দশকের সেরা চলচ্চিত্র : সার্টিফাইড কপি

share on:
দশকের সেরা চলচ্চিত্র : সার্টিফাইড কপি

দশকের সেরা চলচ্চিত্র ( ২০১০-২০২০) নিয়ে একশো সিনেমার তালিকায় সার্টিফাইড কপি চলচ্চিত্রটির অবস্থান তৃতীয়। তালিকাটি করেছে indiewire.com। এই তালিকাটি তারা তৈরি করেছে বিশ্বের সেরা চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতামতের ভিত্তিতে।

সার্টিফাইড কপি চলচ্চিত্রের গল্প একজন পুরুষ ও একজন নারীকে ঘিরে। জেমস মিলার একজন ইংলিশ লেখক, যিনি শিল্পের মৌলিকত্ব বিষয়ক তার নতুন বই সম্পর্কে আলোচনা করতে ইতালি এসেছেন। নারী চরিত্রটি যার নাম সিনেমার কোথাও ব্যবহার করা হয়নি, ফ্রেঞ্চ বংশদ্ভূত ইতালির একজন আর্ট গ্যালারির মালিক , যে লেখকের লেখা ও আলোচনায় বিমুগ্ধ।

নারীটি লেখককে তার গ্যালারিতে আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু লেখক এসে জানান যে তিনি বাইরে ঘুরে বেড়াতে চান। তখন নারীটি তাকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়। গাড়িতে যেতে যেতে তারা আলাপ করে কাজ, জীবন ও শিল্প আন্দোলন বিষয়ে। শুরুটা দেখতে খুবই আনন্দদায়ক মনে হয়। কিন্তু ক্রমান্বয়েই গল্প আগায় দুঃখবোধ ও অস্পস্টতার দিকে। নারী চরিত্রটিই চলচ্চিত্রে প্রধান। সে অবশ্যই শিল্প ও তার নান্দনিক সমঝদার।

কিন্তু যখন সে জেমসের সাথে শিল্প নিয়ে আলোচনা করে তখন সে শিল্পের তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের চেয়ে হৃদয় আকর্ষণ করার বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেয়। কথা বলতে বলতে একসময় তারা ১৫ বছর আগে এক বিবাহিত দম্পতির চরিত্রের মধ্যে অভিনয় করতে থাকে। তাদের দুজনের এই অভিনয় ক্রমান্বয়েই আপনাকে বিভ্রান্তে ফেলে দিবে, সত্যিই তারা বাস্তবে স্বামী স্ত্রী কিনা।

আধুনিক সিনেমার মাস্টার নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি মূলত তার দেশ ইরানের বাইরে শ্যুট করতে ইচ্ছুক নন। কিন্তু সার্টিফাইড কপি প্রথম চলচ্চিত্র যেটা তিনি ইতালিতে শ্যুট করেছেন। ফলে এই প্রথম সিনেমা যাতে তিনি খুব ঘনিষ্ঠভাবে একজন পুরুষ ও নারীর সম্পর্ক দেখাতে পেরেছেন। ফলে এই সিনেমা হয়ে উঠেছে একই সাথে রহস্যময়, আপাত বৈপরিত এবং নিশ্চিতভাবে একজন ইরানের চলচ্চিত্র নির্মাতার ক্ষেত্রে উচ্চাকাংখী, হয়তোবা মুক্ত ভাবনার ইরানের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য একটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র।

১৯৭৯ সালের যুগ পরির্বতনকারী ইরানি বিপ্লবের পর যে সকল সফল চলচ্চিত্রকার ইরানে থেকে গিয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম আব্বাস কিয়ারোস্তামি। বিপ্লব-পরবর্তীকালে কিছুসংখ্যক নির্মাতা পশ্চিমা দেশগুলোতে চলে যান। কিন্তু আব্বাস বিশ্বাস করেন দেশে থাকাটাই তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ভালো সিদ্ধান্ত ছিল। তিনি নিজেই বলেছেন, ইরানে থেকে নিজের জাতীয় পরিচয় ও সত্তা আঁকড়ে থাকার কারণে তাঁর চলচ্চিত্র জীবন মহিমান্বিত হয়েছে।

