চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণ : লোকসাহিত্যের দিকপাল 

share on:
চৌধুরী গোলাম আকবর

চৌধুরী গোলাম আকবর সত্যিকার অর্থে লোকসাহিত্যে ও তার গবেষণায় সম্পূর্ণভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ আবদুল কাইউম এর ভাষায়- ‘চৌধুরী গোলাম আকবর শুধু লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ছিলেন বললে ভুল হবে। কারণ, তিনি ছিলেন লোকসাহিত্য বিশারদ। তথা লোকবিজ্ঞানী’।

সাহিত্য জাতীয় জীবনের দর্পন ও সময়ের প্রতিচ্ছবি। যে জাতির সাহিত্য যত উন্নত সে জাতি তত উন্নত। কারণ সাহিত্যের সরস ও সাবলীল উপস্থাপনায় প্রস্ফুটিত হয় সামাজিক ক্রিয়া কলাপ। প্রত্যেক জাতীয় সাহিত্যের মূল উৎস হল সে জাতির লোকসাহিত্য। সাধারণ অর্থে মানবজীবনের চালচলন, ধ্যানধারনা, চিন্তা-চেতনা ও গবেষণার বাহ্যিক প্রতিফলনের নাম সাহিত্য।

কিন্তু গান গাঁথা, বারমাসি, পই, প্রবাদ, ছড়া ও কিংবদন্তী ইত্যাদি লোকসাহিত্যের উপাদান। লোক সাহিত্য গ্রামীণ মানুষের মুখে মুখে রচিত, স্মৃতির পাতায় সংরক্ষিত, লোক শ্রুতির মাধ্যমে এর প্রসার। তাই লোকসাহিত্যকে গণসাহিত্যও বলা হয়। লোকসাহিত্য স্মরনাতীতকালে রচিত হয়েও স্মৃতির পথ বেয়ে এ যুগের সাহিত্যকাননে স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। লোকসাহিত্য ইমারতের মূল কারিগর লোকসাহিত্যর সংগ্রাহক।

এদেশের সংগ্রাহকগণ নিজ উদ্যোগে যতটা সম্ভব লোক সাহিত্য সংগ্রহ করলেও ১৯৫৫ সালে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণাকর্মে ব্যাপক কর্মসূচী গৃহিত হয়। শুরু হয় নব উদ্যমে কার্যক্রম। প্রতি জেলায় নিয়োজিত হন সংগ্রাহক। বাংলার লোকসাহিত্য দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে পরিচিতি লাভের পথ খুঁজে পায়।

হাতে গুণা যে ক’জন মনিষীর কঠোর পরিশ্রমে বাংলাদেশের অবহেলিত লোকসাহিত্য বিশ্ব দরবারে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত হয় চৌধুরী গোলাম আকবর তাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলা সাহিত্যের এই প্রাণপুরুষ লোকসাহিত্যের প্রায় অস্তমিত সূর্যকে নবআঙ্গিকে পূণরায় উদিত করতে নিবিষ্ট চিত্তে কাজ করেছেন আজীবন।

এর ফলশ্রুতিতে বর্তমান সময়ের লেখক গবেষকগণ তাকে লোক বিজ্ঞানী বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সংস্কৃতি ডটকম

লোকসাহিত্য নামক মহাসাগরের নিবেদীত প্রাণ ডুবুরি চৌধুরী গোলাম আকবর ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯২১ সালে (১৮ ভাদ্র ১৩২৮ বঙ্গাব্দ) জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা ঈশা খাঁন মসনদে আলার কনিষ্ঠ পুত্র ভানুগাছ পরগণার প্রথম মোঘল শাসক দেওয়ান আদম খানের উত্তরপুরুষ গোলাম জিলানী চৌধুরী এবং মাতা হযরত সৈয়দ শাহ্ মোস্তফা (র) এর বংশধর সৈয়দা মাসতুরা ভানু।

শৈশবে পারিবারিক শিক্ষক মৌলভী আকবর আলীর কাছে গোলাম আকবরের লেখাপড়ার হাতেখড়ি। ১৯৩৬ সালে তিনি  মুন্সিবাজার কালী প্রসাদ এম.ই স্কুল (বর্তমান কালী প্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়) ষষ্ঠ শ্রেনীর বার্ষিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

