অ্যালফ্রেড হিচকক : মাস্টার অব সাসপেন্স

share on:
অ্যালফ্রেড হিচকক

অ্যালফ্রেড হিচকক চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র ও জনপ্রিয় একটি ধারা তৈরি করেছেন। উদ্বেগ, ভয়, কল্পনা অথবা সহানুভূতিকে এমনভাবে ফ্রেমবন্দি ও সম্পাদনা করতেন, যা ছবিকে নতুন মাত্রা উপহার দেয়। এখনও তার দ্বারা প্রভাবিত বিশ্বের অনেক পরিচালক।

স্বয়ং হিচককই নিজের পরিচালিত ছবিগুলো দেখতে ভয় পেতেন। ১৯৬৩ সালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি আমার নিজের ছবি দেখতে ভয় পাই। কখনই ছবিগুলো দেখতে চাই না। না-জানি মানুষ কিভাবে দেখে আমার ছবি!’

অ্যালফ্রেড হিচকক ১৮৯৯ সালের ১৩ আগস্ট ইংল্যান্ডের লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জেসুইট ক্লাসিক স্কুল, সেন্ট ইগনাতিয়াস কলেজ ও সালেসিয়ান কলেজে পড়েন। পাঁচ বছর বয়সে খারাপ ব্যবহারের জন্য তার বাবা তাকে থানায় নিয়ে আসেন পাঁচ মিনিট বন্দি করে রাখার জন্য। ধারণা করা হয়, এ রকম অদ্ভুত পরিস্থিতি তাকে আতঙ্ক ও চমকের ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলে। ১৫ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর লন্ডন কাউন্টি স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড নেভিগেশনে ভর্তি হন। শিক্ষাজীবন শেষে ড্রাফটসম্যান ও অ্যাডভারটাইজিং ডিজাইনার হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।

১৯১৯ সালে হেনলি টেলিগ্রাফের প্রথম সংকলনে প্রকাশিত হয় তার লেখা ‘গ্যাস’। পরবর্তী সময়ে ওই পত্রিকায় তার অনেকগুলো লেখা প্রকাশিত হয়। ১৯২০ সালের দিকে ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্রে আগ্রহী হয়ে উঠেন। এ সময় প্যারামাউন্ট পিকচারের লন্ডন শাখায় টাইটেল কার্ড ডিজাইনার হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। এরপর ইসলিংটন স্টুডিওতে কাজ করেন। ১৯২২ সালে নাম্বার থার্টিন চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করেন। কিন্তু প্রথম চলচ্চিত্রটি অসম্পূর্ণই থেকে যায়। পরের বছর ‘সিমোর হিকস’ এর সাথে যৌথ পরিচালনায় নির্মাণ করেন ‘অলয়েজ টেল ইয়োর ওয়াইফ’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ছবিতে পরিচালক হিসেবে তাকে কৃতিত্ব দেয়া হয়নি।

১৯২৫ সালে ‘দ্য প্লেজার গার্ডেন’ হয় তার একক পরিচালনায় প্রথম ছবি। অবশ্য মেলোড্রামা জনরার এই ছবিটি মাঝারি বা নিম্নমানের বললেও ভুল হবে না। প্রথম যে ছবিতে তার প্রতিভার সামান্য হলেও ইঙ্গিত পাওয়া যায় সেটি হলো ‘দ্য লজার: এ স্টোরি অব দ্য লন্ডন ফগ’। ১৯২৯ সালে মুক্তি পায় হিচককের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘ব্লাকমেইল’। থ্রিলার জনরার এই ছবিটি সে বছর ইংল্যান্ডের অন্যতম ব্যবসাসফল ছবি ছিল।

পাশাপাশি ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথম ছবি ব্লাকমেইল, যার প্রতিটি দৃশ্যে শব্দ সিনক্রোনাইজ করা হয়েছে। সে বছরই থ্রিলার ছবি নির্মাণে নিজের পারদর্শীতা আরো এক ধাপ উপরে নিয়ে যান হিচকক তার ‘জুনো অ্যান্ড দ্য পেকক’ ছবিটির মাধ্যমে। এরপর মার্ডার, সেভেনটিনথ, দ্য স্কিন গেম, ভিয়েনা ইত্যাদি মুভির মাধ্যমে ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন আলফ্রেড হিচকক।

