গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাক্ষাৎকার : দ্বিতীয় পর্ব

share on:
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাক্ষাৎকার সিরিজটি তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন সময় দেওয়া তার সাক্ষাৎকার থেকে। এ সাক্ষাৎকার সিরিজ পড়ে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সামগ্রিকতা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে বলে আমরা মনে করছি। এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পিটার এইচ. স্টোন। ছাপা হয়েছিল প্যারিস রিভিউ পত্রিকায়।

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস , গাবো নামেই যিনি সমধিক বেশি পরিচিত। সাম্প্রতিক বিশ্ব সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে আশ্চর্য—সুন্দর গল্পকথকদের একজন। গাবোর সাহিত্য বিষয়ে ধারণা পেতে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : আশ্চর্য-সুন্দর গল্পকথক লেখাটি পড়ুন।

আবারও একজন সাংবাদিক হতে আপনার কেমন লাগবে, এত দীর্ঘ দিন ধরে উপন্যাস লেখার পরে? আপনি কি এ দুটোকে ভিন্নভাবে অনুভব করেন অথবা ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন।

একজন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করাই যে আমার প্রকৃত পেশা আমি সে বিষয়ে সবসময়েই স্থিরভাবে বিশ্বাস করতাম। আগে সাংবাদিকতা বিষয়ে আমি যা পছন্দ করতাম না তা ছিল কাজের শর্ত। পাশাপাশি, সংবাদপত্রের স্বার্থে আমার চিন্তা ও ধারণাকে শর্ত মেনে চলতে হতো। এখন, একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে কাজ করার পরে, এবং একজন ঔপন্যাসিক হিসেবেই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরে, আমি সত্যিই সেই সব থিমকে বেছে নিতে পারছি যেটা আমার বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং এবং আমার ধারণার অনুরূপ। যে কোনো ক্ষেত্রে, আমি সবসময়েই সাংবাদিকতার মহান সুযোগকে উপভোগ করেছি।

সাংবাদিকতার মহান কাজ আপনার জন্য কোনটি?

 জন হেরাসির হিরোশিমা ছিল একটি ব্যতিক্রমধর্মী কাজ।

এখনকার কোন ঘটনা যা আপনি বিশেষভাবে পছন্দ করছেন তা কি বলবেন?

এসব তো অনেক আছে, এবং বিচিত্র সব যা আমি ইতিমধ্যে লিখে ফেলেছি। আমি পর্তুগাল, কিউবা, এঙ্গোলা এবং ভিয়েতনাম সম্পর্কে লিখেছি। পোল্যান্ড সম্পর্কেও আমার লেখার খুব ইচ্ছে ছিল। আমার মনে হয়, যদি আমি ঠিকঠাক মতো বলতে পারতাম এখন কী ঘটছে, এটা খুব ভালো একটি ঘটনা হতো। কিন্তু পোল্যান্ডে এখন খুবই ঠাণ্ডা; আমি এমন একজন সাংবাদিক যে কিনা তার আরামকে পছন্দ করে।

আপনার কি মনে হয় যে উপন্যাস সেইসব কাজগুলো করতে পারে যা সাংবাদিকতা পারে না?

কিচ্ছু না। আমার মনে হয় না এখানে আদৌ কোনো পার্থক্য আছে। উৎস একই, উপাদানও একই, উপায় এবং ভাষাও একই। ড্যানিয়েল ডিফোর প্লেগের বছরের দিন-পঞ্জী  একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস এবং সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে হিরোশিমা হচ্ছে একটি শ্রেষ্ঠ কাজ।

সাংবাদিক এবং ঔপন্যাসিকেরা কি সত্য বনাম কল্পনার ভারসাম্যের ক্ষেত্রে ভিন্নতর দায়িত্ব পালন করেন?

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে থাকে শুধুমাত্র একটা ঘটনা যেটা হচ্ছে পুরো কাজের কৃত্রিম পূর্বধারণা বা পক্ষপাত। এ দুয়ের মধ্যে, ফিকশনের মধ্যে একটা একক ঘটনা থাকে যেটা হচ্ছে সত্য, পুরো কাজটাকে বৈধতা দেয়। এটাই একমাত্র পার্থক্য, এবং এটা লেখকের প্রতিশ্রুতির মধ্যে নিহিত থাকে। একজন ঔপন্যাসিক যদি চান যে কোনো কিছু করতে পারেন তিনি এসময় পর্যন্ত লোকজনদের সেসবের ওপর বিশ্বাসও স্থাপন করাতে পারেন।

কয়েক বছর আগের এক সাক্ষাৎকারে আপনাকে মনে হচ্ছিল যে আপনি শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয় ও বিস্ময়ের সঙ্গে আপনার সাংবাদিকতার কার্যক্রমের দিকে ফিরে তাকাতে চান তখন আপনি ঠিক কতটা দ্রুততর ছিলেন।