১৯৩৬ সালেই তিনি আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্নের সান্নিধ্যে আসেন এবং লোকসাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। সাহিত্যরত্ন পেশায় শিক্ষক হলেও নেশায় ছিলেন লোকসাহিত্যের সংগ্রাহক ও বিশ্লেষক। তিনি সিলেট অঞ্চলে ব্যাক্তিগত উদ্দ্যোগে লোকসাহিত্য সংগ্রহের পথপ্রদর্শক ছিলেন।

দক্ষ কারিগরের হাতে পড়লে পিতল সোনা হয়ে ওঠে। আর পিতল না হয়ে সোনা পড়লে কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। চৌধুরী গোলাম আকবর যখন আশরাফ হোসেনের সান্নিধ্যে আসেন তখন তিনি কিশোর উত্তীর্ণ প্রাণবান যুবক। অভিজ্ঞ কারিগর চিনে নিতে ভূল করলেন না। কাঁচা সোনাকে মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরী করে নিলেন। আশরাফ হোসেনের স্বস্নেহ অভিভাবকত্বে কাটে তার প্রস্তুতি কাল। এ সাধারণ প্রস্তুতি নয়, সুদীর্ঘ ৪৫ বছরের ফুলে-ফলে ভরা কর্মময় জীবনের প্রস্তুতি।

১৯৪১ সালে গোলাম আকবর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও ধ্যানে জ্ঞানে তার লোকসাহিত্য বাসা বেঁধে থাকে।

গ্রামেগঞ্জে ঘুরে লোকসাহিত্যের বিচিত্র উপাদান তিনি সংগ্রহ করতে শুরু করেন। বৃহত্তর সিলেটের এমন কোন অঞ্চল নেই যেখানে গোলাম আকবর যাননি। সে সময় প্রত্যন্ত অঞ্জলে বাস বা জিপ তো দূরের কথা রিক্সাও চলতো না। গোলাম আকবর পায়ে হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল। যেখানেই লোকসাহিত্যের সন্ধান আছে বলে শুনেছেন সেখানেই তিনি ছুটে গেছেন। গাঁথা, গীতিকা, পই, প্রবাদ, বারোমাসি সংগ্রহ করে তিনি অনুসন্ধান বিশারদের যোগ্য দ্বায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৫৯ সালে গোলাম আকবর বাংলা একাডেমির অস্থায়ী সংগ্রাহক নিযুক্ত হন। আর এই নিযুক্তির দরুন তিনি নিজেকে লোককাননে নতুন রূপে আবিষ্কার করেন। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে বাংলা একাডেমির চাকরী ছেড়ে দেয়ার পরও তিনি লোকসাহিত্য সংগ্রহ করেছেন স্বউদ্যমে। তিনি তার সংগৃহীত ৩০ হাজার পৃষ্ঠা লোকসাহিত্য বাংলা একাডেমিতে জমা দেন। আর সংগ্রহ যে কতটা কষ্টসাধ্য তা শুধু ভুক্তভোগীরাই উপলব্ধি করতে পারেন।