গোমাউন্ট ব্রিটিশ চলচ্চিত্র কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ১৯৩৪ সালে হিচককের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘দ্য ম্যান হু নিউ টু মাচ’, যা ছিল হিচককের ক্যারিয়ারের ইংল্যান্ডের বাইরে মুক্তি পাওয়া প্রথম চলচ্চিত্র। ক্রাইম ড্রামা জনরার চলচ্চিত্রটি ব্যবসাসফল হবার পাশাপাশি হিচকককে এনে দেয় পরিচালক হিসেবে খ্যাতি। পরবর্তীতে ‘দ্য ৩৯ স্টেপস’(১৯৩৫) এবং ‘সিক্রেট এজেন্ট’ ছবিদুটির মাধ্যমে হিচকক এক কথায় একটি নতুন জনরার সূচনা করেন যার নাম রোমান্টিক থ্রিলার।

১৯৩৬ সালে কিছুটা যেন ছন্দপতন ঘটলো আলফ্রেড হিচককের। সে বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাবোটেজ’ না ব্যবসায়িক সফলতা পায়, না সমালোচকদের প্রশংসা। কেননা থ্রিলার মুভি নির্মাতা হিসেবে ততদিনে হিচককের বেশ সুনাম। সাবোটেজ চলচ্চিত্রটি ঠিক হিচককের মনে হয়নি। তার চেয়ে বরং পরের বছর মুক্তি পাওয়া ‘ইয়াং অ্যান্ড ইনোসেন্ট’ চলচ্চিত্রটিতে ভালো সাসপেন্স ছিল।

১৯৩৮ সালে নির্মাণ করেন ‘দ্য লেডি ভ্যানিশেস’। এই চলচ্চিত্রটি তখন পর্যন্ত ইংল্যান্ড এবং আমেরিকা, উভয় বাজারে হিচককের সবচেয়ে বেশি আয় করা চলচ্চিত্র হয়।

১৯৪০ সালে পরিবার সমেত হলিউডে যান। ডেভিড সেলযনিকের প্রযোজনায় নির্মাণ করেন রেবেকা (১৯৪০)। এটি অস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতে নেয়। এরপর একে একে হলিউডে মুক্তি পায় ক্লাসিক সব চলচ্চিত্র। অন্যতম হচ্ছে- লাইফবোট (১৯৪৪), স্পেলবাউন্ড (১৯৪৫), নটোরিয়াস (১৯৪৬), রোপ (১৯৪৮), স্ট্রেঞ্জারস অন আ ট্রেন (১৯৫১), ডায়াল এম ফর মার্ডার (১৯৫৪) ও রিয়ার উইন্ডো (১৯৫৪)।

১৯৬০ সালে মুক্তি পায় তার সবচেয়ে সফল চলচ্চিত্র ‘সাইকো’। থ্রিলার জনরার ছবিকে অনন্য এক উচ্চতায় স্থাপন করে সাইকো। সাসপেন্সের সুদক্ষ প্রদর্শনীতে দর্শকের কপালে ঘাম জমাতে বাধ্য করে সাইকো। সাইকোর জন্য আলফ্রেড হিচকক শেষবারের মতো অস্কার মনোনয়ন পেয়েছিলেন। সাইকোর পর আলফ্রেড হিচককের উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে ‘দ্য বার্ডস’ এবং ‘মার্নি’।  ফ্যামিলি প্লট (১৯৭৬) ছিল তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র।

১৯৫৫-৬২ সাল পর্যন্ত অধিক পরিমাণ দর্শকের নিকট পৌঁছাবার লক্ষ্যে তিনি নাটক/সাহিত্য/থ্রিলার/রহস্য ইত্যাদির সংকলন নিয়ে একটি টিভি-শো সঞ্চালনা শুরু করেন যার পরিচালক এবং পরিকল্পনাকারীও তিনি নিজেই ছিলেন। ‘আলফ্রেড হিচকক প্রেজেন্টস’ নামের এই অনুষ্ঠানটি নিউইয়র্ক টাইমসের সেরা ১০০ টিভি-শো এর একটি হবার সম্মান লাভ করে।

