বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলা : স্বাধীনতার আগে ও পরে

share on:
বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলা

বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলা – যার বয়স মাত্র ৬৬ বছর, তার মধ্যে স্বাধীনতার পূর্বকালের ২২ বছর এবং স্বাধীনতা উত্তর ৪৪ বছর। ১৯৪৮ সনে ঢাকায় প্রথম চারুকলা ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আধুনিক চিত্রকালার যাত্রা শুরু হয়েছিল।

এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন জয়নুল আবেদিন, তখন এক তরুণ খ্যাতিমান শিল্পী। একটি ধর্ম-ভিত্তিক নব্য স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজে একটি চারুকলা ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠা রীতিমত বিপ্লবাত্মক ঘটনা। জয়নুল আবেদিন ও তাঁর সহযোগীদের অদম্য উৎসাহ তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব করেছিল। একাজে তাঁদের সহায়তা করেছিলেন বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ডঃ মুহম্মদ খুদরতে খুদা, আমলা সলিমুল্লাহ ফাহমী প্রমুখ উদারমনা মানুষ। চারুকলা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার অল্পদিনের মধ্যেই আবার কামরুল হাসানের উদ্যোগে ও জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে সরকারি পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমের সমান্তরাল এক আন্দোলন শুরু করেন ঢাকা আর্ট গ্রুপ নামে সংগঠনের মাধ্যমে। এবার তারা সম্পৃক্ত করেন ঢাকার বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক তথা প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের। এর শুরু ১৯৪৯ সনে। সরকারিভাবে চারুকলার শিক্ষা কার্যক্রম ও বেসরকারিভাবে শিল্প গোষ্ঠী সংগঠন- এরকম যুগপৎ যাত্রার মধ্য দিয়ে বস্তুত চারুকলা চর্চা একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবেই অগ্রসর হতে থাকে। ব্যপারটিই অভূতপূর্ব।

প্রথম থেকেই এদেশে চারুকলা আন্দোলন খুবই উদার ও প্রগতিশীল চেতনা নিয়ে এগতে থাকে, ফলে চারুকলা ইন্সটিটিউটের পাঠক্রম ও শিক্ষাদান পদ্ধতি কলকাতা আর্ট কলেজের আদলে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকার চারুকলা চর্চা তুলনামূলকভাবে আধুনিক ধারায় প্রবাহিত হতে শুরু করে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চারুকলা ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা জয়নুল আবেদিনের লন্ডনের বিখ্যাত স্কুল অব আর্টে এক বছরের (১৯৫১-১৯৫২) শিল্পচর্চা, ও ইউরোপের বিভিন্ন শিল্প কেন্দ্রসমূহ ভ্রমণ ও তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ও শিল্পীদের সাথে ভাব বিনিময়ের অভিজ্ঞতা। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল মধ্য পঞ্চাশের মধ্যেই ইউরোপে শিল্পে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে ঢাকার চারুকলার প্রথম ব্যাচের ছাত্র আমিনুল ইসলাম (১৯৫৬), হামিদুর রাহমান (১৯৫৬) ও নভেরা আহমদের (১৯৫৬) ঢাকায় প্রত্যাবর্তন। এরপর খুব কাছাকাছি সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে একে একে ফিরে আসেন আব্দুর রাজ্জাক (১৯৫৭), সৈয়দ জাহাঙ্গীর (১৯৫৭), রশীদ চৌধুরী (১৯৫৮), মুর্তজা বশীর (১৯৫৮) ও প্রবীণ শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদ (১৯৫৯)।

