বুদ্ধদেব বসু : বাংলা সাহিত্যের ‘পঞ্চ পাণ্ডব’

share on:
বুদ্ধদেব বসু

বুদ্ধদেব বসু বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, গল্পকার, অনুবাদক, সম্পাদক ও সমালোচক।  তিনি বিশ ও ত্রিশের দশকে আধুনিক কাব্যরীতিতে অবদান রাখা কবিদের মধ্যে অন্যতম। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত ‘পঞ্চ পাণ্ডব’ এবং কল্লোল যুগের তরুণতম প্রতিনিধি তিনি।

রবীন্দ্র প্রভাবের বাইরে গিয়ে তিরিশের দশকে যে পাঁচজন কবি আধুনিক বাংলা কবিতা সৃষ্টি করেছিলেন তাদেরকে বাংলা সাহিত্যে পঞ্চ পান্ডব বলা হয় । তারা হলেন- অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাস, বিষ্ণু দে ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত।

 ধারণা করা যায়, বুদ্ধদেবের কবিতায় গতি ছিল, কিন্তু নিবিড় অগ্রগতি ছিল না; নিজেকে, আপন রচনাভঙ্গিকে অতিক্রম না করে হয়তো কেবল প্রতিভাবান বালকের মতো নির্বিবাদে লিখে গেছেন প্রায় সিকিশতাব্দীকাল। তিনি হয়তো অনুভবপ্রাবল্যে এবং একরকম অসচেতনতায় অভিযানের বদলে যাত্রাকেই আত্মস্থ করেছিলেন !

অবশ্য তাঁর অনুশীলন ও অভিনিবেশ বিষয়ে আমাদের কোনো সংশয় নেই; অভিযোগ নেই বুদ্ধদেবের শিথিলতাহীন অনলস শিল্প-অন্বেষার প্রতি। তবে একথা ঠিক যে, মনস্তত্ত্ব কিংবা দর্শনে বসুর গভীর আগ্রহ ছিল না, যেমনটি ছিল রবীন্দ্রনাথের বা জীবনানন্দের। সেকারণেই কি সময়ের প্রবাহে সাধারণের চেতনায় ও অনুকরণ-অনুসরণের জায়গাগুলো থেকে দিনে দিনে দূরে সরে যাচ্ছেন তিনি?

বাঙালির চিরচেনা মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান ও বাসিন্দা ছিলেন বুদ্ধদেব বসু। বাঙালি সংস্কৃতির আচারে আস্থাশীল এই শিল্পী সামাজিক সম্পর্ক-বন্ধন বা সংস্কৃতির বস্তুগত ভিত পরিবর্তনের দিকে কোনো ঝোঁক অনুভব করেননি। ধারণা বা নীতি প্রচারেও তেমন আগ্রহী হতে দেখা যায়নি। পৃথিবীব্যাপী প্রবল ভাঙাগড়ার কালে সমূহ বিনাশের পরিপ্রেক্ষিতে কালিক প্রবণতার চিহ্ন ধারণ করে বেড়ে উঠছিলেন তিনি; হয়ে উঠছিলেন সমকালের নাগরিক মধ্যবিত্তমানসের বিশ্বাসচ্যুত-বিচ্ছিন্ন পাটাতনে আমিত্বের একক ক্যানভাস। দুই মহাযুদ্ধের মধ্যকালীন বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে তাঁর সাহিত্যসাধনায় খুব স্বাভাবিকভাবেই মূল্যবোধ, অবক্ষয়, শ্রেণীচেতনা এবং মধ্যবিত্তসুলভ সংকোচ প্রভৃতি প্রবেশ করেছে। আর তখন তিনি সাহিত্যের মূল্য এবং সাহিত্যের প্রতি পাঠক ও ভোক্তার অনুরাগ সৃষ্টির ব্যাপারে বেশি সতর্ক হয়ে পড়েছিলেন। অন্যভাবে বললে এ রকম দাঁড়ায়– বাঙালি পাঠকের সাহিত্যরুচি তৈরিতে বুদ্ধদেব বসু বিশেষভাবে অবদান রেখেছেন। সমকালীন রাজনীতিতে যখন সাহিত্যিকদের অনেকেই সক্রিয়ভাবে চিন্তা বিনিয়োগ করেছেন, তখন বুদ্ধদেব রাজনীতির চেয়ে বিশুদ্ধ সাহিত্য-শিল্প চর্চার দিকে মনোযোগী ছিলেন। যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার কবলে চতুর্দিকে তিনি অবলোকন করেছেন গোলযোগ, দুর্যোগ তাঁর ঘরের দুয়ারে হানা দিয়েছে, দেখেছেন প্রশান্তি-অন্বেষার ব্যাকুলতা। তবে একথা সত্যি যে, সবকিছুর ভেতরে কিংবা অন্তরালে বুদ্ধদেব বসু ক্রমাগত বুদ্ধদেব বসুই হয়ে উঠেছেন।

