ে এবং পর্দা চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। কিন্তু যতদিন না আমি ছবি দেখেছি ততদিন পর্যন্ত এই কল্পনাটা জমাট বাঁধে নি। রোমে আমি বইয়ের দোকানে গেলাম এবং সেখানে আমি ছবির বইগুলি দেখতে শুরু করলাম, যেগুলোকে আমি সংগ্রহে রাখতে পছন্দ করি। আমি সেখানে এই ছবিটি দেখলাম, এবং ওটা ছিলো যাকে বলে একেবারে যথাযথ। আমি শুধু দেখলাম যে ওটা কিভাবে চলতে পারে। যতদিন না আমি একজন বিরাট বুদ্ধিজীবী হয়ে উঠি, আমি আমার জীবনের প্রতিদিনকার বিষয়গুলোর মধ্যেই প্রাক্পরিচয় খুঁজতে পারি, এবং তা কোনো মহান শ্রেষ্ঠ শিল্পকৃতির মধ্যে নয়।

আপনার উপন্যাস কি কখনো অপ্রত্যাশিতভাবে পাক খেয়ে গেছে?

লেখালেখির একেবারে শুরুর দিকে আমার সঙ্গে এটা প্রায়ই ঘটতো। প্রথম গল্পে আমি লিখেছি মেজাজ সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা আছে, কিন্তু নিজেকে আমি সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য ছেড়ে দিই। সবচেয়ে ভালো যে উপদেশটি আমি আমার শুরুতেই পেয়েছি তাতে, মানে কাজ করার দিকে ঐ উপায়টা ঠিকই ছিল যখন আমি তরুণ ছিলাম, কারণ আমার উদ্দীপনার একটি বেগবান প্রবাহ ছিল। কিন্তু আমাকে বলা হয়েছিল যদি আমি কৌশল আয়ত্ত করতে না পারি, পরে আমার অনেক অসুবিধা হবে যখন উদ্দীপনা চলে যাবে এবং কৌশলের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যদি এটা আমি এই সময়ের মধ্যেই শিখতে না পারতাম, তাহলে আমি আগেভাগেই একটি কাঠামোর রূপরেখা দাঁড় করাতে পারতাম না। কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে একটি নিরেট কৌশলগত সমস্যা এবং যদি আপনি ওটাকে শুরুতেই শিখে নিতে না পারেন আপনি এটা কখনোই শিখে উঠতে পারবেন না।

তবে তো নিয়মানুবর্তিতা আপনার কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়?

কোনো দিক দিয়ে অর্থময়তা বহন করে এমন একটি বই আপনি ভীষণরকম নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ না করে কখনোই লিখতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না।

কৃত্রিম উত্তেজনার বিষয়টি কী?

একটা বিষয় যেটা হেমিংওয়ে লিখে গেছেন যেটা আমাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছে সেটা ছিল যে লেখালেখি নাকি তাঁর কাছে ছিল মুষ্টিযুদ্ধের মতোই। তিনি তাঁর শরীরের দিকে লক্ষ্য নিতেন এবং নিজের ভালো-থাকার দিকেও যত্ন নিতেন। ফকনারের মাতাল হবার ব্যাপারে একটা খ্যাতি ছিল, কিন্তু যতগুলো সাক্ষাৎকার তিনি দিয়েছেন তিনি বলেছেন মদ্যপান করে একটি মাত্র লাইন লেখাও অসম্ভব। হেমিংওয়েও সেটা বলেছেন। মন্দ পাঠকেরা আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি কি মাদকাসক্ত হয়ে আমার কাজের কিছু লেখা লিখে থাকি। কিন্তু ওটা একেবারে ছবির মতো বুঝিয়ে দেয় যে তারা সাহিত্য অথবা মাদক সম্পর্কে কিছুই জানে না। একজন ভালো লেখক হতে গেলে আপনাকে আপনার লেখালেখির প্রত্যেকটি মুহূর্তে মানসিকভাবে সুস্থ ও উজ্জ্বল থাকতে হবে, এবং অবশ্যই ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। আমি লেখালেখি সম্পর্কে এরকম রোমান্টিক ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীতে, যেটাতে দৃঢ়তার সঙ্গে বলা হয় যে লেখালেখির কাজ একটা আত্মত্যাগের কাজ, এবং এটা অর্থনৈতিকভাবে খুব খারাপ অবস্থা অথবা মানসিকভাবে খুব খারাপ অবস্থা লেখালেখির জন্য বেশি ভালো। আমার মনে হয় লেখালেখি করতে গেলে আবেগীয় এবং শারীরিক দিক থেকে আপনাকে একেবারে ভালো থাকতে হবে। সাহিত্যিক সৃষ্টিশীলতা আমার কাছে ভালো স্বাস্থ্য দাবি করে, এবং গত প্রজন্ম এটা বুঝতে পেরেছিল। তাঁরা ছিলেন সেসমস্ত লোক, যারা জীবনকে ভালোবাসতেন।

ব্লেইজে সেনড্রারাস বলেছেন লেখালেখি হচ্ছে বেশিরভাগ কাজের তুলনায় অনেক সুবিধাজনক কাজ, এবং তাই লেখকেরা তাদের পরিশ্রমের ব্যাপারে অত্যুক্তি করেন। আপনি কী মনে করেন?

