আর্থার কোনান ডয়েল : শার্লক হোমস-এর স্রষ্টা

share on:
আর্থার কোনান ডয়েল

আর্থার কোনান ডয়েল পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। তাঁর রচিত গোয়েন্দা কাহিনিভিত্তিক বইগুলোর গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমসের জন্য তিনি বিশ্বখ্যাত। প্রচুর গোয়েন্দা ছোটগল্পও লিখেছেন, যা অপরাধভিত্তিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক অমূল্য সম্পদ।

বিশ্বসাহিত্যের জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমসের স্রস্টা  অসামান্য প্রতিভাধর এই লেখকের অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে— কল্পবিজ্ঞান গল্প, নাটক, প্রেমের উপন্যাস, কবিতা, ননফিকশন, ঐতিহাসিক উপন্যাস ও রম্যরচনা।

আর্থার কোনান ডয়েলের জীবন ছিল বহুমাত্রিক ও রোমাঞ্চপূর্ণ। তিনি ছিলেন একাধারে ইতিহাসজ্ঞ, তিমি শিকারী, ক্রীড়াবিদ ও যুদ্ধ সাংবাদিক। তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেষজবিদ্যা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে লন্ডনে স্থায়ী হন।

কোনান ডয়েল সবচেয়ে বেশি লিখেছেন শার্লক হোমস চরিত্রটি নিয়ে। টুকটাক গোয়েন্দাগল্প পড়েন, অথচ শার্লক হোমসের নাম শোনেননি, এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া সত্যি বিরল। ব্রিটিশ লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েল-এর লেখা ‘আ স্টাডি ইন স্কারলেট’ গল্পে প্রথম বিশ্বখ্যাত প্রাইভেট গোয়েন্দা শার্লক হোমসকে দেখা যায়, লেখক নিজেই যাঁকে একজন ‘কনসালটেটিভ গোয়েন্দা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। গোয়েন্দা শার্লক হোমস মূলত তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, হোমস যুক্তির তড়িৎ ব্যবহার, ছদ্মবেশ ধারণ ক্ষমতা , ফরেনসিক সায়েন্স বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও ঘটনার যৌক্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে আপাতচোখে একেবারেই ক্লু-লেস ঘটনার সঠিক সমাধান দিয়ে থাকেন।

শার্লক হোমসকে নিয়ে ৪টি উপন্যাস ও ৫৬টি ছোটগল্প লিখেছেন ডয়েল। তার প্রথম সাফল্য ছিল ‘আ স্টাডি ইন স্কারলেট’। এটি ১৮৮৭ সালে বিটনস ক্রিসমাস এ্যানুয়ালে প্রকাশিত হয়। প্রথমে এ উপন্যাসে হোমসের নাম ছিল শেরিনফোর্ড হোমস। পরে তা পরিবর্তন করে রাখা হয় শার্লক হোমস। হোমসের পুরো নাম উইলিয়াম শার্লক স্কট হোমস। বাবা সাইগার হোমস ও মা ভায়োলেট শেরিন ফোর্ড। অবিবাহিত হোমসের ঠিকানা, ২২১/বি বেকার স্ট্রিট, লন্ডন।

মিসেস হাডসন ছিলেন তাঁর বাড়িওয়ালি। তাঁর বন্ধু, সহযোগী ও পরে তাঁর বায়োগ্রাফার ডা. ওয়াটসন বলতে গেলে জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটান শার্লক হোমসের সঙ্গে রিজেন্টস পার্ক–লাগোয়া এই বাড়িতে। ডা. জন ওয়াটসনের বিয়ের আগে এবং তাঁর স্ত্রী বিয়োগের পরও মিসেস হাডসনের বাড়িতেই শার্লক হোমসের সঙ্গে ভাড়া থাকতেন। ওয়াটসনের এক প্রশ্নের উত্তরে হোমস বলেন, যেকোনো ঘটনার ডিটেকশন মানেই বিজ্ঞানমনষ্ক পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা, আবেগ কিংবা রোমান্টিসিজমের কোনো জায়গা সেখানে নেই। মনে রেখো বন্ধু, নিছক চেয়ে থাকার নাম দেখা নয়। সাধারণ মানুষ যা দেখে, আমি তার চেয়ে অনেকটা বেশি দেখি ও বোঝার চেষ্টা করি। তফাতটা এখানেই।