বাংলাদেশের চিত্রকলা পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি পর্বে এসেই আধুনিক আঙ্গিক পেতে থাকে, অর্থাৎ বাস্তববাদী বা রূপান্তর-ধর্মী আঙ্গিক থেকে মানব অবয়বের স্টাইলাইজড উপস্থাপনা ও নিসর্গদৃশ্যের সহজীকৃত রূপায়ণ কিংবা লোকজ শিল্প ফর্মের সংগে আধুনিক আঙ্গিকের সংমিশ্রণ, এধরনের নিরীক্ষাধর্মী কাজ এ সময়ের মধ্যেই দেখা গেছে। নেতৃত্বে ছিলেন জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, আনোয়ারুল হক ও সফিউদ্দিন আহমেদ। এরা সবাই তখন দেশীয় বা বঙ্গীয় চিত্রকলা আঙ্গিককে আধুনিকায়ন করতে প্রয়াসী ছিলেন। অন্যদিকে, পঞ্চাশ দশকের দ্বিতীয়ার্ধের ইউরোপ প্রত্যাগত আমিনুল ইসলাম, হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমদ ইউরোপের শিল্প-আঙ্গিক নির্ভর নতুন আঙ্গিক উপস্থাপন করেন। আমিনুল কিউবিজমের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ১৯৫৭ সনে আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফেরেন রাজ্জাক ও সৈয়দ জাহাঙ্গীর। তারপর ইউরোপ থেকে ফেরেন রশীদ চৌধুরী ও মুর্তাজা বশীর। রশীদ চৌধুরী ছিলেন সুররিয়ালিজম ধারা প্রভাবিত, বশীর মূলত আমিনুলের মত কিউবিজম ভক্ত। রাজ্জাক অবশ্য সম-বাস্তবতাবাদী অবয়বী আঙ্গিকে সমর্পিত ছিলেন, আর জাহাঙ্গীর নিসর্গ নির্ভর সম-বিমূত ধারায়। এদের সবার শিক্ষক সফিউদ্দিন আহমেদ বিলেতে গিয়েছিলেন তাদের পরে, ‘৫৬’র দিকে, ফিরে আসেন দশকের শেষে, ’৫৯ সনে। নিসর্গ, জল ও জীবন নির্ভর আধাবিমূর্ত, কিছুটা জ্যামিতিক ডিজাইন ভিত্তিক, অসাধারণ এক শিল্প আঙ্গিক নিয়ে ফেরেন সফিউদ্দিন। মোহাম্মদ কিবরিয়া, দেশেই অবস্থান করে একই সময়ে, অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকে পরিচিতি পান অত্যন্ত মননশীল একজন শিল্পী হিসেবে যার কাজে নিসর্গ, জীবন ও মনস্তত্ত্বের বিষ্ময়কর সমন্বিত আঙ্গিক নির্মিত হয়েছিল। পরে জাপানে বছর তিনেক (১৯৫৯-৬২) উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে যখন দেশে ফেরেন, তখন তিনি আর সেই পঞ্চাশের অবয়ব ও নিসর্গ নির্ভর সম-বাস্তববাদী শিল্পী নন, পুরোপুরি বিমূর্ত প্রকাশবাদী শিল্পী। তেল রং ও ছাপাই চিত্র উভয় মাধ্যমে অসাধারণ অভিব্যক্তি প্রকাশ দক্ষ এক শিল্পী। জীবনের পরবর্তী পাঁচ দশক তাঁর শিল্প আঙ্গিকে তিনি মোটামুটি একই ধারা অব্যাহত রেখেছেন, কিন্তু পাশ্চাত্য শিল্পের এই ধারার মধ্যেই নানা মুন্সিয়ানা এনেছেন। সরাসরি জীবন ভিত্তিক ছবি আঁকতে তিনি ততটা উৎসাহী হননি, যতটা হয়েছেন জীবন ও নিসর্গের মূল সত্যকে আত্মস্থ করে শৈল্পিক রূপায়ণে।