আমি মনে করি লেখালেখি ভীষণ জটিল কাজ, কিন্তু যেকোনো কাজই সতর্কতার সঙ্গে সম্পাদন করলে এমনটাই হয়। এটার সুবিধাটা কী, যা হোক, এটা হচ্ছে এমন একটা কাজ যেটা আপনি করে থাকেন নিজের সন্তুষ্টির জন্য। আমার মনে হয় যে আমি নিজের কাছে এবং অন্যদের কাছেও অতিরিক্ত পরিমাণে দাবি করি কারণ আমি ভুল বরদাস্ত করতে পারি না; আমি মনে করি যে, যেকোনো কিছু একেবারে সঠিক মাত্রায় করার এটা একটা সুযোগ। যদিও এটা সত্য যে লেখকেরা প্রায়ই নিজেকে বড় বা শক্তিশালী হিসেবে ভাবার বাতিকে ভোগে এবং তারা নিজেদেরকে মহাবিশ্বের এবং সমাজের বিবেকের কেন্দ্র হিসেবেও ভাবে। কিন্তু আমি কোনো কিছু ভালোভাবে করতে পারাটাকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। যখন আমি ভ্রমণ করি এটা জেনে আমি সবসময় সুখী হই যে আমার মতো একজন লেখকের চেয়ে প্লেনের চালকরা অনেক ভালো চালক।

কখন আপনি সর্বোত্তম কাজ করেন? আপনার কাজের কি কোনো পূর্ব নির্ধারিত সময়সূচি থাকে?

যখন আমি একজন পেশাদার লেখক হয়ে গেলাম আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে গেল আমার পূর্ব নির্ধারিত সময়সূচির বিষয়টি। একজন সাংবাদিক হওয়া মানে রাতে কাজ করা। যখন আমি পুরোসময়কাল ধরে লেখা শুরু করলাম তখন আমার বয়স চল্লিশ বছর, প্রকৃতপক্ষে আমার সময়টা ছিল সকাল নয়টা থেকে শুরু করে দুপুর দুইটা পর্যন্ত, যখন আমার ছেলেরা স্কুল থেকে ফেরে। আমি কঠোর পরিশ্রম করতাম, আমার অপরাধবোধ হতে লাগলো যে আমি শুধুমাত্র সকালের সময়টা কাজ করি; কাজেই আমি বিকেলেও কাজ করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমি আবিষ্কার করলাম, যে কাজ আমি বিকেলে করি সেটা আমাকে আবার পরের দিন সকালে করতে হয়। কাজেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি শুধুমাত্র সকাল নয়টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত কাজ করবো, এবং আর কিছুই করবো না। বিকেল বেলায় আমি মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত করবো, গল্পগুজব করবো এবং অন্যান্য কাজ যেসব সামনে চলে আসে তাই করবো। আমার আরো একটি সমস্যা আছে, আমি শুধুমাত্র পরিচিত পরিবেশে এবং যে পরিবেশ আমার জন্য উষ্ণ সেসব পরিবেশেই কাজ করতে পারি। আমি কোনো ধার করা কক্ষ বা টাইপরাইটারে কিংবা হোটেলে কাজ করতে পারি না। এ অভ্যাস সমস্যার, কারণ আমি যখন কোথাও বেড়াতে যাই তখন আমি কাজ করতে পারি না। অবশ্যই আপনি কোনো একটা অজুহাত খুঁজে বের করতে থাকবেন কম কাজ করার জন্য। একারণেই যে শর্ত আপনিই আপনার ওপর আরোপ করবেন এবং সেটা সবসময়েই আরো কঠিন হয়ে উঠবে। আপনি আশপাশের পরিবেশ থেকেই বেশি প্রণোদোনা আশা করবেন। এটা হচ্ছে রোমান্টিক শব্দ যা প্রচুর পরিমাণে শোষণ করে নেবে। আমার মার্কসবাদী বন্ধুদের এই শব্দটি স্বীকার করে নিতে প্রচুর জটিলতায় পড়তে হয়, কিন্তু আমরা যেখানেই ওটাকে আহ্বান জানাই না কেন, আমি এ বিষয়ে পুরোপুরি একমত যে সেখানে মনের এক বিশেষ অবস্থান তৈরি হয় যেখানে আপনি বিষয়গুলোকে নিয়ে খুব সহজেই লিখতে পারবেন এবং বিষয়গুলো অত্যন্ত স্বচ্ছন্দভাবে বেড়িয়ে আসবে। সকল ধরনের ওজর-আপত্তি যেমন ধরেন, আপনি শুধু বাড়িতে বসেই লিখতে পারেন এসবকিছুই— অদৃশ্য হয়ে যাবে। মনের এইরকম অবস্থা ও মুহূর্ত শুধুমাত্র বোধহয় তখনই আসতে পারে যখন আপনি যথাযথ প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করেন এবং যথাযথ উপায়ে ওটাকে সম্পাদনা করেন। আপনি বিশেষভাবে পছন্দ করেন এমন কিছুও হতে হবে ওটাকে, কারণ আপনি পছন্দ করেন না এমন কিছু করার চেয়ে খারাপ কাজ আর কিচ্ছু নেই। আরেকটি কঠিন বিষয় হচ্ছে প্রথম প্যারাগ্রাফ। আমি শুধুমাত্র প্রথম অনুচ্ছেদ লেখার জন্য অনেক মাস ব্যয় করেছি, এবং তারপরে একসময় ওটাকে পেয়েছি, পরের বিষয়গুলো খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেড়িয়ে এসেছে। বইয়ের পরের অংশগুলো কেমন হতে যাচ্ছে তার নমুনা হচ্ছে বইয়ের প্রথম অনুচ্ছেদ। একারণেই একটি ছোটগল্পের বই লেখা একটি উপন্যাস লেখার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। প্রত্যেকবার ছোটগল্প লেখার সময় আপনাকে আবারো পুরোটা বিষয় একেবারে প্রথম থেকে শুরু করতে হবে।

আপনি কি অনুপ্রেরণা এবং স্বজ্ঞার মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখাতে পারেন?