এখন উপন্যাস লেখা বা সাংবাদিকতার জন্য লেখা দুটোই আমার কাছে আগেকার চেয়ে কষ্টকর। যখন আমি দৈনিক পত্রিকার জন্য কাজ করতাম, আমি যা লিখতাম তার প্রত্যেকটি শব্দ সম্পর্কে ঠিক ততটা  সচেতন ছিলাম না, বাস্তবিকই এখন যেটা আমি। যখন আমি এল এসপেকতাদোর ইন বোগোতা এর জন্য কাজ কাজ করছি, আমি প্রায়ই এক সপ্তাহে তিনটি করে গল্প লিখতাম, প্রতিদিন দুটি অথবা তিনটি করে সম্পাদকীয় নোট লিখতাম, এবং আমি সিনেমারও রিভিউ করতাম। এরপর রাত্রিবেলা, প্রত্যেকে যখন বাড়ি চলে গেছে, আমি আমার উপন্যাসের পিছনে বসতাম। আমি লাইনোটাইপমেশিনের গোলমেলে শব্দ পছন্দ করতাম, যেটার শব্দ ঠিক যেন বৃষ্টি ঝরার শব্দের মতো। যদি ঐ মেশিন থেমে যেত, এবং আমি নৈঃশব্দ্যের মধ্যে রয়ে যেতাম, আমি কাজ করতে পারতাম না। এখন আমার কাজের ফসল অপেক্ষাকৃত কম। কোনো একটি বেশি করে কাজ করার দিনে সকাল নয়টা থেকে বিকেল দুটো বা তিনটে পর্যন্ত সময়ে আমি বড়জোর চার বা পাঁচ লাইনের একটি ছোট প্যারাগ্রাফ লিখতে পারি, যেটা আমি প্রায়ই পরের দিন ছিড়ে ফেলি।

উচ্চ প্রশংসা অথবা কোনো ধরনের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কারণেই কী আপনার লেখায় এধরনের পরিবর্তন এসেছে?

এটা থেকেই এসেছে। এটা চিন্তা করি যে, যেসকল কল্পনা আমি অনেক অনেক লোকের জন্য লিখি এর থেকে আমি সবসময় কল্পনা করি যে এতে একটা নিশ্চিত সাধারণ দায়িত্ব বর্তায় যেটা সাহিত্যিক এবং রাজনৈতিক। সেখানে এমনকী গর্বও মিশ্রিত থাকে, আগে যেমন কম ভাবমূল্য বহন করেছে আমি ওরকম চাই না।

আপনি কিভাবে লেখা শুরু করেছিলেন?

এঁকে। কার্টুন ছবি এঁকে। আমি লিখতে ও পড়তে পারার আগে আমি প্রায়ই স্কুল এবং বাড়িতে কমিক আঁকতাম। সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা হলো যখন আমি হাইস্কুলের ছাত্র, একজন লেখক হিসেবে আমার অনেক সম্মান ছিল, যদিও প্রকৃতপক্ষে আমি কখনোই কিছু লিখিনি। যদি সেখানে কোনো ক্ষুদ্র পুস্তিকা বা দরখাস্ত লিখতে হতো, আমিই ছিলাম সেই যে ওটা লিখে দিত, কারণ আমি ছিলাম সেই ধরে নেওয়া লেখক।

যখন আমি কলেজে প্রবেশ করলাম, সাধারণভাবেই আমার খুব ভালো একটা সাহিত্যিক  পশ্চাদপট এসে যায়, আমার প্রায় সকল বন্ধুরাই গড়ে বিবেচ্য। বোগোতার বিশ্ববিদ্যালয়ে, আমি আমার নতুন বন্ধু এবং পরিচিত লোকজন বাড়াতে লাগলাম, যারা আমাকে সমসাময়িক লেখকদের সঙ্গে পরিচয় করাতো। একদিন রাতে আমার এক বন্ধু আমাকে ফ্রানৎজ কাফকার একটি ছোটগল্পের বই ধার দেয়। আমি অবসরের ফাঁকে ওটাকে নিয়ে দি মেটামরফসিস পড়তে শুরু করলাম। প্রথম লাইনটি আমাকে বিছানাতে একরকম টেনে তুললো। আমি এত বিস্মিত ছিলাম। প্রথম লাইন পড়লাম, ‘গ্রেগর সামসা ঐ সকালে একটা বাজে স্বপ্ন দেখে জেগে উঠলো, সে নিজেকে তার বিছানায় দেখতে পেল  একটি দৈত্যাকার পোকায় পরিণত হয়ে গেছে…’।

আমি যখন ওই পঙক্তিটা পড়লাম আমি নিজে নিজে ভাবলাম যে আমি এমন কাউকে চিনি না যে কিনা ওরকমটা লিখতে পারে। যদি আমি এমন কাউকে চিনতাম তবে আমি অনেক অনেক আগে থেকেই লেখালেখি শুরু করতে পারতাম। কাজেই আমি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ছোটগল্প লেখা শুরু করলাম। ঐ গল্পগুলো পুরোপুরি বুদ্ধিবৃত্তিক ছোটগল্প কারণ আমি ওগুলো লিখেছিলাম আমার সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এবং তখন পর্যন্ত আমি সাহিত্য এবং জীবনের কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাইনি। বোগোতার এল এসপেকতাদোর দৈনিকের সাহিত্য পত্রিকায় ঐ গল্পগুলো ছাপা হয়েছিল এবং ওগুলো ঐ সময়ে নিশ্চিত সফলতা পেয়েছিল— সম্ভবত একারণে যে কলম্বিয়ার কেউই বুদ্ধিবৃত্তিক ছোটগল্প লেখেনি। তখন পর্যন্ত যা কিছু লেখা হয়েছিল তা ছিল গ্রাম্য জীবন এবং সামাজিক জীবনের জীবনচিত্র। যখন আমি আমার প্রথম দিককার ছোটগল্পগুলো লিখি আমি বলেছিলাম যে ওগুলোতে জয়েসের প্রভাব রয়েছে।

আপনি কি তখন জয়েস পড়েছিলেন?