সংক্ষেপে বলা যায় পঞ্চাশের দশকের বাংলাদেশের চিত্রকলার মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল একাধিক- যথা, (ক) প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের অর্থাৎ জয়নুল, কামরুলদের বঙ্গীয় বা লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর আধুনিক আঙ্গিকের চিত্রকলা, (খ) জীবন ও নিসর্গ নির্ভর সম-বাস্তববাদী চিত্রকলা, (গ) ইউরোপীয় সমকালীন, অর্থাৎ কিউবিজম, সুররিয়ালিজম, আঙ্গিক অনুসারী আধুনিক সম-বিমূর্ত চিত্রকলা ও (ঘ) বিশুদ্ধ বিমূর্ততা।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলাদেশের চারুশিল্পের মাধ্যম বৈশিষ্ট্যে দেখা গেছে চিত্রকলা বা পেইন্টিং ও ছাপাই চিত্রের পাশাপাশি ভাস্কর্যের চর্চা শুরু হতে। পঞ্চাশের দশকে অবশ্য ভাস্কর্য চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক কোন ব্যবস্থা ছিল না, এক্ষেত্রে প্রতিভাবান শিল্পী নভেরা আহমেদ এককভাবে ভাস্কর্য চর্চা করেছেন। ষাটের দশকের প্রথম দিকে চারুকলা ইন্সটিটিউটে আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে ভাস্কর্য চর্চা শুরু হয়। পাশাপাশি সিরামিক ও বুনন শিল্পচর্চারও সূচনা হয়।

পাকিস্তান পর্বে চিত্রশিল্পের বিষয় বা বক্তব্য ছিল প্রধানত অরাজনৈতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ। এমনকি ভাষা আন্দোলনের শৈল্পিক প্রতিক্রিয়া কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বাইরে খুব একটা দেখা যায়নি। ’৬৫ পরবর্তী শেখ মুজিবর রহমানের ৬ দফা দাবি ও ‘৬৯ এর গণ আন্দোলনের একধরনের ফলশ্রুতি জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে আয়োজিত ‘নবান্ন’ চিত্র প্রদর্শনী ও ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ শ্লোগানের সমধর্মী সাহসী শিল্পকর্ম ৬৪ ফুট দীর্ঘ স্ক্রল চিত্র। ’৭০ এর উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস প্রভাবিত ৩০ ফুট দীর্ঘ স্ক্রলটিকেও রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়, মানবিক বক্তব্য তো অবশই। জয়নুলের ‘৪৩- এর দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার যেমনভাবে মানবিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ ছিল মনপুরা ’৭০’- এরও সেরকম। দুর্যোগকে কেন্দ্র করেই এক আঙ্গিকে জয়নুল এঁকেছিলেন দুঃস্থ মানবতার ত্রাণকর্তা হিসেবে বিপ্লবী জননেতা মওলানা ভাসানীর ছবি। বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলায় কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সরাসরি উপস্থাপনা জয়নুলের হাতেই প্রথম।

প্রবীণ শিল্পী জয়নুল যেভাবে পাকিস্তান আমলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ ছবি এঁকেছেন স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে শিল্প আঙ্গিকের বিচারে বিদ্রোহী বা ‘রাগী তরুণরা’ কিন্তু সেভাবে বক্তব্যের দিক থেকে খুব একটা বিদ্রোহী বা বিপ্লবী ছিলেন না । কিছুটা ব্যতিক্রম ছিলেন অবশ্য রশিদ চৌধুরী।

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিপ্লবী তরুণ শিল্পীদের আবির্ভাব হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে। সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এমন একজন শিল্পী শাহাবুদ্দিন স্বাধীনতা উত্তর সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে তার সৃজনশীল শিল্পকর্মের প্রধান, এমনকি বলা যায় পৌনপুনিক বিষয় করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রবীণ শিল্পী কামরুল হাসান ‘এই সব জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ শিরোনামের অসাধারণ পোস্টার করেছেন, নিতুন কুন্ডু এবং অন্যান্য তরুণ শিল্পীরাও শিল্পকর্মে ব্যাপৃত থেকেছেন। স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন সময়ে জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দিন, সুলতান, আমিনুল, কাইয়ুম চৌধুরী, রশীদ চৌধুরী, মুতর্জা বশীর, আবদুর রাজ্জাক ও আবু তাহের থেকে শুরু করে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ছবি এঁকেছেন। ভাস্কর্যে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার শৈল্পিক রূপায়ণে বিশিষ্টতা পেয়েছে। আবদুর রাজ্জাকের জয়দেবপুরের চৌরাস্তায় স্থাপিত উচ্চমাপের ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’, আব্দুল্লাহ খালেদের ‘অপরাজেয় বাংলা’ নিতুন কুন্ডুর ‘সাবাস বাংলাদেশ’, মুর্তজা বশীরের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য, হামিদুজ্জামানের ‘সংসপ্তক’, শামীম সিকদারের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’ অথবা তরুণ শ্যামল চৌধুরীর ‘স্বাধীনতা’, রাসার ‘একাত্তরের গণহত্যা’, সবই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারী শিল্পকর্ম।