অনুপ্রেরণা হচ্ছে তাই যখন আপনি সঠিক বিষয়টিকে খুঁজে বের করেন, এমন একটা জিনিস খুঁজে পান যেটা আপনি সত্যিই ভীষণ পছন্দ করেন; এটা আপনার কাজকে অনেক বেশি সহজ করে তোলে। স্বজ্ঞা— (স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞান বা স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতি) ও ফিকশন লেখার ক্ষেত্রে মৌলিক বিষয়ের কাজ করে, যেটা কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রয়োজন ছাড়াই অথবা অন্য কোনো বিশেষ ধরনের জ্ঞান অর্জন ছাড়াই বাস্তবতার ক্ষেত্রে একটা বিশেষ উপায় যেটা আপনাকে অর্থ উদ্ধারে সাহায্য করে। মাধ্যাকর্ষণের রীতিকে যে কোনো কিছুর চেয়ে স্বজ্ঞার সাহায্যেই বেশি সহজে অবয়ব দেয়া সম্ভব। এটা কোনো ধরনের কোনো সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়া ছাড়াই অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি উপায়। একজন ঔপন্যাসিকের জন্য, স্বজ্ঞা ভীষণরকম আবশ্যিক। প্রকৃতপক্ষে এটা বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি প্রতিকূলে, এটা হচ্ছে সম্ভবত এমন একটা বিষয় যেটাকে আমি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি— এই বোধে যে প্রকৃত পৃথিবী এক ধরনের অনড় তত্ত্বে পর্যবসিত। স্বজ্ঞা এর সুযোগ নেয় অথবা কখনো নেয় না। আপনি নিশ্চয়ই একটি বৃত্তাকার কীলক-কে একটি বর্গাকার ছিদ্রে রাখার চেষ্টা করবেন না।

এটাই কি সেই ব্যাপারটা, যে জায়গা থেকে আপনি তাত্ত্বিকদের অপছন্দ করেন?

একেবারে ঠিক। প্রধান কারণ, আমি সত্যিই তাদের বুঝতে পারি না। এটাই প্রধান কারণ আমি কেন বেশিরভাগ জিনিস ক্ষুদ্র উপাখ্যান বা কাহিনীর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করি, কারণ আমার বিমূর্তায়নের কোনো ক্ষমতাই নেই। এজন্য অনেক সমালোচক বলে থাকেন যে আমি অসামাজিক ব্যক্তি। আমি অনেক বেশি উদ্ধৃতি দেই না।

আপনি কি মনে করেন যে সমালোচকরা আপনাকে কোনো বিশেষ ধাচে ফেলতে চায়?

বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার তত্ত্ব যে কী, সমালোচকরা আমার কাছে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সবচেয়ে প্রথমে, একজন লেখকের কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে তাদের একটা তত্ত্ব আছে। তারা লেখককে তাদের আদর্শের মধ্যে গুঁজে দিয়ে পেতে চেষ্টা করে, যদি সেই লেখক সেখানে মানিয়ে না যায়, তারা তখনও জোর করে তাকে পেতে চেষ্টা করে যায়। আমি এসব বিষয়ে উত্তর করছি কেবলমাত্র এ কারণে যে আপনি এ বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। আমার সত্যিই এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই যে সমালোচকরা আমার সম্পর্কে কী ভাবেন; আমি অনেক বছর ধরে কোনো সমালোচকের লেখা পড়িনি। তারা নিজেদেরকে লেখক ও পাঠকের মধ্যে অপরের দ্বারা কাজ চালানো একজন প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করেন। আমি সবসময় একজন অতি পরিচ্ছন্ন এবং যথাযথ লেখক হবার চেষ্টা করেছি, চেষ্টা করেছি কোনো সমালোচকের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি পাঠকের কাছে পৌঁছাতে।

অনুবাদকদের ব্যাপারে আপনার কোনো শ্রদ্ধা-ভক্তি আছে?