বুদ্ধদেব বসু ১৯০৮ সালের ৩০ নভেম্বর কুমিল্লায় জম্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস বিক্রমপুরের মালখানগর গ্রামে। বাবা ভূদেব বসু ছিলেন ঢাকা বারের উকিল। বুদ্ধদেবের জন্মের একদিনের মধ্যে ধনুষ্টঙ্কার রোগে মা বিনয়কুমারী মারা যান। এতে শোকাভিভূত ভূদেব সন্ন্যাসব্রত নিয়ে গৃহ ত্যাগ করেন। মাতামহ-মাতামহীর কাছে প্রতিপালিত হন বুদ্ধদেব। তার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের প্রথমভাগ কাটে কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং ঢাকায়।

১৯২৫ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। ১৯২৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমানে ঢাকা কলেজ) থেকে প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আইএ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে ১৯৩০ সালে প্রথম শ্রেণীতে স্নাতক এবং ১৯৩১ সালে প্রথম শ্রেণীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। স্নাতক শ্রেণীতে তার প্রাপ্ত নম্বরের রেকর্ড এখনও কেউ ভাঙতে পারেনি।

১৯৩১ সালে তিনি স্থায়ীভাবে কলকাতা চলে যান। ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কলকাতা রিপন কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত স্টেটসম্যান পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। ১৯৫২ সালে দিল্লি ও মহিশূরে ইউনেস্কোর প্রকল্পে উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গের পেনসিলভেনিয়া কলেজ ফর উইমেনে শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। এ ছাড়া আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে বক্তৃতা দেন।

অল্প বয়স থেকেই তিনি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন। ঢাকার পুরানা পল্টন থেকে তার ও অজিত দত্তের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সচিত্র মাসিক ‘প্রগতি’ (১৯২৭-১৯২৯)। এ সময় কলকাতার ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। কলকাতায় ১৯৩৫ সাল থেকে ত্রৈমাসিক ‘কবিতা’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিন বছর তার সঙ্গে সম্পাদনায় ছিলেন কবি সমর সেন। ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে পত্রিকাটির ১০৪টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি আধুনিক বাংলা কাব্যান্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। ১৯৩৮ সালে হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ত্রৈমাসিক চতুরঙ্গ সম্পাদনা করেন। ১৯৪২ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ আন্দোলনে যোগদান করেন।

রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক কাব্য ধারার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। অল্প বয়সেই কবিতা লেখার সূচনা। নোয়াখালী থাকাকালে একটি নাটকের দলও করেন। তার লেখায় নানা ধরনের নিরীক্ষা চলমান ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধ্রুপদী সাহিত্যের উপমাকে নিজের লেখায় প্রয়োগ করেন। একইসঙ্গে গীতিময়তা ও স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর বিশেষ জোর দেন। ফলে তার রচনায় মানবিক মুহূর্তগুলো বিশেষ মাত্রা লাভ করে। সৃজনশীল সাহিত্যের সঙ্গে সমালোচনামূলক সাহিত্যে তার সাফল্য সমপর্যায়ের। তিনি বাংলা গদ্যরীতিতে ইংরেজি বাক্য গঠনের ভঙ্গিকে পরিচিত করেন। এ ছাড়া ইংরেজিতে লেখা তার গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত হয়।