স্বাধীনতা-উত্তর প্রবীণ শিল্পীদের মধ্যে বিষ্ময় বলতেই হয় এস এম সুলতানকে। প্রায় দুই যুগ বিস্মৃত ও অনালোচিত থাকার পর মধ্য সত্তরে তিনি সরবে উপস্থিত হন এবং পরবর্তী দু’দশক দাপটের সাথে শিল্পমঞ্চের নায়কের মতো বিচরণ করেন। মানব জীবন, বিশেষ করে চাষী, জেলে, শ্রমিকের সংগ্রামী জীবন, মুক্তিযুদ্ধও যার অনুসঙ্গ, এসবের ওপর ভিত্তি করেই তিনি তার বিশাল বিশাল ক্যানভাস সাজিয়েছেন। অবয়ব-নির্ভরই সব ছবি, আঙ্গিকে ইউরোপীয় রেনেসাঁ ধারার সাথে তার নিজস্ব সহজিয়া ঢং সংযোজন করে অভিনবত্ব দিয়েছেন। প্রাণস্পর্শী শিল্পকর্ম উপহার দিয়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছেন। অন্যদিকে তাঁর ছবির সামাজিক-রাজনৈতিক তাৎপর্য বিদগ্ধ সমজদারদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কাইয়ুম চৌধুরী পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বিশিষ্ট শিল্পী ছিলেন, স্বাধীনতা উত্তর সময়ে আরো বেশি রাজনীতি সচেতন, সমাজ সচেতন ও প্রকৃতি সচেতন হওয়ার কারণে এবং অবশ্যই আঙ্গিকে উৎকর্ষতার জন্য অন্যতম নমস্য শিল্পী হিসেবে সমাদৃত হয়েছেন।

স্বাধীনতা উত্তর সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তরুণ শিল্পীদের অনেককেই বক্তব্য প্রধান শিল্পী হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। সামাজিক অস্থিরতা, নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের অনৈতিকতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতি এসব তরুণদের কাজের বিষয়বস্তু। উপস্থাপনার ভঙ্গি বা আঙ্গিক নতুন। নানা ভাবে মানব-অবয়ব বিকৃত করে দেখানো হয়েছে। পরাবাস্তব উপস্থাপনা, রং ব্যবহারও উচ্চকিত ও অস্বাভাবিক। ব্যঙ্গাত্মক ও কার্টুনধর্মী ছবিও পরিপূর্ণ পেইন্টিং। মূলত উত্তর আধুনিক চেতনা কাজ করেছে এসব শিল্পীদের কাজে।

স্বাধীনতা উত্তর সময়ে সমাজে নারীর অবস্থান বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে, অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মহিলা শিল্পীদের হাতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্বাধীনতা পরবর্তী শিল্পচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি বেশ বড় সংখ্যায় মহিলা শিল্পীদের উত্থান। এদের অনেকেই নিশ্চিতভাবে আন্তর্জাতিক মানের শিল্পী। স্বাধীনতা বাংলাদেশের নারী সমাজকে নিঃসন্দেহে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, একথা চিত্রশিল্পীদের বেলায় বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