আমি কখনোই জয়েস পড়িনি সে পর্যন্ত, কাজেই আমি ইউলিসিস পড়তে শুরু করলাম। আমি ওটা তখনকার সহজপ্রাপ্য স্পেনীয় সংস্করণ থেকে পড়লাম। তখন থেকে, ইউলিসিস ইংরেজিতে পড়ে একইভাবে খুব চমৎকার এক ফরাসী অনুবাদ পড়ে, আমি এটা দেখেছি যে প্রকৃত স্পেনিশ অনুবাদ খুবই খারাপ ছিল। কিন্তু আমি কিছু জিনিস শিখতে পারলাম যেটা আমার পরবর্তী লেখালেখিতে খুবই উপকারী হয়েছিল— অর্ন্তগত স্বগত উক্তির কৌশল। পরবর্তীকালে আমি এটা ভার্জিনিয়া উলফের মধ্যেও দেখেছি, এবং জয়েসের চেয়েও আমি তাঁর ব্যবহৃত পদ্ধতিকে বেশি পছন্দ করি। যদিও আমি পরে অনুধাবন করি যে ব্যক্তি এই অর্ন্তগত স্বগত উক্তির উদ্ভাবন করেছেন তিনি হচ্ছেন লাজারিলো দে টোরমেস এর অজ্ঞাতনামা লেখক।

প্রথম দিকে আপনাকে অনেক প্রভাবিত করেছে এমন কয়েকজনের নাম কি আপনি বলতে পারবেন?

যে সকল লোকেরা আমাকে আমার ছোটগল্পের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতা থেকে মুক্ত করতে প্রকৃতই সাহায্য করেছেন তারা হচ্ছেন আমেরিকার বিগত প্রজন্মের লেখককুল। আমি হৃদয়ঙ্গম করেছি যে তাদের সাহিত্যের সঙ্গে জীবনের একটা সম্পর্ক আছে যেটা আমার গল্পে ছিল না। এবং এরপর এমন একটি ঘটনা জায়গা করে নিল যেটা এই মনোভাবকে সম্মান করার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওটা ছিল ১৯৪৮ সালের ৯ই এপ্রিলের বোগোতাজো, যখন একজন রাজনৈতিক নেতা, গেইতানকে যখন গুলি করে হত্যা করা হলো এবং বোগোতার জনগণ পাগল হয়ে প্রলাপ বকতে বকতে রাস্তায় নেমে এলো। আমি আমার দুপুরের খাবার জন্য অবসর নিয়েছি তখন আমি খবরটি শুনলাম। আমি দৌড়ে চলে গিয়েছিলাম ঐ জায়গাটায়, কিন্তু গেইতানকে তখন মাত্র একটি ট্যাক্সিতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমার খাবারের বিশ্রামে ফেরার মধ্যে, লোকজন ইতোমধ্যে রাস্তায় নেমে গিয়েছে এবং তারা দোকানপাট লুট এবং দালানগুলোর জ্বলে যাওয়া দেখছে। আমি তাদের সঙ্গে যোগ দিলাম। ঐ বিকেল এবং সন্ধ্যায়, আমি কী ধরনের দেশে বসবাস করছি এ বিষয়ে সচেতন হলাম, এবং আমার ছোটগল্পগুলো এর যে কোনো কিছুর সঙ্গে কত অল্প করতে পারে। এবং পরে আমাকে যখন জোর করে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ব্যারেনকুইলায় ফেরত পাঠানো হলো, যেখানে আমি আমার শৈশব কাটিয়েছি, আমি অনুধাবন করলাম যে এটাই সেই জীবন যেটা আমি যাপন করতাম, জানতাম, এবং আমি এ বিষয়ে লিখতে চেয়েছিলাম।

১৯৫০ বা ১৯৫১-এ অন্য আরেকটি এমন ঘটনা ঘটলো যেটা আমার সাহিত্যের প্রবণতাকে প্রভাবিত করলো। আমার মা আমাকে আরাকাটাকাতে তাঁর সঙ্গে থাকার জন্য বললেন, যেখানে আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম, এবং যে ঘরটিতে আমার জীবনের প্রথমবছরগুলো কাটিয়েছি সে ঘরটি বিক্রি করার জন্য বললেন। আমি যখন সেখানে গেলাম এটা আমার জন্য প্রথমেই খুব একটা চমকে যাবার মতো ব্যাপার ছিল কারণ তখন আমার বয়স ছিল বাইশ এবং আমি সেখানে আট বছর বয়স থেকে আর বসবাস করতাম না। প্রকৃতপক্ষে কিছুই পরিবর্তিত হয়নি, কিন্তু আমার মনে হলো যে আমি সত্যি সত্যিই এই গ্রামটিকে কখনো দেখিনি। কিন্তু এটার সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা আছে যেন আমি কোথাও এটার সম্পর্কে পড়েছি। এটা এমন ছিল যেন সবকিছু আমি যা দেখেছিলাম সবই কোথাও লেখা হয়ে গিয়েছিল, এবং আমি যেন কোথাও বসে পড়ে সব কিছু নকল করে নিয়েছি যা আমি পড়েছি এবং যা এখানে এর মধ্যেই আছে।