সংগতি বা পৃষ্ঠপোষকতার দিকে ভ্রুক্ষোপ না করে চৌধুরী সাহেব সারাজীবন নিজের সাধ ও সাধ্যকে নিয়োজিত করেছিলেন লোকসাহিত্যের মহৎকর্মে। তিনি বাংলা একাডেমি নিয়োজিত এবং অনিয়োজিত উভয় প্রকারের সংগ্রাহক হিসাবে সংগ্রহ করে বাংলা একাডেমিতে জমা দিয়েছেন। তার সংগৃহীত দশটি গীতিকার সংকলন “সিলেট গীতিকা” প্রথম খন্ড বছিউজ্জামানের সম্পাদনায় ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি হতে প্রকাশিত লোকসাহিত্য সংকলন বিভিন্ন খন্ডে গোলাম আকবর কর্তৃক সংগৃহীত লোককাহিনী প্রকাশিত হয়েছে। যার পূর্ণ বর্ণনা এই স্বল্প পরিসরে দেয়া দুস্কর। আল হেলাল প্রণিত বাংলা একাডেমির ইতিহাস গ্রন্থে তার অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জনাব সাহিত্যভূষণ সিলেটের লোক কানন থেকে পই প্রবাদ, গাঁথা, গীতিকা, কেচ্ছা কাহিনীম বারমাসী সংগ্রহ করে বাংলা একাডেমিতে অনবরত জমা দেয়ার পরও প্রায় দশ হাজার পৃষ্ঠার অধিক পরিমান নিজের সংগ্রহে রেখেছিলেন। এগুলো সংগ্রহ করা এবং লিপিবদ্ধ করা কোন সহজ বিষয় নয়। আমরা যারা লিখন ও পঠনের জগতে আছি তারা কয়জন চল্লিশ হাজার পৃষ্ঠা পড়েছি বা লিখেছি, তা নিয়ে একটু ভবলেই বুঝা যায় গোলাম আকবর কতটা একনিষ্ট লেখক, গবেষক, সংগ্রাহক ছিলেন। তিনি লোকসাহিত্য সংগ্রহের পাশাপাশি পত্র পত্রিকায় লিখে চলেন প্রতিনিয়ত। তার রচিত প্রায় তিন শতাধিক প্রবন্ধ তখন প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি কবিতা, গান ও জীবনী লিখেছেন। আবার সমালোচনা লিখার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

লোকসাহিত্যের এই প্রবাদ পুরুষের জীবদ্দশায় মাত্র আটটি বই প্রকাশিত হয়েছিলো। সেগুলো হলো সিলেট গীতিকা প্রথম খন্ড, খোলাফায়ে রাশেদা বা চার খলিফা পুঁথি, সাধক কবি ভবানন্দ, সিলেট নাগরী পরিক্রমা, ইসলাম জোতি হযরত শাহজালাল (র:), রাধারমণ সংগীত, লোকসাহিত্যে ইসলাম ও লোকসাহিত্যের কথা। তার মৃত্যুর পর আরো ২৭টি অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি পাওয়া যায়। এর মধ্য থেকে জালালাবাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, আমার কবিতা, রাষ্ট্রভাষা একুশে প্রসঙ্গ এবং বুদ্ধুদ নামে একটি গানের পান্ডুলিপি প্রকাশিত হয়।

গোলাম আকবর সম্পাদনায় হাত ধরেননি কখনও। তবে সাপ্তাহিক সিলেট কন্ঠে নিয়মিত উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। সাংবাদিকতাও তাকে ছেড়ে যায়নি। সাপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকার সিলেট অঞ্চলের প্রতিনিধির দ্বায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন।

সাহিত্য জগতে পদার্পণের পর ক্রমান্বয়ে তিনি দেশব্যাপি পরিচিতি অর্জনে সক্ষম হন। এর ধারাবাহিকতায় রাজধানী সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে বিভিন্ন সামাজিক ও সাহিত্য সংগঠন থেকে সভা সেমিনার সিম্পোজিয়ামে তার ডাক আসতে থাকে। এর ফলে চষে বেড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল।

১৯৫২ সালে চৌধুরী গোলাম আকবর তার সাহিত্য সাধনার প্রথম স্বীকৃতি লাভ করেন। সে বছর  গৌড়বঙ্গ সাহিত্য পরিষদ (ঢাকা প্রতিষ্ঠা ১৯৩৪) তাকে ‘সাহিত্যভূষণ’ খেতাবে ভূষিত করে। একই বছর তিনি বহিরাগত শিক্ষার্থী হিসাবে পূর্ব-পাকিস্তান সেকেন্ডারী এডুকেশন বোর্ড থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরিক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। আবার ভাষার দাবিতে উত্তাল সেই সময়ে তিনি কলম সৈনিকের ভূমিকায় অবতির্ণ হন।  রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে আপোসহীন গোলাম আকবরের ১২টি প্রবন্ধ তখন প্রকাশিত হয়। এসব প্রবন্ধে তিনি উর্দূর পক্ষে অবস্থানকারী অনেক বুদ্ধিজীবির উপস্থাপিত যুক্তি খন্ডন করেছিলেন।