স্বাধীনতা উত্তর চিত্রকলা পূর্বেকার বিমূর্ত ধারাকে যেমন অনুসরণ করেছে, পাশাপাশি আধা-বিমূর্ত ধারা বা অবয়বধর্মী আঙ্গিক, পরাবাস্তববাদী আঙ্গিক ও উত্তর-আধুনিক আঙ্গিক, অর্থাৎ যেখানে তেমন কোন ধরাবাঁধা প্রথাগত নিয়ম মানার প্রযোজন আছে বলে মনে করা হয় না, সে সব নতুন আঙ্গিক গুরুত্ব পাচ্ছে। শিল্পকলায় সব সময়েই অভিনবত্বের গুরুত্ব থাকে, তবে শিল্পের আবার দর্শক যোগাযোগও প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সময়ে শিল্পকলায় ক্যানভাস মাধ্যমকে আগের মতো গুরুত্ব দেওয়া হয় না, বরং নানা রকমের স্থাপনা বা ‘ইনস্টলেশন’ কিংবা ‘নির্মাণ’ বা ‘কন্সট্রাকশন’কে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাছাড়া মিশ্র মাধ্যমকেও যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হচ্ছে। সমকালীন শিল্পকলায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও সমাদৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর শিল্পকর্মে এসব নতুন নতুন মাধ্যম ও প্রযুক্তির অনুশীলন উল্লেখযোগ্য।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১৯৬৯ সনে তাঁর ‘নবান্ন’ স্ক্রলের মাধ্যমে ক্যানভাস শিল্প থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, আর স্বাধীনতার পর কালিদাস কর্মকার, হামিদুজ্জামান খান প্রমুখ তখনকার নবীন শিল্পীরা সাহস দেখালেন নানা রকম স্থাপনা শিল্পকর্ম দিয়ে। অলক রায়ের পোড়ামাটির ভাস্কর্য একটি ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমকে নবধারায় এগিয়ে নিয়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে মাহবুবুর রহমান, ওয়াকিলুর রহমান, অশোক কর্মকার, ঢালী আল মামুন, নীলুফার চমন, লালা রুখ সেলিম, তেজস হালদার, তৈয়বা বেগম লিপি, মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান, ইমরান হোসেন পিপলু প্রমুখ মেধাবী তরুণ শিল্পী স্থাপনা শিল্পের চমৎকার দৃষ্টান্ত রেখেছেন। অন্যদিকে ডিজিটাল ভিডিও উপস্থাপনায় শিল্পকর্ম সৃজনে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা, তৈয়বা বেগম লিপি, অসীম হালদার প্রমুখ তরুণ শিল্পীরা।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের শিল্পকলায় নতুন নতুন মাধ্যমের পরীক্ষা নিরীক্ষা দৃষ্টিগ্রাহ্য হলেও ক্যানভাস ভিত্তিক চিত্রকলাতেও উৎকর্ষ দেখা গেছে। সামগ্রিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের চার দশকের চিত্রকলায় আঙ্গিক, বক্তব্য ও মাধ্যম বিবেচনায় কতিপয় প্রবণতা চিহ্নিত করা সম্ভব। প্রবণতা সমূহ নিম্নরূপ:

জীবন নির্ভর সমবাস্তববাদী ও পরাবাস্তববাদী আঙ্গিক: এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এস এম সুলতানের গ্রামীণ জীবনের ছবি ও শাহাবুদ্দিনের মুক্তিযুদ্ধ নির্ভর ছবি। নাজলী লায়লা মনসুরের নগর-জীবনে নারী বিষয়ক কাজগুলোও উল্লেখযোগ্য। মনসুরুল করিম মাটি ও মানুষের কথা তুলে ধরেন তার সম-বাস্তববাদী (তথা পরাবাস্তববাদী) আঙ্গিকে। শেখ আফজালের বাস্তববাদী নগর-ব্রাত্য জনের জীবনালেখ্য রচনা কিংবা কনক চাঁপা চাকমার পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ বিশেষ করে নারীর জীবন অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