কলকাতায় তার বাড়ির নাম ছিল কবিতাভবন- যা হয়ে উঠেছিল আধুনিক বাংলা সাহিত্যের তীর্থস্থান। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, সমালোচনা, নাটক, কাব্যনাটক, অনুবাদ, সম্পাদনা, স্মৃতিকথা, ভ্রমণ, শিশুসাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে বসুর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৫৬টি। এর মধ্যে রয়েছে, কবিতা : মর্মবাণী (১৯২৫), বন্দীর বন্দনা (১৯৩০), পৃথিবীর পথে (১৯৩৩), কঙ্কাবতী (১৯৩৭), দময়ন্তী (১৯৪৩), দ্রৌপদীর শাড়ি (১৯৪৮), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৩), শীতের প্রার্থনা : বসন্তের উত্তর (১৯৫৫), যে আঁধার আলোর অধিক (১৯৫৮), দময়ন্তী : দ্রৌপদীর শাড়ি ও অন্যান্য কবিতা (১৯৬৩), মরচেপড়া পেরেকের গান (১৯৬৬), একদিন : চিরদিন (১৯৭১) এবং স্বাগত বিদায় (১৯৭১)। উপন্যাস : সাড়া (১৯৩০), সানন্দা (১৯৩৩), লাল মেঘ (১৯৩৪), পরিক্রমা (১৯৩৮), কালো হাওয়া (১৯৪২), তিথিডোর (১৯৪৯), নির্জন স্বাক্ষর (১৯৫১), মৌলিনাথ (১৯৫২), নীলাঞ্জনের খাতা (১৯৬০), পাতাল থেকে আলাপ (১৯৬৭), রাতভর বৃষ্টি (১৯৬৭), গোলাপ কেন কালো (১৯৬৮), বিপন্ন বিস্ময় (১৯৬৯) এবং রুকমি (১৯৭২)। গল্প : অভিনয়, অভিনয় নয় (১৯৩০), রেখাচিত্র (১৯৩১), হাওয়া বদল (১৯৪৩), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৩৫৯), একটি জীবন ও কয়েকটি মৃত্যু (১৯৬০), হৃদয়ের জাগরণ (১৩৬৮), ভালো আমার ভেলা (১৯৬৩), প্রেমপত্র (১৯৭২)। প্রবন্ধ : হঠাৎ আলোর ঝলকানি (১৯৩৫), কালের পুতুল (১৯৪৬), সাহিত্যচর্চা (১৩৬১), রবীন্দ্রনাথ : কথাসাহিত্য (১৯৫৫), স্বদেশ ও সংস্কৃতি (১৯৫৭), সঙ্গ নিঃসঙ্গতা ও রবীন্দ্রনাথ (১৯৬৩), প্রবন্ধ সংকলন (১৯৬৬) এবং কবি রবীন্দ্রনাথ (১৯৬৬)। নাটক : মায়া-মালঞ্চ (১৯৪৪), তপস্বী ও তরঙ্গিণী (১৯৬৬) এবং কলকাতার ইলেক্ট্রা ও সত্যসন্ধ (১৯৬৮)। অনুবাদ : কালিদাসের মেঘদূত (১৯৫৭), বোদলেয়ার: তাঁর কবিতা (১৯৭০), হেল্ডালিনের কবিতা (১৯৬৭) এবং রাইনের মারিয়া রিলকের কবিতা (১৯৭০)। ভ্রমণ কাহিনী : সব পেয়েছির দেশে (১৯৪১), জাপানী জার্নাল (১৯৬২) এবং দেশান্তর (১৯৬৬)। স্মৃতিকথা : আমার ছেলেবেলা (১৯৭৩) এবং আমার যৌবন (১৯৭৬)। সম্পাদনা : আধুনিক বাংলা কবিতা (১৯৬৩)।

তিনি অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য হল- পদ্মভূষণ উপাধি (১৯৭০), সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (১৯৬৭) এবং রবীন্দ্র পুরস্কার (মরণোত্তর, ১৯৭৪)।

১৯৩৪ সালে খ্যাতিমান লেখিকা প্রতিভা বসুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রতিভা বসু বিয়ের আগে প্রতিভা সোম নামে পরিচিত ছিলেন। বুদ্ধদেব বসু ১৯৭৪ সালের ১৮ মার্চ কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : জীবনানন্দ দাশ : বাংলা ভাষার শুদ্ধতম কবি।

Facebook Comments