যারা অনুবাদ করতে গিয়ে শুধু ফুটনোট ব্যবহার করেন, তাদের বাদ দিয়ে অন্য অনুবাদকদের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি ও ভালোবাসা রয়েছে। ফুটনোট দেয়া অনুবাদকরা সবসময় লেখক যা বোঝাতে চাননি সেসব বিষয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন; যতক্ষণ ওসব ওখানে থাকে পাঠকদের ওসবের মধ্যেই পড়ে থাকতে হয়। অনুবাদ করা একটি খুবই জটিল বিষয়, এতে একেবারেই কোনো সম্মান পাওয়া যায় না, এবং টাকাপয়সাও খুব কম আয় হয়। একটি ভালো অনুবাদ সবসময়েই অন্য ভাষার একটি পুনঃসৃষ্টি। এ কারণেই আমার গ্রেগরি রাবাসার প্রতি এত অনুরাগ। আমার বই একুশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং রাবাসা হচ্ছেন একমাত্র অনুবাদক যিনি কখনো কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করার জন্য আমার কাছে কিছু জানতে চান নি, এজন্য যেন তিনি একটি ফুটনোট তিনি ঢোকাতে পারেন বইয়ে। আমার মনে হয় এটা আমার কাজকে সম্পূর্ণভাবে ইংরেজিতে পুনরায় সৃষ্টি করে। সেখানে বইয়ের কোনো একটা অংশ সাহিত্যিকভাবে অনুসরণ করা খুবই জটিল। পাঠকের এমন ধারণা হবে যেন অনুবাদক বইটি একবার পড়েছেন এবং এরপর তার স্মরণশক্তি দিয়ে পুর্নলিখন করেছেন। এ কারণে আমি অনুবাদকদের এত পছন্দ করি। তারা বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞান বা অনুভূতির দ্বারা উপলব্ধি করে। প্রকাশকরা তাদের যে পারিশ্রমিক দেন তা সত্যিই অসহনীয় রকম কম এজন্যও যে তারা তাদের কাজকেই কখনো সাহিত্যিক সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করেন না। এখানে কিছু বই রয়েছে যেগুলোকে আমি স্পেনিশে অনুবাদ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এগুলো করতে আমার নিজের বই লেখার চেয়ে অনেক অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয় এবং আমার নিজের খাবার খরচ চালানোর জন্য এ থেকে যথেষ্ট টাকা যোগাড় করতে পারবো না।

আপনি কী কী অনুবাদ করতে চেয়েছিলেন?

সকল ম্যালরাক্সসহ, জোসেফ কনরাড এবং সেন্ট এক্সুপেরি আমি অনুবাদ করতে চেয়েছিলাম। যখন আমি এগুলো পড়েছি তখন আমার কখনো কখনো এমন মনে হয়েছে যে আমি এই বইগুলো অবশ্যই অনুবাদ করবো। মহান সব মাস্টারপিস বাদ দিয়ে, একটি বইয়ের মাঝামাঝি ধরনের অনুবাদ পড়তে পছন্দ করার চেয়ে আমি এটার মধ্য দিয়ে যেতে চাই প্রকৃত ভাষাটার মধ্যে। আমি সত্যিই ভেতরে স্পেনিশকে অনুভব করি। যদিও আমি ইতালিয়ান এবং ফরাসি ভাষা জানি, এবং আমি খুব ভালো ইংরেজি জানি টাইম ম্যাগাজিন আমাকে বিশ বছর ধরে প্রত্যেক সপ্তাহে দূষিত করে চলেছে।

মেক্সিকো কি আপনার কাছে এখন বাড়ির মতো মনে হয়? আপনি কি নিজেকে বৃহৎ কোনো লেখক সম্প্রদায়ের অংশ বলে অনুভব করেন?

সাধারণভাবে, আমি কোনো লেখক বা শিল্পীর বন্ধু এজন্য নই যে তারা লেখক অথবা শিল্পী তাই। বিভিন্ন পেশায় আমার অনেক বন্ধুবর্গ রয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন লেখক ও শিল্পীরাও। সাধারণ অর্থবাচকতায়, আমি অনুভব করি, আমি লাতিন আমেরিকার যে কোনো দেশের নাগরিক কিন্তু সবজায়গার নয়। লাতিন আমেরিকা অনুভব করে, স্পেন হচ্ছে একমাত্র দেশ যার মধ্যে আমরা ভালোভাবে আপ্যায়িত হই, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে এরকমটা মনে করি না আমি সেখান থেকেই এসেছি। লাতিন আমেরিকায় আমার কোনো সীমান্ত প্রদেশ অথবা শেষ প্রান্তের বোধ নেই। এক দেশ থেকে অন্য দেশের যে ব্যবধান রয়েছে আমি সে বিষয়ে সচেতন, কিন্তু আমার মনে ও হৃদয়ে এই সব দেশ একেবারেই এক। যেখানে আমি সত্যিই ক্যারিবিয়ানকে নিজের বাড়ি বলে মনে করি, হোক সেটা ফ্রেঞ্চ, ডাচ অথবা ইংলিশ ক্যারিবিয়ান। আমি সবসময় এটাতে প্রভাবিত হই যখন আমি ব্যারেনকুইলার কোনো প্লেনে উঠি, নীল পোশাক পরা একজন কালো নারী হয়তো আমার পাসপোর্টে স্ট্যাম্প মারবে, এবং আমি যখন জ্যামাইকায় প্লেন থেকে নামি, নীল পোশাক পরা একজন কালো নারী আমার পাসপোর্টে স্ট্যাম্প মারবে, কিন্তু তিনি ইংরেজ। আমি মনে করি না যে ভাষা এসবের মধ্যে খুব বেশি ব্যবধান তৈরি করতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় আমার নিজেকে বিদেশীর মতো অনুভব হয়, নিরাপত্তার বোধ থেকে একটা অনুভূতি যেন আমাকে লুণ্ঠন করে। এটা একটা ব্যক্তিগত অনুভূতি, কিন্তু যখনই আমি ভ্রমণ করি আমার এই অনুভূতিটা হয়। আমার একটি নাবালকসুলভ ন্যায়পরতা রয়েছে।

আপনি কি মনে করেন যে লাতিন আমেরিকান লেখকদের কিছু সময়ের জন্য ইউরোপে বসবাস করা উচিত?