১৯৬২-৬৫ সালে এই অনুষ্ঠানের নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘আলফ্রেড হিচকক আওয়ারস’ হয়। এই টিভি-শো তখনকার সময়ে আলফ্রেড হিচকককে করে তোলে সমসাময়িক পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং পরিচিত চলচ্চিত্র পরিচালক। ১৯৫৬ সালে হিচকক তার ১৯৩৪ সালের মুক ছবি ‘দ্য ম্যান হু নিউ টু মাচ’ এর রিমেক তৈরি করেন। একই বছর তার পরিচালিত ‘দ্য রঙ ম্যান’ ছবিটিও বেশ জনপ্রিয়তা পায়।

১৯৭৯ সালে পান আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট লাইফ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড। এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি ম্যাগাজিনে বিশ্বের সেরা একশ’ চলচ্চিত্রের মধ্যে সাইকো, ভার্টিগো, নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট ও নটোরিয়াস স্থান পায়। ব্রিটেনের বিখ্যাত এম্পায়ার ম্যাগাজিনের গ্রেটেস্ট ডিরেক্টরস এভার তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের হান্ড্রেড মোস্ট হার্ট পাউন্ডিং মুভিজ তালিকার ৯টি সিনেমাই তার, যার মধ্যে প্রথমে রয়েছে সাইকো।

এ ছাড়া জিতেছেন গোল্ডেন গ্লোব, সিনেমা জাম্পো অ্যাওয়ার্ড, লরিয়াল অ্যাওয়ার্ড ও ডিরেক্টরস গিল্ড অব আমেরিকা অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য পুরস্কার এবং সম্মাননা। ১৯৮০ সালে ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথের কাছে থেকে নাইট উপাধি লাভ করেন। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এই কিংবদন্তী পরিচালক কখনো অস্কার পুরস্কার জেতেননি!

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এক ডজনের অধিক কালজয়ী ক্লাসিক চলচ্চিত্র উপহার দেয়া আলফ্রেড হিচকক কখনো অস্কার পুরস্কার জেতেননি। তাতে কী? হিচকক অস্কার না পাওয়ায় তার কিছু হয়নি, বরং অস্কারই বঞ্চিত হয়েছে একজন কিংবদন্তীকে সম্মানিত করার গৌরব থেকে!

হিচকক নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- দ্য লুজার : আ স্টোরি অক দ্য লন্ডন ফগ (১৯২৭), দ্য রিং (১৯২৭), ডাউনহিল (১৯২৭), দ্য ফার্মারস ওয়াইফ (১৯২৮), ইজি ভার্চু (১৯২৮), ব্ল্যাকমেইল (১৯২৯), জুনো অ্যান্ড দ্য পেকক (১৯৩০), মার্ডার! (১৯৩০), এল্‌সট্রি কলিং (১৯৩০), দ্য স্কিন গেম (১৯৩১), ম্যারি (১৯৩১), রিচ অ্যান্ড স্ট্রেইঞ্জ (১৯৩১), নাম্বার সেভেনটিন (১৯৩২), ওয়েলজেস ফ্রম ভিয়েনা (১৯৩৩), দ্য ম্যান হু নু টু মাচ (১৯৩৪), দ্য থার্টি নাইন স্টেপস (১৯৩৫), সিক্রেট এজেন্ট (১৯৩৬), স্যাবোটেজ (১৯৩৬), ইয়াং অ্যান্ড ইনোসেন্ট (১৯৩৭), রেবেকা (১৯৪০), শ্যাডো অব এ ডাউট (১৯৪৩), লাইফবোট (১৯৪৪), স্পেলবাউন্ড (১৯৪৫), স্ট্রেঞ্জারস অব আ ট্রেন (১৯৫১), ডায়াল এম ফর মার্ডার (১৯৫৪), রেয়ার উইন্ডো (১৯৫৪), ভার্টিগো (১৯৫৮), নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট (১৯৫৯), সাইকো (১৯৬০) ও দ্য বার্ডস (১৯৬৩)।

তার স্ত্রীর নাম অ্যালমা র‌্যাভিল্লী। তাদের একমাত্র মেয়ের নাম প্যাট্রেসিয়া হিচকক। অ্যালফ্রেড যোসেফ হিচকক ১৯৮০ সালের ২৯ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যার্লিফোনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : সত্যজিৎ রায় ও বাংলা চলচ্চিত্র : পর্ব ১

Facebook Comments