সকল ব্যবহারিক উদ্দেশ্যের জন্য সবকিছুই যেন সাহিত্যের মধ্যে প্রকাশিত হয়ে গেছে; ঘরগুলো, লোকজন, এবং স্মৃতি। আমি নিশ্চিত নই ঐ সময় আমি ফকনার পড়ে ফেলেছি অথবা পড়িনি, কিন্তু এখন আমি জানি যে ফকনারের মতো এই কৌশলটা আমাকে আমি যা দেখেছিলাম তা লিখে ফেলতে সমর্থ করতো। ঐ পরিবেশ, অবক্ষয়, গ্রামের মধ্যের গরম খসড়া অবস্থায় যেন সেই একই যা আমি ফকনারে অনুভব করেছি। ওটা ছিল একটা কলা উৎপাদনকারী এলাকা, যেখানকার অধিবাসীরা ছিল ফল কোম্পানি থেকে আসা প্রচুর সংখ্যক আমেরিকান যেটা আমি খুঁজে পেয়েছি দক্ষিণের গভীরের লেখকদের মধ্যে। সমালোচকরা হয়তো বলবেন এটা ফকনারের সাহিত্যিক প্রভাব, কিন্তু আমি এটাকে একটি কাকতাল বলেই দেখেছি। আমি সাধারণভাবে সেই সব উপাদান খুঁজে পেয়েছি যেটা আলোচনায় এসেছে যে একইভাবে একই উপায়ে একই ধরনের উপাদান ফকনারও ব্যবহার করেছেন।

গ্রামের সেই ভ্রমণ থেকে ফিরে আসার পর আমি আমার প্রথম উপন্যাস লিখলাম ‘পাতা ঝড়’। যেটা সত্যিই আমার আরাকাটাকার ভ্রমণে ঘটেছিল যাতে আমি অনুধাবন করতে পেরেছিলাম ঐ সবকিছু যা আমার শৈশবে ঘটেছে তার একটি সাহিত্যিক মূল্য আছে যার মূল্য আমি শুধুমাত্র এখনই বুঝতে পারছি। যে মুহূর্তে আমি পাতা ঝড় লিখলাম আমি বুঝতে পারলাম আমি একজন লেখক হতেই চেয়েছি এবং এজন্য কেউই আমাকে থামাতে পারবে না এবং শুধুমাত্র একটি বিষয়ই আমার জন্য অবশিষ্ট আছে যে আমাকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক হবার জন্য চেষ্টা করে যেতে হবে। ওটা ছিল ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ, কিন্তু ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের আগে আমি আমার প্রথম লেখক সম্মানী পাইনি আমার আটটি বইয়ের মধ্যে তখন পাঁচটি লেখা হয়ে গেছে।

আপনি কি মনে করেন যে তরুণ লেখকদের মধ্যে এটা খুবই সাধারণ ব্যাপার যে তারা তাদের শৈশবের মূল্য এবং অভিজ্ঞতাকে ফিরিয়ে দেয় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ের দিকে যায় যেটা আপনি শুরুতে করেছিলেন।

না, পদ্ধতিটা সাধারণত অন্যান্য উপায়ে জায়গা করে নেয়, কিন্তু যদি আমি কোনো তরুণ লেখককে উপদেশ দিই যে তার সঙ্গে যা ঘটেছে তাই যেন সে লেখে; এটা বলা সবসময়েই সহজ যে যখন একজন কোনো বিষয়ে লেখে সেটা হয়তো তার সঙ্গে ঘটেছে অথবা সেসময়ের কিছু একটা সে পড়েছে অথবা তাকে  বলা হয়েছে। পাবলো নেরুদার কবিতার একটি লাইন আছে যাতে তিনি বলেছেন, ‘ঈশ্বর, যখন আমি গান গাই আমাকে কল্পনা থেকে সাহায্য করো’। এটা সবসময়ই আমার জন্য আনন্দদায়ক হয়েছে যে আমার কাজের সবচেয়ে বেশি বেশি প্রশংসা এসেছে যে কাজগুলো আমার কল্পনা থেকে এসেছে, যেখানে আমার পুরো কাজের মধ্যে একটিমাত্র লাইনও সত্যি নয়, বা সেটা কোনো বাস্তবতার ভিত্তিকে করা হয়নি। সমস্যা হচ্ছে ঐটা যে ক্যারিবিয়ান বাস্তবতা হচ্ছে বন্যতম কল্পনার অনুরূপ।

এখানে আপনি কাদের জন্য লেখেন? আপনার পাঠক কারা?

পাতা ঝড় লেখা হয়েছিল আমার বন্ধুদের জন্য, যারা আমাকে বই ধার দিয়েছিল এবং নানাভাবে সাহায্য করেছিল এবং আমার কাজ সম্পর্কে ভীষণ আগ্রহান্বিত ছিল। সাধারণভাবে আমি মনে করি আপনি অবশ্যই কারো জন্য লিখে থাকেন। যখন আমি লিখি, সবসময়েই এবিষয়ে সতর্ক থাকি যে এই বন্ধুরা এটা অবশ্যই পছন্দ করবে, অথবা অন্য কোনো বন্ধু এই অনুচ্ছেদটি অথবা অধ্যায়টি পছন্দ করবে, সবসময়েই কোনো বিশেষ লোকের কথা চিন্তা করতে থাকি। শেষ পর্যন্ত সকল বইই আপনার বন্ধুদের জন্য লেখা হবে। একশত বছরের নিঃসঙ্গতা লেখার পর যে সমস্যাটি এলো, যে সকল লক্ষ লক্ষ পাঠকের জন্য আমি ওটা লিখেছি আমি আর তাদের চিনি না; এটা আমাকে বিশৃঙ্খল করে এবং বাধা দেয়। এটা যেন ঠিক লক্ষ লক্ষ লোক আপনার দিকে তাকিয়ে আছে এবং কিন্তু আপনি সত্যিই জানতে পারছেন না যে তারা আসলে কী ভাবছে।

আপনার ফিকশনে সাংবাদিকতার প্রভাব রয়েছে কি?