বাইরে থেকে একটি বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত বোঝার জন্য। ছোট গল্পের বইগুলোতে আমি মনে করেছিলাম যে লাতিন আমেরিকা ইউরোপের দিকে যাচ্ছে। আমি এ বিষয়টি নিয়ে বিশ বছর ধরে চিন্তা করেছি। আপনি যদি গল্পগুলোর একটি সর্বশেষ উপসংহার টানেন, এটা হবে যে লাতিন আমেরিকা খুব কমই ইউরোপকে পেয়েছে, বিশেষ করে মেক্সিকানরা, এবং নিশ্চিভাবে সেখানে অবস্থান করেনি। ইউরোপে আমি যত মেক্সিকানদের পেয়েছি তারা সব সময়েই পরবর্তী বুধবারে ইউরোপ ত্যাগ করছে।

লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে কিউবার স্বাধীনতা যুদ্ধ কি পরিমাণ ফলাফল এনেছে বলে আপনি মনে করেন?

এখন পর্যন্ত এটা নেতিবাচক। অনেক লেখক যারা নিজেদের অনুগত অনুভব করে নিজেদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে ফেলে তারা যা চায় সে বিষয়ে গল্প লেখে না, বরং তাদের যা চাওয়া উচিত সে বিষয়ে গল্প লেখে। এটা নিশ্চিতভাবে কিছু হিসেবি সাহিত্য তৈরি করে, যেটাতে কোনো ধরনের কোনো অভিজ্ঞতা কিংবা স্বজ্ঞা থাকে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, লাতিন আমেরিকার ওপর কিউবার সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে ভীষণ লড়াই হয়েছে। কিউবার নিজের ক্ষেত্রে, প্রক্রিয়াটা ঐ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে অগ্রগতি হয়নি যেখানে কোনো নতুন ধরনের সাহিত্য কিংবা শিল্প তৈরি সৃষ্টি পারে। ওটা এমন কিছু যেটার সময় প্রয়োজন রয়েছে। লাতিন আমেরিকার ওপরে কিউবার সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক গুরুত্ব হচ্ছে এক ধরনের সেতুর দিকে, যেটা এমন একধরনের সাহিত্যকে প্রেরণ করে যেটা লাতিন আমেরিকায় বহু বছর ধরেই রয়েছে। এক কথায়, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে লাতিন আমেরিকার আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ হচ্ছে কিউবার স্বাধীনতা যুদ্ধ। ঐ প্রজন্মের সকল লাতিন আমেরিকার লেখক বিশ বছর ধরে লিখছেন, কিন্তু আমেরিকার এবং ইউরোপের প্রকাশকদের তাদের প্রতি খুব অল্প পরিমাণ আগ্রহই ছিল। যখন সেখানে কিউবার স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলো, লাতিন আমেরিকা এবং কিউবা সম্পর্কে আকস্মিকভাবেই এক বিশাল আগ্রহ তৈরি হলো। এই স্বাধীনতা যুদ্ধ একটি উপভোগের গল্পে পরিবর্তিত হলো। লাতিন আমেরিকা একটি আদর্শে পরিণত হলো। এটা আবিষ্কৃত হলো, যে সকল লাতিন আমেরিকার উপন্যাস রয়েছে সেগুলো অনুবাদের জন্য যথেষ্ট ভালো এবং অন্য সকল আর্ন্তজাতিক সাহিত্যের সঙ্গে বিবেচনার উপযুক্ত। যেটা সবচেয়ে দুঃখের বিষয় ছিল সেটা হচ্ছে এই সাংস্কৃতিক উপনিবেশ লাতিন আমেরিকায় এত খারাপ প্রভাব ফেলেছে যে, লাতিন আমেরিকানরদের নিজেদেরকে এটা বোঝানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে যে বাইরের লোকেরা তাদের ভালো বলার আগেও তাদের নিজেদের উপন্যাসগুলো ভালোই ছিল।

কোনো কম পরিচিত লাতিন আমেরিকান লেখক কি রয়েছেন যাকে আপনি বিশেষভাবে পছন্দ করেন?

আমার সন্দেহ যে এখন আর তেমন কেউ আদৌ আছেন কিনা। লাতিন আমেরিকার লেখালেখির আকস্মিক গুরুত্ব বেড়ে যাবার অন্যতম একটি বাজে ফলাফল হচ্ছে প্রকাশকরা সবসময় এটা নিশ্চিত করতে চান যে তারা নতুন কোর্তাসারকে কিছুতেই মিস করবেন না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক নতুন লেখকই তাদের নতুন লেখার চেয়ে অনেক বেশি সুনামের জন্য সচেতন। তাউলাউস বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নতুন ফরাসী ভাষার প্রফেসর রয়েছেন যিনি লাতিন আমেরিকার লেখকদের সম্পর্কে লিখে থাকেন; অনেক নতুন লেখক তাকে লিখে জানান যেন তিনি আমার সম্পর্কে আর এত বেশি না লেখেন কারণ আমার বিষয়ে আর এত বেশি লেখালেখির প্রয়োজন নেই এবং অন্যদের বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু তারা যা ভুলে গেছে তা হচ্ছে আমি যখন তাদের বয়সী ছিলাম সমালোচকেরা আমাকে নিয়ে লিখতেন না, বরং অনেক বেশি লিখতেন মিগুয়েল এঞ্জেল আস্তুরিয়াসকে নিয়ে। সে বিষয়টি আমি দাঁড় করাতে চাচ্ছি তা হচ্ছে এসকল তরুণ লেখকরা নিজেদের লেখার ওপরে কাজ না করে বরং সমালোচকদেরকে লিখে তাদের সময় অপচয় করছেন। ওরকম লেখানোর চাইতে লেখাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার চল্লিশ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত আমার সাহিত্যিক পেশায় একটা বিষয়কে যেটা আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, আমি কখনো লেখক সম্মানী হিসেবে একটি সেন্টও পাইনি, যদিও ততদিনে আমার পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়ে গেছে।