প্রকৃতি ও নিসর্গ নির্ভর সম-বাস্তববাদী ও প্রতীকি ও পরাবাস্তববাদী আঙ্গিক। প্রবীণদের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক, কাইয়ুম চৌধুরী, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, হাশেম খান, মনিরুল ইসলাম, রফিকুন নবী, নাসিম আহমদ নাদভী, শামসুদ্দোহা, নাসরিন বেগম প্রমুখের প্রাসঙ্গিক কাজের কথা স্মরণ করা যায়। সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা ও সংকটও জার্মান প্রবাসী মুর্শিদা আরজু আল্পনা অথবা মোখলেসুর রহমান প্রমুখের মতো কোনও কোনও শিল্পীকে অনুপ্রাণিত করেছে।

লোক ঐতিহ্য নির্ভর আধুনিকতা: পঞ্চাশের দশকে জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসান যেমন লোক শিল্প উৎসারিত লোকজ আধুনিকতা আঙ্গিকের চিত্রভাষা নির্মাণ করেছিলেন তেমনি আশির দশকে লোক সাহিত্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন ধারার নকশা প্রধান চিত্র আঙ্গিক নির্মাণ করেছেন কেউ কেউ। এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন আবদুস শাকুর। ময়মনসিংহ গীতিকার বিভিন্ন চরিত্র ও কথা তার ছবির মূল প্রেরণা, আবার চরিত্রসমূহের মুখাবয়বের রং নির্বাচনে তিনি একেবারেই পরাবাস্তববাদী। লাল, কালো, নীল, সবুজ ইত্যাদি মুখের মানুষ শোভা পায় তার ক্যানভাসে। গীতিকার কাব্যাংশ দিয়ে ক্যালিগ্রাফীর আদলে সাজান ছবিকে।

বিমূর্ত আঙ্গিক: স্বাধীনতা পূর্ব ষাটের দশকেই বিমূর্ত বা সম্পূর্ণ নির্বস্তুক আঙ্গিক এদেশের চিত্রকলার একটি শক্তিশালী ধারা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। মোহাম্মদ কিবরিয়া এ ধারার প্রধান শিল্পীর সম্মান পেয়েছেন। অবশ্য পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের আরো কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী, আমিনুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক, মুর্তজা বশীর, কাজী আবদুল বাসেত, আবু তাহের, মোহাম্মদ মোহসীন, মবিনুল আজিম প্রমুখ বিমূর্ত ধারার শিল্পী ছিলেন। তৎকালীন সামরিক শাসনাধীন পাকিস্তানে বিমূর্ত চিত্রকলা চর্চা সম্ভত: রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও বিমূর্ত ধারা একটি প্রধান ধারা। মনিরুল ইসলাম, মাহমুদুল হক, কাজী গিয়াস, আবুল বারক আলভী, স্বপন চৌধুরী, এ কে এম আলমগীর, মমিনুল রেজা, নাইমা হক, রণজিৎ দাস, মোহাম্মদ ইউনুস থেকে শুরু করে অনেক তরুণ শিল্পীরাও বিমূর্ত আঙ্গিকের অনুসারী। অনেকের বিমূর্ততার সাথে নানারকম প্রতীকি ফর্মের ব্যবহার দেখা যায়। ভাস্কর্যেও বিমূর্ত ফর্মের চর্চা উল্লেখযোগ্য। প্রসঙ্গত প্রবীণ শিল্পী আবদুর রাজ্জাক থেকে শুরু করে হামিদুজ্জামান, আইভী জামান, নাসিমা হক মিতু প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। ভাস্কর্যের বিমূর্ত ফর্মের চর্চা উল্লেখযোগ্য। ছাপচিত্রেও বিমূর্ত আঙ্গিক গুরুত্ব পেয়েছে।