আমার মনে হয় এই প্রভাবটা খুবই পরস্পর সম্বন্ধবাচক। ফিকশন আমার সাংবাদিকতাকে সাহায্য করে কারণ এটা সংবাদকে একটা সাহিত্যিক মূল্য দেয়। সাংবাদিকতা আমার ফিকশনকে সাহায্য করে কারণ এটা আমাকে বাস্তবতার সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্কে ধরে রাখে।

পাতা ঝড় লেখার পরে আপনি যে বিশেষ লেখকরীতি অনুসন্ধান করেছেন এবং আপনি আপনার একশত বছরের নিঃসঙ্গতা লিখতে সফল হয়েছেন এই খোঁজকে আপনি কিভাবে বর্ণনা করবেন?

পাতা ঝড় লেখার পরে, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে গ্রাম সম্পর্কে ও নিজের শৈশব সম্পর্কে লেখালেখি আসলেই নিজের মুখোমুখি হওয়া থেকে এবং আমার দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে একধরনের পলায়ন। আমার আসলে একধরনের কৃত্রিম অস্পষ্ট বিশ্বাস ছিল, যেটা আমি চলতে থাকা রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে সাহসের সঙ্গে সম্মুখিন হবার বদলে, আমার এই ধরনের গৃহকাতরতার পেছনে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলাম। ওটা ছিল সেই সময় যখন রাজনীতি এবং সাহিত্যের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল খুব বেশি বাদানুবাদের বিষয়। আমি এই দুয়ের মধ্যকার দূরত্বেকে কমানোর চেষ্টা করেছি।

ফকনার আমাকে প্রভাবিত করেছিলেন;  প্রভাবিত করছিলেন হেমিংওয়ে। আমি লিখলাম, কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না, শয়তানের প্রহর, এবং বড় মামার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, যেগুলো সবই কমবেশি একই সময়ে লেখা হয়েছিল এবং যাতে অনেক বিষয়ই একই রকম ছিল। এই গল্পগুলো পাতা ঝড় এবং একশত বছরের নিঃসঙ্গতার গল্পের থেকে ভিন্ন গ্রামে অবস্থান করে নিয়েছিল। এটা ছিল এমন গ্রাম যেখানে কোনো জাদু ছিল না। এটা হচ্ছে একটি সংবাদভিত্তিক সাহিত্য। কিন্তু আমি যখন শয়তানের প্রহর শেষ করলাম, আমি দেখলাম আমার সকল দর্শনই আবারও ভুল হচ্ছে। আমি দেখতে পেলাম যে আমি যা ভাবতাম তার চেয়ে আমার শৈশবকে নিয়ে আমার লেখা ছিল বেশি পরিমাণে রাজনৈতিক এবং আরো আমার দেশের প্রশ্নে অনেক বেশি বাস্তবতার কাছাকাছি।

শয়তানের প্রহর লেখার পর পাঁচ বছর আমি আর কিছুই লিখিনি। আমি সবসময় যা করতে চাইতাম সে বিষয়ে আমার একটা পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সেখানে কিছুর অভাব ছিল এবং সেটা যে কি সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম না, যতদিন পর্যন্ত না আমি সঠিক সুরটি আবিষ্কার করতে পারলাম— সেই সুর যা অবশেষে আমি একশত বছরের নিঃসঙ্গতা বইয়ে ব্যবহার করেছি। আমার দাদীমা গল্প বলতে যে ভঙ্গি ব্যবহার করতেন এটার ভিত্তি ছিল সেটা। তিনি যে বিষয়ে বলতেন সেটা শুনতে যেন অলৌকিক এবং অবাস্তব বলে মনে হতো, কিন্তু তিনি সেটাকেই একেবারে পরিপূর্ণ স্বাভাবিকতার সঙ্গে বলতেন। শেষ পর্যন্ত আমি যখন এই সুরটি আবিষ্কার করলাম ওটাকে আমাকে ব্যবহার করতে হলো, আমি আঠারো মাস একটানা প্রতিদিন কাজ করলাম।

কী করে তিনি এই ‘অদ্ভুত’কে এত স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ করতেন?

যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা হচ্ছে তাঁর মুখে যে অভিব্যক্তি ছিল সেটি। তিনি যখন গল্প বলে চলতেন তখন তিনি তাঁর মুখভঙ্গির এতটুকু পরিবর্তন ঘটাতেন না, এবং প্রত্যেকে বিস্মিত হয়ে যেত। একশ বছরের নিঃসঙ্গতা লেখার প্রথম দিককার প্রয়াসে আমি এই গল্পটিকে বিশ্বাস না করে বলতে চেয়েছিলাম। আমি আবিষ্কার করলাম যে আমি যা করতে চাই আমার নিজেকে তাকে বিশ্বাস করতে হবে এবং এগুলোকে সেই একই অভিব্যক্তিতে লিখতে হবে যে চেহারায় আমার দাদীমা তাদের বলতেন; পাথুরে চেহারায়।

এখানেও মনে হয় যে একটি সাংবাদিকসুলভ ধরন রয়েছে এই কৌশল অথবা সুরে। আপনি আপাতদৃষ্টিতে এই বিস্ময়কর ঘটনাটাকে এই কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশদ বর্ণনা করেছেন, এতে এটায় তাদের নিজেদের বাস্তবতাকে তুলে ধরা হয়েছে। এটা কি কিছুটা এরকম যে আপনি সাংবাদিকতা থেকে সযত্নে বাছাই করেছেন এসব?