আপনি কি মনে করেন খ্যাতি এবং সফলতা একজন লেখকের পেশাগত জীবনে যদি খুব তাড়াতাড়ি এসে যায় সেটা তাঁর জন্য অমঙ্গলজনক?

যে কোনো বয়সে এটা খুবই খারাপ। আমার বইগুলো মরনোত্তর স্বীকৃত হলে আমি বেশি পছন্দ করতাম, কমপক্ষে এটা যদি পুঁজিবাদী শতকে হতো, যেখানে আপনি একধরনের পণ্যদ্রব্যে রূপান্তরিত হতেন।

পছন্দের বইগুলোর পাশাপাশি আজকাল আর কী বই পড়ছেন?

আমি অদ্ভুত সব জিনিস পড়ছি। মুহাম্মদ আলীর স্মৃতিকথা পড়েছি গতকাল। ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা একটি চমৎকার বই, এবং অনেক বছর আগেই এটা আমি পড়িনি কারণ আমি ভাবতাম এসব বই পড়া সময়ের অপচয় মাত্র। কিন্তু ভরসা করার মতো কোন ব্যক্তি যদি না আমাকে কোনো বই পড়তে বলে, আমি কোনো বই পড়তে বসি না। আমি কোনো ফিকশন পড়ি না। আমি প্রচুর স্মৃতিকথা এবং তথ্য উপাত্ত পড়ে থাকি, এমনকী যদি সেগুলো কোনো বানানো তথ্যও হয়, তাও। এবং আমি প্রচুর বই পুনর্পাঠ করি। পুনর্পাঠের সুবিধা হচ্ছে আপনি যে কোনো পৃষ্ঠা খুলে বসবেন এবং সেই অংশটি পড়বেন যেটা আপনি সত্যিই পছন্দ করেন। শুধুমাত্র ‘সাহিত্য’ পড়ার সেই অলঙ্ঘনীয় মনোভাব আমি হারিয়ে ফেলেছি। আমি একেবারে সমকালীন থাকতে পছন্দ করি। প্রতি সপ্তাহে সারা পৃথিবী থেকে প্রকাশিত সকল গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা আমি পড়ে ফেলি। টেলিটাইপ মেশিন থেকে খবর পড়ার অভ্যাস থেকে আমি সবসময় খবরের জন্য উৎসুক হয়ে খোঁজ করি। কিন্তু সব জায়গার সকল গুরুত্বপূর্ণ এবং চিন্তামূলক পত্রিকাগুলো পড়ার পরে আমার স্ত্রী সবসময়ে আমার আশেপাশে ঘোরে এবং সেসব খবর বলে যেগুলো আমি শুনিনি। যখন আমি ওকে জিজ্ঞেস করি যে ও কোথায় এসব পড়েছে, ও হয়তো বলে ফেলে যে সে ওটা বিউটি পার্লারের মেয়েদের পত্রিকা এবং জল্পনাকারী পত্রিকায় পড়েছে। কাজেই আমি ফ্যাশন ম্যাগাজিনও পড়ি এবং মেয়েদের জন্য যেসব পত্রিকা ও জল্পনাকারী পত্রিকাগুলোও পড়ি। এবং আমি অনেক কিছু শিখতে পারি যেগুলো শুধুমাত্র ওগুলো পড়েই শেখা যায়। এসব আমাকে ভীষণ ব্যস্ত রাখে।

আপনি কি মনে করেন সুখ্যাতি একজন লেখকের জন্য ভীষণ রকম ধ্বংসাত্মক?

প্রাথমিক কারণ এটা আপনার ব্যক্তিগত জীবনকে আক্রমণ করে। আপনি বন্ধুদের সঙ্গে যে সময়টা কাটাতেন এটা সেখান থেকে সময় নিয়ে নেয়, এবং সময় নিয়ে নেয় আপনার কাজের সময় থেকেও। এটা বাস্তব পৃথিবী থেকে আপনাকে আলাদা জায়গার দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়। একজন খ্যাতিমান লেখককে তাঁর লেখা চালিয়ে নেবার জন্য সর্বদা নিজের সুখ্যাতির বিরুদ্ধে নিজেকে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। আমি সত্যিই এসব বিষয়ে কথা বলতে পছন্দ করি না কারণ এটা কখনোই আন্তরিক বলে মনে হবে না, কিন্তু আমার বইগুলো যদি আমার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হলেই আমি পছন্দ করতাম, তবে আমাকে আর এসকল সুখ্যাতি এবং একজন মহান লেখক হবার বিষয়গুলোর মধ্য দিয়ে যেতে হতো না। আমার ক্ষেত্রে, সুনামের একটা মাত্র সুবিধা আছে যে আমি এই সুনামকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছি। অন্যথায়, এটা যথেষ্ট অস্বস্তিকর। সমস্যা হচ্ছে আপনি দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই খ্যাতিমান ব্যক্তি এবং আপনি বলতে পারছেন না, ‘ঠিক আছে, আমি আগামীকাল থেকে আর খ্যাতিমান থাকবো না।’ অথবা একটি বোতাম চাপলেন এবং বললেন, ‘আমি এখানে অথবা এখন থেকে আর খ্যাতিমান নই।’

একশত বছরের নিঃসঙ্গতা’র যে এত সফলতা অর্জন করবে আপনি কি আগে কোনোভাবেই তা অনুমান করতে পেরেছিলেন?