রাজনৈতিক অভিব্যক্তি সম্পন্ন ছবি: বাংলাদেশের উচ্চমানের চিত্রকলায় সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য বা চেতনা স্বাধীনতা পূর্বকালে তেমন দেখা যায়নি। জয়নুল আবেদিনই ছিলেন কিছুটা ব্যতিক্রম। তাঁর ‘মনপুরা ৭০’ জলোচ্ছ্বাস বিষয়ে আঁকা ত্রাণ কর্তারূপী মওলানা ভাসানীর ছবিটি এক ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে শাহাবুদ্দিন, শিশির ভট্টাচার্য, নেসার হোসেন প্রমুখের কাজের কথা উল্লেখ করতে হয়। শাহাবুদ্দিনের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি যেমন তাৎপর্যময় তেমনি বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য মহৎ ব্যক্তিদের নিয়ে আঁকা ছবিও নতুন একটি ধারা সৃষ্টি করেছে। পরবর্তী সময়ে শিল্পী হাশেম খান এধরনের কিছু রাজনৈতিক বিষয়ভিত্তিক কাজ করেছেন। প্রবীণ শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর “বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ” ছবিটি রাজনৈতিক ছবির উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

নারীবাদী বক্তব্য নির্ভর চিত্রকলা: উত্তর আধুনিক শিল্প সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয় বা ডিসকোর্স হচ্ছে সমাজে নারীর অবস্থান। বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলাতেও এই প্রসঙ্গ বিবেচিত হচ্ছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে কামরুল হাসান এবং এস এম সুলতানের মতো প্রবীণ শিল্পীদের কাজে নারীর সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থান গুরুত্ব পেয়েছে, তবে পরবর্তী সময়ে নবীন শিল্পীদের কাজে নারী-প্রশ্ন আরও তাৎপর্য পেয়েছে, বিশেষ করে রোকেয়া সুলতানা, ফরিদা জামান, নাজলী লায়লা মনসুর, আতিয়া ইসলাম এ্যানী, আইভী জামান, কনক চাঁপা চাকমা, নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা, তৈয়বা বেগম লিপি প্রমুখের কাজে।

নতুন মাধ্যম: স্থাপনা শিল্প ও ভিডিও চিত্র: সমকালীন বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়েই যেন বাংলাদেশের তেজী তরুণ শিল্পীগণ নতুন নতুন মাধ্যমে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনেও সক্ষম হচ্ছেন। স্থাপনা বা ইন্সটলেশন ও নির্মাণ বা কন্সট্রাকশন শিল্প মাধ্যম হিসেবে ইতিমধ্যে গ্রহণ যোগ্যতা পেয়েছে। ডিজিটাল ফটোগ্রাফি ও ভিডিও চিত্রও অনুরূপ নতুন মাধ্যম। প্রথমবারের মতো গত বছর বাংলাদেশের পাঁচ শিল্পী, পাঁচ জনই তরুণ, অত্যন্ত মর্যাদাশীল ভেনিস বিয়েনাল প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। তাদের শিল্পকর্মের মাধ্যম মূলত স্থাপনা ও ভিডিও।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সামগ্রিক শিল্প চর্চার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, শিল্পীর সংখ্যা বেড়েছে, পৃষ্ঠপোষকতার মাত্রা বেড়েছে, গ্যালারি ও শিল্পাঙ্গনের সংখ্যা বেড়েছে, প্রদর্শনীর সংখ্যা বেড়েছে। শিল্প বিষয়ক প্রকাশনার ধরন ও মান বেড়েছে। শিল্পে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বেড়েছে এবং শিল্পকর্মের চাহিদা ও আথির্ক মূল্যও বেড়েছে। অর্থাৎ স্বাধীনতা শিল্পকলার বহুমুখী বিকাশের বিশাল সুযোগ করে দিয়েছে। ১৯৪৮ সনে জয়নুল আবেদিনের হাতে যে বৃক্ষের চারা রোপণ হয়েছিল আজ ৬৬ বছরে সেটিকে মহীরুহ বলেই মনে হয়।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

লেখক: নজরুল ইসলাম, শিক্ষাবিদ ও শিল্প সমালোচক (বাংলাদেশ)

Facebook Comments