ওটা একটা সাংবাদিকসুলভ কৌশল যেটাকে আপনি সাহিত্যেও ব্যবহার করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি বলেন যে সেখানে আকাশে হাতিরা উড়ছে, লোকজন আপনাকে বিশ্বাস করতে যাবে না। কিন্তু যদি আপনি বলেন যে সেখানে চারশ পঁচিশটি হাতি আকাশে উড়ছে, লোকজন সম্ভবত আপনাকে বিশ্বাস করবে। একশত বছরের নিঃসঙ্গতা পরিপূর্ণভাবে এই ধরনের জিনিস। ওটা একেবারে সেই কৌশল যেটা আমার দাদীমা ব্যবহার করতেন। আমি বিশেষভাবে গল্পের সেই চরিত্রটির কথা স্মরণ করতে পারি যে কিনা হলুদ প্রজাপতি দ্বারা ঘেরা থাকতো। যখন আমি খুবই ছোট একজন ইলেকট্রিশিয়ান আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। আমি খুবই কৌতুহলী হয়ে উঠেছিলাম তার ব্যাপারে, কারণ তার সাথে ছিল একটি হলুদ বেল্ট, যা দিয়ে তিনি ইলেকট্রিক পোস্টে ঝুলে থাকতেন।

আমার দাদীমা প্রায়ই বলতেন যে প্রত্যেকবারই যখন এই লোকটি আসেন, তিনি ঘরটাকে প্রজাপতিতে পরিপূর্ণ করে রেখে যান। কিন্তু আমি যখন এটা লিখি, আবিষ্কার করি যদি আমি না বলি যে প্রজাপতিগুলো হলুদ ছিল, লোকজন ওটা বিশ্বাস করবে না। যখন আমি সুন্দরী রেমেডিওস স্বর্গে যাচ্ছে এই এপিসোডটি লিখি, এটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে দীর্ঘ সময় নিতে হয়। একদিন আমি বাগানে বেড়িয়ে আসি এবং দেখি একজন নারী যিনি প্রায়ই এ বাড়িতে আসতেন আর কাপড় ধুয়ে বাতাসবহুল জায়গায় মেলে দিতেন। তিনি বাতাসের সঙ্গে অনুযোগ করতেন বাতাস যেন কাপড়গুলো উড়িয়ে না নেয়। আমি আবিষ্কার করি আমি যদি সুন্দরী রেমেডিওসের জন্য এই কাপড়গুলো ব্যবহার করি, সে হয়তো স্বর্গে চলে যাবে। ব্যাপারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য এটা এভাবেই আমি করেছিলাম। প্রত্যেক লেখকের জন্যই বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাটা একটা সমস্যা। যে কেউ যে কোনোকিছু লিখতে পারে যদি এটা বিশ্বাসযোগ্য হয়।

একশত বছরের নিঃসঙ্গতা’য় উল্লিখিত অনিদ্রার মহামারী বিষয়টির উৎপত্তির জায়গা কোনটি?

ওডিপাসের শুরু থেকে সবসময় আমি প্লেগ সম্পর্কে ভীষণ আগ্রহী ছিলাম। আমি মধ্যযুগীয় প্লেগ সম্পর্কে প্রচুর পড়াশোনা করেছি। আমার প্রিয় বইয়ের মধ্যে একটা হচ্ছে ড্যানিয়েল ডিফোর প্লেগের বছরের দিনপঞ্জী। অন্যান্য কারণের মধ্যে, যেহেতু ডিফো একজন সাংবাদিক, তিনি যা বলতেন পুরোপুরি অবাস্তব বলে মনে হতো। অনেক বছর ধরে আমি ভেবেছিলাম, ডিফো নিজে পরিদর্শন করে লন্ডনের প্লেগ সম্পর্কে লিখেছেন। কিন্তু পরে আমি আবিষ্কার করি এটা একটা উপন্যাস ছিল, কারণ লন্ডনে যখন প্লেগের আক্রমণ ঘটতো ডিফোর বয়স ছিল তখন সাত বছরেরও কম। প্লেগ সবসময়ই আমার কাছে একটি পুনরাবর্তক বিষয় হিসেবে বিভিন্ন আকারে ছিল। শয়তানের প্রহর গল্পে, ক্ষুদ্র পুস্তিকাগুলো ছিল প্লেগের। অনেক বছর ধরে আমি ভাবছিলাম কলম্বিয়ার রাজনৈতিক সহিংসতার সাধারণ দর্শন যেন ঠিক সেই প্লেগের মতো একই। একশত বছরের নিঃসঙ্গতা লেখার আগে ‘শনিবারের পরের এক দিন’ গল্পে প্লেগকে আমি পাখি মারার কাজে ব্যবহার করেছিলাম। একশত বছরের নিঃসঙ্গতা’য় অনিদ্রার মহামারীকে সাহিত্যিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করলাম, এখন পর্যন্ত এটা ঘুমানোর মহামারীর ঠিক উল্টো দিক। বস্তুত সাহিত্যচর্চা আসলে কাঠমিস্ত্রিগিরি ছাড়া আর কিচ্ছু নয়।

সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ের মধ্যকার এই সাদৃশ্য বা বিরোধালংকারের ব্যাপারটাকে আরেকটু বিস্তৃতভাবে ব্যাখা করবেন কি?