১৯৬০ সালে করাচি মুসলিম পরিষদ তার সাহিত্য সাধনার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে তাঁকে “অনুসন্ধান বিশারদ” খেতাবে ভূষিত করে।

জনাব সাহিত্যভূষণ ১৯৬৬ সালে আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ফোকলোর ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ানা ইউনিভারসিটি ও সোসাইটি ফর ফোকলোর আয়োজিত লোকসাহিত্য সম্পর্কিত প্রথম সাধারণ অধিবেশনে আমন্ত্রিত হন। ফোকলোর ইনস্টিটিউট এর এক্সিকিউটিব এসিসটেন্স মি: রবার্ট জে এডামস ১৭ জানুয়ারী ১৯৬৬ সালে তাকে পত্র মারফত আমন্ত্রন জানান।

২৬ মার্চ ১৯৭৭ সালে নিউয়র্কে অনুষ্ঠিত সাউথ এন্ড সাউথইষ্ট এশিয়ান ফোকলোর স্টাডিজ এর অধিবেশনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাংলাদেশে প্রতিনিধিত্ব করতে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে তিনি লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশের গৌরবদীপ্ত লোকসাহিত্যের স্বরূপ তুলে ধরেন। এবং বিশ্ব লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও সংরক্ষনের জন্য পাঁচটি যুগান্তকারী প্রস্তাবনা পেশ করেন। যা বিশ্ব লোকসাহিত্য প্রেমীদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ড: মিস ইনগে হেইঞ্জ তাঁর বক্তব্যে বলেন “মিস্টার চৌধুরীর প্রস্তাবনা গুলো বিনা বিবেচনায় গৃহীত হওয়ার যোগ্য এবং তার লোকসাহিত্যে ভূমিকার মূল্যায়ন সময় সাপেক্ষ”। জনাব চৌধুরী অধিবেশন শেষ করে দেশে ফেরা অবধি ভারত বাংলাদেশসহ বিদেশে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা তার পেশকৃত প্রস্তাবনা ও বক্তব্যের ভূয়সি প্রশংসায় মেতে ওঠে। উক্ত সাউথ এন্ড সাউথইস্ট এশিয়ান ফোকলোর স্টাডিজ এই অধিবেশনে গোলাম আকবরকে ‘ফোকলোর স্কলার’ হিসাবে ভূষিত করে।

ক্যালিফোর্ণিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত এশিয়ান ফোকলোর স্কলার হিসাবে যে ১৯৩ জন লোকসাহিত্য বিশারদের নাম অন্তর্ভূক্ত হয়, গোলাম আকবর তাদের মধ্যে অন্যতম। এই তালিকায় বাংলাদেশের আরো চারজন লোকসাহিত্যবিদের নাম তখন অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলো। তারা হলেন সিরাজ উদ্দিন কাশেমপুরী, অধ্যাপক মোহাম্মদ মনসুর উদ্দীন, অধ্যাপক আলী নেওয়াজ এবং আতোয়ার রহমান।

তখন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা দল আমাদের দেশের লোকসাহিত্য বিশেষ করে চৌধুরী সাহেবের অবদান সম্পর্কে সমীক্ষার জন্য বাংলাদেশে আসার প্রস্তাবনা দিয়েছিলো। এবং তখনকার সময়ে গোলাম আকবর সংগৃহীত পালাগান জাপানি ভাষায় অনুদিত হয়ে জাপান থেকে প্রকাশ হয়েছিলো। জাপানি অনুবাদকের সৌজন্যে বাংলা একাডেমির ফোকলোর বিভাগের মোঃ সাইদুর রহমান এর একটি কপি পেয়েছিলেন।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করার পর গোলাম আকবরকে সংবর্ধিত করে দেশের অনেক সাহিত্য ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া ১৯৭৮ সালে উড়িষ্যার রাজধানী কটকে অনুষ্ঠিত ইনস্টিটিউট অব উড়িষ্যান স্টাডিজ এন্ড ইন্টারন্যাশনাল ফোকলোর সম্মেলন, ১৯৮০ সালে উত্তর কোরিয়া ফোকলোর কনফারেন্স সহ ১৯৮১ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত 9th International Congress of Anthropological and Ethological Science এ আমন্ত্রিত হন।

