হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র

share on:
হুমায়ূন আহমেদ

সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকে পাঠকদের কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মত কিছু নেই। বাংলা ভাষা জানে অথচ হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়নি এমন মানুষকে খুঁজে পাওয়া বোধহয় শার্লক হোমসের পক্ষেও সম্ভবপর হবে না। শুধু পরিচয় নয়, কোটি কোটি পাঠক হুমায়ূন সৃষ্ট চরিত্রের মায়াজালে মোহগ্রস্থ থেকেছে দীর্ঘকাল।

শরৎচন্দ্রের দেবদাসের পরে হিমু বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রের নাম একথা বলে দেওয়ার দরকার পরে না। তবে সাহিত্যিক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ যতটুকু আলোচিত, নির্মাতা হিসেবে হুমায়ুন আহমেদ ততটা আলোচিত নন। যদিও বর্তমান সময়ের আলোচিত অনেক নির্মাতার চেয়ে জনপ্রিয়তায়, গল্পে ও নির্মানের বিচারে হুমায়ূন আহমেদের স্থান কোন অংশেই কম নয়।

হুমায়ূন আহমেদের প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ নির্মিত হয় ১৯৯৪ সালে। সরকারি অনুদানে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক এ চলচ্চিত্রটি সেই বছর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে আটটি ক্যাটাগরিতে পুরষ্কার জিতে নিয়েছিল। তবে নির্মাতা হিসেবে ‘আগুনের পরশমণি’ হুমায়ূন আহমেদের প্রথম নির্মান নয়।

শুরুটা হয়েছিল ছোটপর্দার নাটকের জন্য একজন গল্পকার হিসেবেই। আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ‘এইসব দিনরাত্রি’ ধারাবাহিক নাটক দিয়ে এই পথে যাত্রার শুরু।  ‘এই সব দিনরাত্রি’ তাকে এনে দিয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়তা। নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান।

এরপর ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘নক্ষত্রের রাত’-এর মতো জনপ্রিয় নাটক নির্মীত হয় তার গল্পেই। ১৯৯২ সালের ‘শঙ্খনীল কারাগার’ সিনেমাটির গল্পকারও তিনিই। এই সিনেমার মাধ্যমেই সেরা গল্পকারের জাতীয় চলচ্চিত্রকারের সম্মান অর্জন করেন হুমায়ূন আহমেদ।

তার হাসির নাটক ‘বহুব্রীহি’ এবং ঐতিহাসিক নাটক ‘অয়োময়’ বাংলা টিভি নাটকের ইতিহাসে অনন্য সংযোজন। ধারাবাহিক নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’—এর চরিত্র বাকের ভাই বাস্তব হয়ে উপস্থিত হয়েছিলো টিভি দর্শকদের কাছে। নাটকের শেষে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির রায় হলে ঢাকার রাজপথে বাকের ভাইয়ের মুক্তির দাবিতে মিছিল পর্যন্ত করেছিলো দর্শকেরা। এমনকি ঘরে ঘরে নামায পড়ে, রোযা রেখে দোয়ার অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। বাংলা নাটকের ইতিহাসে এমনটি আর কখনও হয়নি, বোধহয় হবেও না। শুধু বাংলা নাটকের ইতিহাসে কেন, পৃথিবীর ইতিহাসেও বোধহয় এমন ঘটনা আর দ্বিতীয়টি নাই। টিভি নাটকের দর্শককে কিভাবে কাহিনীর মাঝে আটকে রাখা যায়, একাত্ম করা যায় তা খুব ভালোই জানতেন হুমায়ূন আহমেদ। ঈদ মানেই ছিল তার নাটক, কিছু সময়ের জন্য নির্মল বিনোদন ছিল নিশ্চিত। হুমায়ূন আহমেদের ঈদের নাটকটি ছিলো মধ্যবিত্ত বাঙালির অন্যতম প্রধান বিনোদন মাধ্যম।

তারপর একের পর এক টিভি নাটক লেখা ও নির্মান করে তৈরি করেছিলেন নিজস্ব ধারা। হুমায়ূনের উপন্যাসের মত তাঁর নির্মিত নাটকও হয়ে উঠেছিলো বাংলাভাষাভাষি দর্শকদের নিত্যদিনের সঙ্গী। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় হুমায়ূন আহমেদ নির্মীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’। এরপর একে একে তিনি নির্মাণ করেছেন আরও সাতটি সিনেমা। সাহিত্য এবং টিভি নাটকের মতো চলচ্চিত্রেও মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। পেয়েছেন তুমুল জনপ্রিয়তাও।

হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রগুলোতে কিন্তু আমরা সচরাচর যে হুমায়ূন আহমেদকে দেখে অভ্যস্ত সেই হুমায়ূন আহমেদকে পাই না। সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এখানে কোন প্রকারের ছাপ ফেলতে পারে নি। এ এক অন্য হুমায়ূন আহমেদ। যদিও চলচ্চিত্রগুলো নির্মিত হয়েছে তার রচিত উপন্যাসকে আশ্রয় করেই। কিন্তু গল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি থেকেছেন অনেক বেশি সচেতন। বিষয়—বৈচিত্রে আলাদা স্বাদের উপন্যাসগুলোকেই তিনি বেছেছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তা ছাড়া উপস্থাপনার ধরণ ও অভিনব নির্মাণশৈলি হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রে তৈরি করেছে নিজস্ব চলচ্চিত্রিক ভাষা। যা দেখলেই বোঝা যায় এটা হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র। একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে জহির রায়হান ও আলমগীর কবিরের পর একমাত্র হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রেই আমরা এ বিষয়টি খুজে পাই।

হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রকে বিষয়ের বৈচিত্রে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়— এক. মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র দুই. প্রেমের চলচ্চিত্র তিন. ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র চার. কমেডি চলচ্চিত্র। হুমায়ূন আহমেদ সব মিলিয়ে চলচ্চিত্র নির্মান করেছেন ৮টি।

আগুনের পরশমণি ও শ্যামলছায়া হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা বাংলাদেশে একেবারে কম নয়। কিন্তু প্রায় সকল চলচ্চিত্রেই মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা—ভয়াবহতার পরিবর্তে আমরা দেখতে পাই নায়ক—নায়িকার প্রেম ও সামান্য বন্দুকযুদ্ধ। আগুনের পরশমণি চলচ্চিত্রে হুমায়ূন আহমেদ যেভাবে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার বিরল। আগুণের পরশমণি চলচ্চিত্রে হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা অপারেশনের চিত্র তুলে ধরেছেন। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি পরিবারের সংকট—সমস্যা ও মুক্তযোদ্ধার প্রতি গভীর মমত্ববোধ তুলে ধরেছেন। ফলে পরিবারটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সামগ্রিকতার প্রতিনিধি। আর শ্যামলছায়া চলচ্চিত্রে যুদ্ধ না দেখিয়েও যেভাবে যুদ্ধের আবহ ও ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন— তা তার নির্মাতা হিসেবে শক্তিমত্তারই বহিঃপ্রকাশ।

শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারি, আমার আছে জল হুমায়ুন আহমেদের রোমান্টিক ঘরানার চলচ্চিত্র। তবে হুমায়ূনের উপন্যাসে আমরা যেরকম প্রেম দেখি এ চলচ্চিত্রগুলোর প্রেম কিছুটা হলেও আলাদা একমাত্র ‘আমার আছে জল’ ছাড়া। বিশেষ করে দুই দুয়ারি চলচ্চিত্রে হুমায়ূন আহমেদের বিষয় ভাবনা দর্শনগত। আনন্দময় জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান ছড়িয়ে রয়েছে সারা চলচ্চিত্রে। শ্রাবণ মেঘের দিনে মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার যে বহিঃপ্রকাশ রয়েছে তা উন্নততর চলচ্চিত্রেরই উধাহরণ।

চন্দ্রকথা ও ঘেটুপুত্র কমলা হুমায়ূন আহমেদের ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র। ভারতীয় উপমহাদেশে জমিদারদের শোষণ, নির্যাতন ও নিম্ন মানসিকতার প্রতি এ চলচ্চিত্রগুলোতে উঠে এসেছে তীব্র প্রতিবাদ।

নয় নম্বর বিপদ সংকেতকে কমেডি চলচ্চিত্রের কাতারে ফেলাই যায়। তবে নয় নম্বর বিপদ সংকেত বোধহয় হুমায়ুন আহমেদের সবচেয়ে দুর্বল চলচ্চিত্র। যদিও আমাদের দেশে যাদেরকে নিয়ে সমাজে কমেডির তৈরি হয় তারা কিছুটা দুর্বল স্বভাবের মানুষই থাকে। আর তাই মনে হয় হুমায়ূন আহমেদ এ চলচ্চিত্র উপস্থাপনায় বেছে নিয়েছিলেন এ পন্থা। তাছাড়া শিল্প—সংস্কৃতিতে ‘ডলস আর্টস’ বলে একটা কথা আছে। হয়তো এ সময় হুমায়ূন আহমেদকে চলচ্চিত্র নিয়ে পুতুল পুতুল খেলায় পেয়ে বসেছিলো।

হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রের একটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গানের ব্যবহার। এ কথা মানতেই হবে যে গান ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মজ্জাগত একটি ব্যপার। যেকোন বিষয়েই গান প্রেরণা ও প্রকাশের মাধ্যম। হুমায়ূন আহমেদ এই ব্যপারটি ধরতে পেরেছিলেন। আর তাই হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রে গান আসে ভিন্নমাত্রায়।

আগুনের পরশমণিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের চমৎকার ব্যবহার, দুই দুয়ারীর মাথায় পড়েছি সাদা ক্যাপ ও লীলাবালি, শ্রাবণ মেঘের দিনে পুবালী বাতাসে, আমার গায়ে যত দুঃখ সয়,এক যে ছিলো সোনার কন্যা, শুয়া চান পাখি, চন্দ্রকথায় উড়ালপঙ্খী, ঘেটুপুত্র কমলায় যমুনার জল গানগুলো মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তুলেছিলো। তাছাড়া চলচ্চিত্রে আবহমান বাংলার লোকজ গান আত্মিকভাবে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে ছিলো।

Facebook Comments
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।