এই দুটোই ভীষণ কঠিন কাজ। লেখালেখি করা ঠিক যেন একটি টেবিল তৈরির মতোই কঠিন কাজ। দুটোই আপনাকে করতে হবে বাস্তবতার নিরিখে, ঠিক কাঠের মতোই শক্ত নিরেট একটি উপাদান দিয়ে। দুটোই বিশেষ নৈপূণ্য এবং প্রয়োগকৌশলে পরিপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে খুব অল্প পরিমাণ জাদু এবং প্রচুর পরিমাণে পরিশ্রম এখানে সম্পৃক্ত থাকে। এবং ঠিক প্রুস্তের মতোই আমি ভাবি, বলি, এটা দশ ভাগ প্রণোদনা নেয় এবং নব্বই ভাগই ঘর্মনিঃসরণ করায়। আমি কখনো কাঠমিস্ত্রির কাজ করিনি কিন্তু আমার সবচেয়ে পছন্দের কাজ এটা, বিশেষ লক্ষ্যণীয় ব্যাপার এই যে, তুমি কাউকেই খুঁজে পাবে না যে তোমার জন্য এ কাজটা করে দেবে!

একশত বছরের নিঃসঙ্গতা’র কলার জ্বর সম্পর্কে কী বলবেন? ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির ওপরে এর কতটা ভিত্তি ছিল?

বাস্তবতার একেবারে কাছ থেকে কলার জ্বরের প্রতীকটি নেয়া হয়েছে। অবশ্যই, আমি বিষয়গুলোর উপরে বিশেষ সাহিত্যিক নৈপূণ্য ব্যবহার করেছি যাতে সেটাকে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ করা না যায়। উদাহরণস্বরূপ, স্কয়ারের বেপরোয়া গণহত্যা একেবারে সঠিক তথ্য, কিন্তু আমি ওটা সাক্ষ্য-প্রমাণ সহকারে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে লিখি, এটা কখনোই জানা যায়নি ঠিক কতগুলো লোককে হত্যা করা হয়েছিল। আমি সংখ্যাটি দিয়েছি তিন হাজার, এটা অবশ্যই একটি অতিরঞ্জন। কিন্তু আমার শৈশবের স্মৃতিগুলোর একটিতে আমি দেখতে পাই একটি দীর্ঘ, ভীষণ দীর্ঘ রেলগাড়ি কলায় পরিপূর্ণ হয়ে এই চাষভূমি ছেড়ে যাচ্ছে। সেখানে কমপক্ষে তিনহাজার ওটার উপরে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। এটা খুবই বিস্ময়কর যে এখন তারা খুবই সাধারণভাবে স্বাভাবিকভাবে কংগ্রেসে এবং পত্রপত্রিকায় বলে ফেলে যে ‘তিন হাজার মারা গেছে’। আমি সন্দেহ করি যে আমাদের অর্ধেক ইতিহাসই এরকম অনুমানপ্রসূত। গোত্রপতির শরৎকাল-এ, এর নির্দেশক বলেছেন এটা কোনো বিষয় না যে এটা এখন সত্যি নয়, কারণ ভবিষ্যতে কোনো একদিন এটা সত্যি হয়ে উঠবে। অতি শীঘ্র হোক বা দেরিতে লোকজন সরকারের চাইতে লেখককেই বেশি বিশ্বাস করে।

এটা লেখককে যথেষ্ট শক্তিশালী করে তোলে, তাই নয় কি?

হ্যাঁ, এবং আমিও এটা উপলব্ধি করি। এটা আমাকে দায়িত্বশীলতার এক মহান বোধে আচ্ছন্ন করে। আমি সাংবাদিকতার যে অংশটিতে কাজ করতে সত্যিই পছন্দ করি সেটা হচ্ছে পুরোপুরি সত্য এবং বাস্তবতায়, কিন্তু সেটা একশত বছরের নিঃসঙ্গতার মতো কল্পনাশ্রয়ী হয়ে ওঠে। আমি যত বাস করতে থাকি এবং অতীত থেকে বিষয়গুলো স্মরণ করি, যত আমি চিন্তা করি দেখি যে সাহিত্য এবং সাংবাদিকতা ভীষণ নিকট সম্পর্কিত।

একটি দেশ যদি তার বৈদেশিক ঋণের জন্য তার সমুদ্রকে দিয়ে দেয় তবে কী হবে, যেমনটা গোত্রপতির শরৎকাল-এ ঘটেছিল!

হ্যাঁ, কিন্তু ওটা সত্যিই ঘটেছিল। এটা ঘটেছিল এবং আরো অনেকবার ঘটবে। গোত্রপতির শরৎকাল— একটি সম্পূর্ণই ঐতিহাসিক বই। প্রকৃত ঘটনার বাইরে সম্ভাব্যকে খুঁজে বের করা সাংবাদিক এবং ঔপন্যাসিকদের কাজ, এবং এটা নবীদেরও কাজ। সমস্যাটা হচ্ছে প্রচুর মানুষ বিশ্বাস করে যে আমি কল্পনাশ্রয়ী ফিকশনের লেখক, তাই যখন আমি সত্যিই বাস্তববাদী ব্যক্তি এবং আমি যা বিশ্বাস করি সেটা লিখি এটাই হচ্ছে যথার্থ সামাজিক বাস্তবতা।

এটা কি ইউটোপিয়ান?