আমি জানতাম, এটা হচ্ছে সেই বই যেটা আমার বন্ধুদের আমার অন্যান্য বইয়ের থেকে বেশি সন্তুষ্ট করবে। কিন্তু, আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম যখন আমার স্পেনীয় প্রকাশক আমাকে বললেন যে তিনি বইটির আট হাজার কপি প্রকাশ করতে যাচ্ছেন , কারণ আমার অন্যান্য বইগুলো কখনো সাতশ কপির বেশি বিক্রি হয় নি। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ধীরে ধীরে কেন এগোচ্ছেন না, কিন্তু তিনি আমাকে বললেন তিনি এ বিষয়ে প্রমাণ পেয়েছেন যে এটা একটা অত্যন্ত চমৎকার বই এবং এই আট হাজার কপি বইয়ের সবই মে থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিক্রি হয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে এই সব বই-ই এক সপ্তাহের মধ্যেই বুয়েনস আয়ার্সে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।

আপনি কি কল্পনা করতে পেরেছিলেন যে একশত বছরের নিঃসঙ্গতা মানুষের মধ্যে এতটা আলোড়ন তুলবে?

আমার কোনোরকম কোনো সুক্ষ্ম ধারণাও ছিল না, কারণ আমার লেখার আমি বড় বাজে সমালোচক। প্রায়ই একটা ব্যাখ্যা এর সম্বন্ধে আমি সবচেয়ে বেশি যা শুনেছি তা হচ্ছে এটা নাকি লাতিন আমেরিকার লোকদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে লেখা বই, এমন একটা বই যেটা ভেতর থেকে লেখা হয়েছে। এই ব্যাখ্যা আমাকে আশ্চর্যান্বিত করেছে কারণ আমার লেখার প্রথম উদ্যোগে এই বইয়ের নাম হতে যাচ্ছিল ঘর। এ উপন্যাসের সমস্ত উন্নয়ন ঘর থেকে জায়গা করে নিক আমি এরকমটাই চাচ্ছিলাম, এবং এর বাইরের যেকোনো কিছু সম্পর্কের ফলাফল হবে শুধুমাত্র ঐ ঘরের উপরে। পরে আমি ঘর শিরোনামটি ছেড়ে দেই, কিন্তু একসময় বইটি মাকোন্দো শহরে যায় এটা আরো দূরে কোথাও যেতে পারেনি। অন্য আরেকটি ব্যাখ্যা আমি শুনেছি যে প্রত্যেক পাঠক এই বইয়ের চরিত্র তৈরি করতে পারে যা সে চেয়েছে এবং তাদেরকে তার নিজের করে নিয়েছে। আমি কখনো চাইনি এটা সিনেমা হোক, যখনই একজন সিনেমা দর্শক একটি মুখ দেখবে যে হয়তো আর নিজেকে ঐ জায়গায় কল্পনা করে নিতে পারবে না।

এটাকে সিনেমা করার ব্যাপারে কি কেউ আগ্রহ দেখিয়েছিল?

হ্যাঁ, আমার এজেন্ট এই প্রস্তাবকে নিরুৎসাহিত করার জন্য দশ লক্ষ ডলার হেঁকেছিল, এবং যেই তারা এটাকে প্রায় মেনে নিতে বসেছিল অমনি সে ভদ্রমহিলা ওটাকে বাড়িয়ে ত্রিশ লক্ষ ডলার করে ফেললো। কিন্তু সিনেমায় আমার কোনো আগ্রহ নেই, যতদূর সম্ভব আমি এটাকে সিনেমা হওয়া থেকে ঠেকানোর চেষ্টাই করবো, এটা হবে না। আমি এটাকে পাঠক ও বইয়ের এক গোপন ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবেই রাখার পক্ষে।

আপনার কি মনে হয় যেকোনো বই-ই সফলভাবে সিনেমায় অনুবাদ করা সম্ভব?

আমার মনে হয় না যেকোনো সিনেমাই কোনো ভালো উপন্যাসের উন্নয়ন করতে পারে, কিন্তু, আমার মনে হয় যে অনেক ভালো সিনেমাই খুব বাজে উপন্যাস থেকে এসেছে।

আপনি নিজে কি কখনো সিনেমা তৈরির কথা ভেবেছেন?

