আলাউদ্দিন আল আজাদ

share on:
আলাউদ্দিন আল আজাদ

আলাউদ্দিন আল আজাদ ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী লেখকদের মধ্যে অন্যতম । সমাজ ঘনিষ্ঠ চরিত্র, আশাবাদ, সংগ্রামী মনোভাব ও নাগরিক জীবনের বিকার তার লেখার অন্যতম বিষয়বস্তু।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের যে ভিত্তি নির্মিত হয়ে আছে সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজাদের শিল্প-চেতনার যে বিশেষত্ব পাঠকের চোখে পড়ে তা হচ্ছে, বর্ণনাময় শিল্পমাধুরী, বাক্যগঠনের অভিনবত্ব – সেইসঙ্গে গল্পে প্রতীকধর্মী চিত্রকল্প ব্যবহার। বাংলাদেশের মাটি মানুষ যেমন কথা বলে তাঁর গল্পের আখ্যানে, তেমনি জীবনের বিভিন্ন দিক উপস্থাপিত হয় কাঠামোর ক্যানভাসে। তাঁর গল্প মূলত জীবনের কথা বলে, দেশ বা জাতির কথা বলে, প্রকৃতি এবং জীবের বৈচিত্র্যময় অবস্থানের কথা বলে।

আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন, ‘আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রথম গল্পকার, যিনি অতি অল্প বয়সে খ্যাতি অর্জন করেন’, সমাজতন্ত্র ও শ্রেণিচেতনা তাঁর গল্পের প্রধান বিষয়, গ্রামীণ জীবন-সমাজ সেইসঙ্গে তাঁর পারিপার্শিবক পরিবেশের যে পরিচয় তাঁর সাহিত্যে পাওয়া যায়, বিশেষ করে ধর্মান্ধতা কতটা ভেতরে শেকড় বিস্তার করে আমাদের সমাজজীবনকে অতিষ্ঠ করেছে এবং সেখান থেকে বের হওয়ার যে কোনো রাস্তা অবশিষ্ট নেই, সেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবেশের গল্প তুলে ধরেছেন, এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানিয়েছেন, পাশাপাশি ধনী-গরিবের আকাশসমান যে বৈষম্য, সেখান থেকে আর কোনো নিস্তার নেই, যদি না সমাজতন্ত্র আসে। করম্নণা নয়, ভিক্ষা নয়, ফিতরা-জাকাত নয়, চাই ফসলের ন্যায্য অধিকার, চাই বিপস্নব, সম্পদের সুষম বণ্টন, তখনই হবে বন্ধুত্ব-ভ্রাতৃত্ব, সমাজে ফিরে আসবে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি।

এ কবি, লেখক ও শিক্ষাবিদ ১৯৩২ সালের ৬ মে নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার রামনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

আলাউদ্দিন আল আজাদের বাবার নাম গাজী আব্দুস সোবহান ও মা মোসাম্মাৎ আমেনা খাতুন। ১৯৪৭ সালে নারায়ণপুর শরাফতউল্লাহ ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৪৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন আজাদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৫৩ সালে স্নাতক ও ১৯৫৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঈশ্বরগুপ্তের জীবন ও কবিতা বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর সরকারি কলেজের অধ্যাপনায় যুক্ত হন। পাঁচটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা এবং পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। এ ছাড়া মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসে সংস্কৃতি উপদেষ্টা, শিক্ষা সচিব, সংস্কৃতিবিষয়ক বিভাগ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৬ সালে নবম শ্রেণীতে পড়াকালে কলকাতার ‘সওগাত’ পত্রিকায় আজাদের প্রথম প্রবন্ধ ‘আবেগ’ ও ছোটগল্প ‘জানোয়ার’ প্রকাশিত হয়। ১৯৫০ সালে প্রথম গল্পসংগ্রহ প্রকাশিত হয়। ১৯৬০ সালে পদক্ষেপ নামক এক পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় বিখ্যাত ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ উপন্যাসটি প্রথম ছাপা হয়। পরে নওরোজ কিতাবিস্তান বই আকারে প্রকাশ করে। এটি বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। প্রথম কবিতার বই ‘মানচিত্র’ প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। ১৯৫৩ সালে কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সঙ্কলনে কালজয়ী কবিতা ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ স্থান পায়।

তার লেখায় সমাজের গতি ও মানব চরিত্রের বিভিন্ন দিক চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। মানুষ, ভূমি, রাষ্ট্রের কাঠামো ও চরিত্রের অমিত সম্ভাবনার সূত্রাবলী যেন। সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে গভীরভাবে। কবিতায় সার্থকভাবে রূপক ও প্রতীক ব্যবহার করেছেন। সর্বোপরি তিনি ছিলেন নিরীক্ষাধর্মী লেখক। তার লেখা ও সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা ১৪৯টি। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে- উপন্যাস : তেইশ নম্বর তৈলচিত্র, শীতের শেষরাত বসন্তের প্রথম দিন, কর্ণফুলী, শ্যাম ছায়ার সংবাদ, জ্যোৎস্নার অজানা জীবন, অপর যোদ্ধারা, অন্তরীক্ষে বৃক্ষরাজি, অনূদিত অন্ধকার এবং কালো জ্যোৎস্নায় চন্দ্রমল্লিকা। গল্প : জেগে আছি, ধানকন্যা, মৃগনাভি, অন্ধকার সিঁড়ি, উজান তরঙ্গে, যখন সৈকত এবং আমার রক্ত স্বপ্ন আমার। কবিতা : মানচিত্র, ভোরের নদীর মোহনায় জাগরণ, সূর্য জ্বালার স্বপন এবং লেলিহান পান্ডুলিপি। নাটক : এহুদের মেয়ে, মরোক্কোর জাদুকর, ধন্যবাদ এবং সংবাদ শেষাংশ। প্রবন্ধ : শিল্পের সাধনা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর লেখা : ফেরারী ডায়েরী।

বিভিন্ন ভাষায় আলাউদ্দিন আল আজাদের লেখার অনুবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ ১৯৭৭ সালে বুলগেরীয় ভাষায় ‘পোত্রেৎ নমের দুবাতসাৎ ত্রি’ নামে অনুবাদ হয়েছে। এ উপন্যাস অবলম্বনে সুভাষ দত্তের পরিচালনায় নির্মিত হয়েছে ‘বসুন্ধরা’ নামে চলচ্চিত্র। অভিনয় করেছেন ববিতা ও ইলিয়াস কাঞ্চন। চলচ্চিত্রটি সাতটি জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। তার কাহিনী থেকে নির্মিত আরেকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ‘সূর্যস্নান’। এটি বাংলাদেশের প্রথমদিকের চলচ্চিত্রগুলোর একটি। সালাহউদ্দিনের পরিচালনায় নির্মিত ছবিটি ১৯৬২ সালে তেহরান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়। একে ক্লাসিক চলচ্চিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। তার গল্প ‘বৃষ্টি’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

তিনি অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৪), ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬৫), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৭৭), আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), আবুল মনসুর আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৮৫), রংধনু পুরস্কার (১৯৮৫), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), একুশে পদক (১৯৮৬), শেরে বাংলা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৭), নাট্যসভা ব্যক্তিত্ব পুরস্কার (১৯৮৯), কথক একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৯) এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণ পদক (১৯৯৪)।

আলাউদ্দিন আল আজাদ ২০০৯ সালের ৩ জুলাই ঢাকায় মারা যান।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : আশরাফ সিদ্দিকী

Facebook Comments