পরবর্তীতে জাপান, জার্মান ও ভারত সহ বিভিন্ন সময়ে ৯ বার আন্তর্জাতিক ফোকলোর সম্মেলনে আমন্ত্রিত হন।

১৯৭৮-৭৯ অর্থ বছর থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার চৌধুরী গোলাম আকবরকে মাসিক দুশত টাকা হারে আজীবন সম্মাননা প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলো। তার মৃত্যু পর্যন্ত এই সম্মাননা ভাতা ৬০০ টাকায় উন্নিত হয়েছিলো। সিলেট লায়ন্স ক্লাব তাকে ১৯৮০ সাল থেকে আমৃত্যু মাসিক ১৫০ টাকা হারে সাহিত্য বৃত্তি প্রদান করেছিলো।

সিলেট একাডেমি ১৯৮২ সালের মে মাসে গোলাম আকবরকে ‘সৈয়দ সুলতান সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান করে। ০৫ আগষ্ট ১৯৮৮ সালে সিলেট লায়ন্স ক্লাব তাকে গুণীজন হিসাবে সংবর্ধনা ও লায়ন্স ক্লাব পদক প্রদান করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের হাত থেকে তার জেষ্ট্যপুত্র হারুন আকবর উক্ত পদক গ্রহণ করেন।

লোকসাহিত্যে অবদানের জন্য ০৫ ডিসেম্বর ১৯৯৪ সালে Bangladesh National Students Award [England] তাকে মরনোত্তর বিশেষ সম্মাননা পদক প্রদান করে।

গোলাম আকবর বাংলা একাডেমী, ইসলামী ফাউন্ডেশন, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, তমদ্দুন মজলিস এবং এশিয়ান ফোকলোর এসোসিয়েশনসহ অসংখ্য সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।

১৯৬৮ সালে চৌধুরী গোলাম আকবর  সিলেটের লোকসাহিত্য রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গঠন করেন জালালাবাদ লোকসাহিত্য পরিষদ। এ পর্যন্ত জালালাবাদ লোকসাহিত্য পরিষদ থেকে অর্ধশত এর বেশি লোকসাহিত্য বিষয়ক বই প্রকাশিত হয়েছে। এবং বেশ কিছু বই প্রকাশিতব্য আছে।

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে গোলাম আকবর আব্দুল জব্বার ওয়াকফ এষ্টট এর মালিক আব্দুল বারি সাহেবের কন্যা ফাতেমা বেগম চৌধুরীর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। ফাতেমা মুন্সিবাজার এলাকার দ্বিতীয় শিক্ষিতা মুসলমান মহিলা। সাহিত্য সাধনায় তিনি সাহিত্যভূষণের প্রেরণাদাত্রী ছিলেন। চৌধুরী গোলাম আকবর ও ফাতেমা বেগম চৌধুরীর শুভপরিণয় সুত্রে পৃথিবীতে আগমণ করেন তাদের চার ছেলে ও পাঁচ মেয়ে।

১৯৮৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার আধুনিক হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রকৃত অর্থে দেশের লোকসাহিত্য কাননে গোলাম আকবরের মতো ফুল আর কবে ফুটবে নাকি ফুটবেই না, তা এক নিমিষে বলা দুস্কর তবে দেশের লোকসাহিত্য অঙ্গণে গোলাম আকবরের মতো পাগলপাড়া সংগ্রাহকের বড় বেশি অভাব আজও পরিলক্ষিত হয়।

আরও পড়ুন : শেফালী ঘোষ : চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তি

Facebook Comments
চৌধুরী শামসুল আরেফীন

চৌধুরী শামসুল আরেফীন

চৌধুরী শামসুল আরেফীনের জন্ম মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রামপাশা গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য-সংস্কৃতি কার্যক্রমের সাথে জড়িত। বিভিন্ন পত্রিকায় তার লেখা প্রবন্ধ , কবিতা ও ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত কবিতার বই ‘রক্তকণিকা’।