তাঁর প্রতিটি গল্প বা উপন্যাস কিন্তু হোমসের সহযোগী ও বন্ধু ডা. জন ওয়াটসনের বয়ানে লেখা হয়েছে। হোমস নিজেই স্বীকার করেছেন যে ডা. ওয়াটসনের মতো বিশ্বস্ত থেকে আর কেউ তাঁর কাহিনি লিখতে পারতেন না।

১৮৯০ সালে ‘দ্য সাইন অব ফোর’ প্রকাশিত হওয়ার পর ডয়েল চিকিৎসাবিদ্যা ছেড়ে লেখালেখিতে পুরোমাত্রায় আত্মনিয়োগ করেন। শার্লক হোমস সিরিজের অন্য দুটি উপন্যাস হল ‘দ্য হাউন্ড অব দ্য বাস্কারভিলস’ ও ‘দ্য ভ্যালি অব ফিয়ার’। তিনি অনেক গল্প, কল্প-কাহিনী এবং ইতিহাসকেন্দ্রিক রোমাঞ্চ কাহিনী লিখলেও শার্লক হোমসকে নিয়ে লেখা গোয়েন্দা-কাহিনীগুলোই তাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছে। এক সময় একঘেয়েমির কারণে ডয়েল ‘হিজ লাস্ট বো’ গল্পে হোমসকে মেরে ফেলেন। পরে পাঠকের দাবির মুখে চরিত্রটিকে ফিরিয়ে আনেন।

শার্লক হোমস চরিত্র সৃষ্টির বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, চরিত্রটি আমার ইউনিভার্সিটির এক প্রফেসর থেকে অনুপ্রাণিত। তাঁর নাম ড. জোসেফ বেল। আমি খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখেছি, কাজ করেছি তাঁর সাথে। রোগীর দিকে একবার তাকিয়েই তিনি প্রচুর তথ্য বলে দিতে পারতেন।

রহস্য-রোমাঞ্চ গল্পে ডয়েলের অনুপ্রেরণা ছিলেন এডগার এলেন পো, জুলিস ভেরনি ও রবার্ট লুইস স্টিভেনসন। অন্য দিকে তিনি প্রভাবিত করেছেন আগাথা ক্রিস্টিসহ পরবর্তীকালের অনেক কল্পকাহিনী লেখককে। গত একশতকে চলচ্চিত্র ও নাটকে বারবার চিত্রায়িত হয়েছে শার্লক হোমস। সাম্প্রতিক সময়ে বিবিসি নির্মিত ‘শার্লক’ সিরিয়ালটি গোয়েন্দা কাহিনী ভক্তদের মাঝে ঝড় তোলে। এ ছাড়া বিশ্বের বেশির ভাগ ভাষায় শার্লক হোমসের গল্প ও উপন্যাস অনুদিত হয়েছে।

বাস্তব জীবনেও দু-দুবার গোয়েন্দাগিরি করে অন্যায়ভাবে দোষী-সাব্যস্ত ব্যক্তিদের নির্দোষ প্রমাণ করতে সফল হন ডয়েল। বোয়ের যুদ্ধের সময় দক্ষিণ আফ্রিকান এক মাঠ-চিকিৎসাকেন্দ্রে অবদান রাখার জন্য ১৯০২ সালে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয় তাকে। যদিও পেশায় তিনি ছিলেন ডাক্তার। তবে ডাক্তার হিসেবে তেমন খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি।

১৮৫৯ সালের ২২ মে স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩০ সালের ৭ জুলাই ইংল্যান্ডের ইস্ট সাসেক্সে মৃত্যুবরণ করেন আর্থার কোনান ডয়েল।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : আশ্চর্য-সুন্দর গল্পকথক

Facebook Comments