যদি ইউটোপিয়ান শব্দটি দিয়ে বাস্তব অথবা আদর্শ বোঝায় সেক্ষেত্রে আমি এতে নিশ্চিত নই। কিন্তু আমি মনে করি যে এটাই হচ্ছে বাস্তব।

উদাহরণস্বরূপ, গোত্রপতির শরৎকাল-এর চরিত্রসমূহ, পরিচালকগণ, এর ছাঁচ কি বাস্তব চরিত্র থেকে নেয়া হয়েছে? এদের ফ্রাঙ্কো, পেরণ এবং ত্রুজিলোর মতো মনে হয়।

প্রত্যেক উপন্যাসে, চরিত্র হচ্ছে একটি কোলাজ, পৃথক চরিত্রের কোলাজ, যেসব চরিত্রসমূহকে আপনি জানেন, অথবা সেসব চরিত্র সম্বন্ধে আপনি পড়েছেন অথবা আপনি শুনেছেন এসবের আলাদা চরিত্রের কোলাজ। আমি সবকিছু পড়েছি যেটা আমি পুরো গত শতাব্দীর এবং এই শতাব্দীর শুরুতে লাতিন আমেরিকার স্বৈরশাসকদের মধ্যেও খুঁজে পেয়েছি। এছাড়াও আমি প্রচুর লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি যারা স্বৈরশাসনের অধীনে বসবাস করতেন। কমপক্ষে দশ বছর আমি এটা করেছি। এবং যখন আমার একদম পরিষ্কার ধারণা হয়েছে যে চরিত্রগুলো ঠিক কী ধরনের হতে যাচ্ছে, আমি যা কিছু শুনেছি এবং পড়েছি সেসবের সবকিছু ভুলে যাবার জন্য একটা জোর চেষ্টা করেছি, এজন্য যে যেটা বাস্তব জীবনে ছিল সে সবের কোনো ধরনের কোনোটিকে ব্যবহার না করেই আমি যেন সবকিছু কল্পনা করে নিতে পারি।

আমি একটা জিনিস অনুধাবন করতে পারছিলাম যে, আমি নিজে স্বৈরশাসনের অধীনে কখনো কোনো পর্যায়েই বসবাস করিনি, তাই আমি চিন্তা করলাম, যদি আমি বইটি স্পেনে লিখি, একটি প্রতিষ্ঠিত স্বৈরশাসনের পরিবেশ ঠিক কী ধরনের ছিল তা আমি দেখতে পারবো। কিন্তু আমি দেখতে পেলাম যে স্পেনে ফ্রাঙ্কোর অধীনের স্বৈরশাসন অন্যান্য ক্যারিবিয়ান স্বৈরশাসনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। কাজেই প্রায় এক বছর বইটির কাজ একধরনের বন্ধই ছিল। সেখানে কিছু একটা বাদ পড়ে গিয়েছিল এবং আমি জানি না আসলে সেটা কী ছিল। এরপর একরাত্রের মধ্যেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত কাজটি হবে যদি আমরা ক্যারিবিয়ানেই ফিরে আসি। কাজেই আমরা সকলে কলম্বিয়ার ব্যারেনকুইলায় ফিরে এলাম। আমি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে একটি লিখিত বিবৃতি দিলাম যেটাকে তারা একটি কৌতুক হিসেবেই ধরে নিল। আমি বলেছিলাম আমি ফিরে এসেছি কারণ আমি পেয়ারার গন্ধ কেমন তা ভুলে গেছি। আসল সত্য হচ্ছে, এটা হচ্ছে তাই যেটা আমার বইটি সম্পূর্ণ করার জন্য দরকার। আমি ক্যারিবিয়ানের মধ্যে একটি ভ্রমণ উদ্যোগ নিলাম। যাতে আমি দ্বীপ থেকে দ্বীপে যেতে পারি, আমার উপন্যাসে যেটির ঘাটতি ছিল আমি সেই উপাদানটি খুঁজে পেলাম যেটা সেখানে ছিল।

আপনি প্রায়ই নিঃসঙ্গতার ক্ষমতার প্রসঙ্গকে ব্যবহার করেন।

আপনার প্রচুর ক্ষমতা রয়েছে, কঠিনতর হচ্ছে এটা জানা যে কোন ক্ষমতাটি আপনার মধ্যে নিহিত রয়েছে এবং কোনটি নিহিত নয়। আপনি যখন সেই সুনিশ্চিত ক্ষমতাটির কাছে পৌঁছান, সেখানে বাস্তবতার সঙ্গে কোনো যোগসূত্র থাকে না, এবং সেখানে হতে পারে ঐটাই হচ্ছে জঘন্যতম ধরনের নিঃসঙ্গতা। একজন খুবই ক্ষমতাশালী ব্যক্তি, একজন স্বৈরশাসক, এমনসব স্বার্থপর লোক দ্বারা ঘেরা থাকে যাদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো ওই লোকটিকে সকল ধরনের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা; সবকিছুই তার থেকে সকলে মিলে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাক্ষাৎকার : প্রথম পর্ব

Facebook Comments
বিপাশা মণ্ডল

বিপাশা মণ্ডল

বিপাশা মণ্ডল, কবি, গল্পকার ও অনুবাদক।