একটা সময় ছিল যখন আমি সিনেমার পরিচালক হতে চেয়েছিলাম। আমি রোমে পরিচালনা সম্পর্কে পড়েছি। আমি অনুভব করি যে সিনেমা এমন একটি মাধ্যম যার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই এবং যার মাধ্যমে সব কিছু করা সম্ভব। আমি মেক্সিকোতে এসেছি কারণ আমি সিনেমায় কাজ করতে চাই, একজন পরিচালক হিসেবে নয় বরং সিনেমার একজন নাট্যকার হিসেবে। কিন্তু সিনেমার একটা অনেক বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এটা একটা শিল্প-কারখানার শিল্পকলা, একটি পরিপূর্ণ শিল্পকারখানা। আপনি যা সত্যি সত্যিই বলতে চান সেটাকে সিনেমায় প্রকাশ করাটা ভীষণ রকম জটিল ব্যাপার। আমি এখনো এটা নিয়ে ভাবছি, কিন্তু এটাকে এখন বিলাসিতা বলেই মনে হচ্ছে, যেটা আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে করতে পছন্দ করবো কিন্তু নিজেকে যথাযথভাবে ব্যক্ত করার কোনো ধরনের কোন আশা ছাড়াই। কাজেই আমি সিনেমা থেকে দূর থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। আমার সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক হচ্ছে সেই দম্পতির মতো যারা আলাদা থাকতে পারে না, কিন্তু তারা আবার একত্রেও থাকতে পারে না। একটি সিনেমা কোম্পানি এবং একটি পত্রিকার মধ্যে আমি পত্রিকাকেই বেছে নেব।

কিউবার ওপরে যে বইটির কাজ করছেন, সে বিষয়ে কিছু বলবেন?

প্রকৃতপক্ষে, কিউবার বাড়িগুলোয় লোকদের জীবন কেমন, কিভাবে তারা ঘাটতিগুলো থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে সেসব নিয়ে একটি দীর্ঘ পত্রিকার প্রবন্ধের মতো হচ্ছে বইটি। গত দুই বছরের কিউবা ভ্রমণের সময় অনেকবার যে বিষয়টি আমাকে আকস্মিক আঘাত করেছে সেটা হচ্ছে এই অবরোধ কিউবায় একধরনের ‘প্রয়োজনীয়তার সংস্কৃতি’ তৈরি করে ফেলেছে, একটি সামাজিক অবস্থা লোকজন যার মধ্যে আবশ্যিক জিনিসগুলো ছাড়াই চলে যাচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে সত্যিই কৌতুহলী করে তুলেছে যে অবরোধ কিভাবে জনগণের মানসিকতাকে পরিবর্তন করতে ভূমিকা রাখছে। পৃথিবীর মধ্যে আমরা একটি সংঘর্ষ দেখি একটি ক্রয়-বিমুখ সমাজ এবং সর্বাধিক ক্রয়ইচ্ছু ধ্বংসাবিমুখী সমাজের মধ্যে। বইটি এখন এমন একটি পর্যায়ে যেখানে চিন্তা করার পরে এটা হয়তো একেবারে সহজ একটা ব্যাপার হবে, সাংবাদিকতার একটি ছোট অংশ হবে সুন্দরভাবে, এটা এখন একটি দীর্ঘ এবং জটিল বইয়ে রূপ নিতে যাচ্ছে। কিন্তু এতে কিছুই এসে যায় না, কারণ আমার সব বই-ই এরকম। এবং পাশাপাশি, বইটি ক্যারিবিয়ানদের বাস্তব পৃথিবীর ঐতিহাসিক বিষয়গুলোকে প্রমাণ করবে, একশত বছরের নিঃসঙ্গতা’র গল্পগুলোর মতো ঠিক তেমন-ই কাল্পনিকভাবে।

লেখক হিসেবে আপনার কি কোনো দীর্ঘ-মাত্রার উচ্চাকাঙ্ক্ষা অথবা আক্ষেপ রয়েছে?

আমার মনে হয় খ্যাতি সম্পর্কে আমি আপনাকে যে জবাব দিয়েছি এ প্রশ্নের জবাবটাও সেই একই। আমাকে আরেক দিন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল আমি যদি নোবেল পুরস্কার বিষয়ে আগ্রহী হই, কিন্তু আমার মনে হয় সেটা আমার জন্য সন্দেহাতীতভাবে একটি অনর্থপাতই হবে। আমি নিশ্চিতভাবেই পুরস্কারের উপযুক্ত হবার জন্য আগ্রহী, কিন্তু ওটা গ্রহণ করা হবে একেবারে ভয়ানক ব্যাপার। এটা সুখ্যাতির সমস্যার চেয়েও জটিল একটা সমস্যা হবে। জীবনে একমাত্র যে বিষয়টিতে আমার আক্ষেপ রয়েছে তা হচ্ছে আমার কোনো কন্যাসন্তান নেই।

কোনো কর্মপরিকল্পনা অর্ধপথে রয়েছে কি?

আমি সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে আমি আমার জীবনের সবথেকে ভালো বইটি লিখতে যাচ্ছি, কিন্তু আমি জানি না সেটি কোনটি হবে অথবা কখন হবে। যখন আমি এরকম কিছু অনুভব করবো— যেটা আমি এখুনি কিছু সময়ের জন্য মাত্র অনুভব করেছিলাম— আমি ভীষণ শান্ত হয়ে যাবো, এজন্য, যদি ওটা পার হয়ে যেতে থাকে আমি যেন ওটাকে ধরতে পারি।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বিষয়ে সব লেখা।

Facebook Comments
বিপাশা মণ্ডল

বিপাশা মণ্ডল

বিপাশা মণ্ডল, কবি, গল্পকার ও অনুবাদক।