‘মূলোৎপাটিত করে একটি গাছকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেলে সে আর ফল দেবে না। অন্তত আপন স্থানে সে যত ভালো ফল দিত নতুন স্থানে তত ভালো ফল দেবে না। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। আমি মনে করি দেশ ছেড়ে গেলে আমার অবস্থা হতো সেই গাছের মতো।’

এই সিনেমার প্রধান শক্তি – সিনেমাটির অসাধারণ স্ক্রিপ্ট এবং হৃদয়ঘনিষ্ঠ-উত্তেজনাপূর্ণ সংলাপ। পুরোটা সিনেমা তৈরি করা হয়েছে এমন এক ভঙ্গিতে যা আবেগকে ছুয়ে যায়। সার্টিফাইড কপি বোধহয় আব্বাস কিয়ারোস্তামির সবচেয়ে সহজ সিনেমা। আব্বাস কিয়ারোস্তামি চান তার সিনেমা দেখে দর্শক চিন্তা করবে, চলচ্চিত্রে প্রবেশ করবে। বেশিরভাগ সময়েই তিনি অপেশাদার অভিনেতা অভিনেত্রী ব্যবহার করেন। এই সিনেমাটা কিছুটা ব্যতিক্রম এ দুই দিক দিয়েই।

সার্টিফাইড কপি সিনেমা মূল সময়, মানুষ, সম্পর্ক ও অনুভূতি সম্পর্কে আমরা সাধারণ যে ধারণা প্রকাশ করি তার কোনটা আসলে সত্যি আর কোনটা আসলে মেকি তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সিনেমাটি মূলত কিছু স্বপ্নের , কিছুটা ভালোবাসা ও সত্যের সমন্বয়ে তৈরি রোমান্টিক কমেডি সিনেমা।

ষাটের দশক থেকে ইরানের চলচ্চিত্রাঙ্গণে শুরু হওয়া ইরানী নবতরঙ্গ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ আব্বাস কিয়ারোস্তামি। এই আন্দোলনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ফারুগ ফারোখ্‌জদ, সোহরাব শহিদ সলেস, মোহসেন মাখমালবফ, বহরম বেইজাই এবং পারভেজ কিমিয়ভি। তাদের নির্মাণ কৌশলে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেমন কাব্যিক চিত্রনাট্য, রূপক গল্প, রাজনৈতিক এবং দার্শনিক চিন্তাধারার প্রতিফলন।

আব্বাস কিয়ারোস্তামি ৪০ টির বেশি সিনেমা নির্মাণ করেছেন । কিয়ারোস্তামি নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো- ক্লোজআপ (১৯৯০), থ্রৌ দ্য অলিভ ট্রিজ (১৯৯৫), টেস্ট অব চেরি (১৯৯৭), দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস (১৯৯৯), এবিসি আফ্রিকা (২০০১), টিকেটস (২০০৫), চাকান অন সিনেমা (২০০৭) প্রভৃতি। ‘ফাইভ’ (২০০৩) আব্বাস নির্মিত খুবই বিখ্যাত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ১৯৯৭ সালে ‘টেস্ট অব চেরি’ সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার পাম ডি ওর জিতে নেয়।  ‘দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস’ ১৯৯৯ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার গোল্ডেন লায়ন জয় করে।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : দশকের সেরা চলচ্চিত্র : আন্ডার দা স্কিন

দশকের সেরা চলচ্চিত্র সিরিজের সব লেখা।

Facebook Comments
পার্থিব রাশেদ

পার্থিব রাশেদ

সম্পাদক ও প্রকাশক, সংস্কৃতি ডটকম। পার্থিব রাশেদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রকাশিত বই - তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য, তিতাস একটি নদীর নাম : চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ( সহ সম্পাদনা)।