আব্বাস কিয়ারোস্তামির সাক্ষাৎকার : পর্ব ১

share on:
আব্বাস কিয়ারোস্তামি

আব্বাস কিয়ারোস্তামির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন তুরস্কের ইস্তাম্বুল চলচ্চিত্র উৎসবে ব্রাইট লাইটস্ চলচ্চিত্র সাময়িকীর বার্ত কার্দুলেণ্ঢা ২০০৫ সালের মে মাসে ।

যদি বিগত শতকের পঞ্চাশের দশককে ইতালির নিও—রিয়ালিজম, ষাটের দশককে ফ্রান্সের নুভেল ভাগ, সত্তরের দশককে নতুন জার্মান চলচ্চিত্রের ও আশির দশককে চীনের বিপ্লবী বাস্তবতা ও বিপ্লবী রোমান্টিসিজমের সমন্বয়ের দশক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তবে নব্বইয়ের দশককে চিহ্নিত করতে হবে ইরানি চলচ্চিত্রের বিশ্বজয়ের দশক রূপে। আধুনিক ইরানি পরিচালকদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত আব্বাস কিয়ারোস্তামি। ব্রিটিশ চিত্রসমালোচকদের বিচারে ১৯৭৮ সালের পরবর্তী সময়ের শ্রেষ্ঠ দশজন পরিচালকের তালিকায় আব্বাসের স্থান চতুর্থ।

আব্বাস কিয়ারোস্তামি জন্মেছেন তেহেরানে, ১৯৪০ সালে। তেহেরান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্পকলা নিয়ে তিনি অধ্যয়ন করেন, প্রথমে গ্রাফিক্স শিল্পী ও তারপর কমার্সিয়ালের পরিচালক রূপে কাজ করেন, বিশ শতকের ষাটের দশকের শেষভাগে তিনি ইনস্টিটিউট ফর দি ইন্টেলেকচুয়াল ডেভেলপমেন্ট অব ইয়ং অ্যাডাল্টস্ সংস্থায় যোগ দেন। তাঁর অধিকাংশ কাহিনিচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি এই সংস্থাটিই প্রযোজনা করেছে। আব্বাসের উলে­খযোগ্য ছবির মধ্যে আছে দি প্যাসেঞ্জার (১৯৭২), দি রিপোর্ট (১৯৭৭), ফাস্টর্ গ্রেডার্স (১৯৮৫), হোয়্যার ইজ মাই ফ্রেন্ড’স্ (১৯৮৭), লাইফ অ্যাণ্ড নাথিং মোর (১৯৯২), আণ্ডার দি অলিভ ট্রিস্ (১৯৯৪), A Propos de Nice, la Suite (১৯৯৫), জার্নি ইনটু দি ডন (১৯৯৬) ইত্যাদি। বিখ্যাত ও পুরস্কৃত চিত্র দি হোয়াইট বেলুন (১৯৯৫)—এর চিত্রনাট্যও তিনি লিখেছিলেন। আব্বাসের ছবি নব্যবাস্তববাদ, প্রগতিশীল রোমান্টিকতা, তৃতীয় বিশ্বের আশাবাদ ও ইরানি সমাজে অগ্রগতি ও পিছুটানের দ্বন্দ্বে চিহ্নিত। আব্বাস কিয়ারোস্তামির ছবি আজ উত্তরাধুনিক চলচ্চিত্রের এক অঙ্গাঙ্গি অংশ। তাঁর দি টেস্ট অব চেরীজ ১৯৯৭ সালে কানে গ্রাঁপ্রি সম্মানে ও দি উইণ্ড উইল ক্যারি আস ১৯৯৯ সালে ভেনিসে গ্র্যাণ্ড জুরি পুরষ্কারে ভূষিত হয়। বলা হয়েছে, এইসব চলচ্চিত্র হল আধুনিক প্যারাব্ল্ ও মেটাফ্যরের চিত্ররূপ। যেমন টেন (২০০২) ও ফাইভ (২০০৪) ন্যারেটিভ সিনেমার সরলতম রূপ হিসেবে স্বীকৃত। ইরানের বাইরে নির্মাণ করেন সার্টিফাইড কপি (২০১০), লাইক সামওয়ান ইন লাভ (২০১২)।

 জ্যঁ লুক গদার একটি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন, চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ—এর মাধ্যমে এবং এর শেষ আব্বাস কিয়ারোস্তামির মধ্য দিয়ে। গদার এর এই উক্তি সম্পর্কে আপনার মত কী?

গদার এখন নিজেই তার এই উক্তিকে আর ঠিক মনে করেন না, বিশেষ করে টেন ছবি নির্মাণের সময় আমি সিনেমার ধারার যে একটু পরিবর্তন করেছি তারপর থেকে।

আমি আরেকটি উক্তির উলে­খ করবো। এন্টনি মিন্ঘেলা বলেছিলেন, স্যামুয়েল বেকেট যদি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতো, তবে সেটা কিয়ারোস্তামির মত করতো। আপনি কী মনে করেন?

হয়তোবা। বেকেট কিন্তু একটা ছবি বানিয়েছিল, এ্যালান শোয়েনডার পরিচালনা করেছিল এবং বাস্টার কিয়েটন মুখ্য ভূমিকায় ছিল। অতএব, মি. মিনঘেলার উক্তিটি প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার কিন্তু কিছু উপায় আছে।

আপনি চলচ্চিত্র নির্মাতা হলেন কিভাবে?

আমার চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার পিছনে আমার বন্ধু আব্বাস কোহেনদারির জুতার অবদানই মুখ্য! সেই সময় আমি কেবল উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছি এবং স্কুল অব ফাইন আর্টস্—এ পেইন্টিংস্—এ ভর্তি হতে ব্যর্থ হলাম। ফলে ট্রাফিক পুলিশ হতে হল। একদিন আব্বাস কোহেনদারির মুদির দোকানে বসে আছি, তখন সে জানতে চাইলো আমি তার সাথে তাজরেস ব্রিজ দেখতে যাবো কি না। আমি জানালাম আমি যাবো না কারণ আমার জুতা নাই। ফলে সে আমাকে এক জোড়া জুতা দিল, আমার পায়ের মাপের। তারপর আমরা তাজরেস ব্রিজের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সেই সময় আমরা ফারহাদ আসটারি পর্যন্ত গিয়েছিলাম এবং ওখানে মোহাকেক নামে একজনের সাথে পরিচয় হলো যিনি পেইন্টিংস্ শেখাতেন। আমি তার কাছে ক্লাস করা শুরু করলাম এবং ফাইন আর্টস স্কুলে আবার ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। এবার আমি পাশ করলাম। তখন আমি বিজ্ঞাপনের কাজ শুরু করেছি। আঠার বছর বয়সে আমি বাড়ি ছাড়ি আর তখন আমার চলার উপার্জন আমাকেই করতে হতো। শুরুতে আমি বেশ কয়েকটা স্টুডিও’তে পেইন্টার এবং গ্রাফিক্স আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করি : আমি বইয়ের প্রচ্ছদ, পোস্টার ইত্যাদি করতাম। সেখান থেকে তাব্লি ফিল্ম সেন্টার—এ গেলাম। সেন্টারটি সেই সময় কমার্শিয়াল প্রডাকশনের কেন্দ্র বিন্দু ছিল। ওখানকার পরিচালকের পদের জন্য চেষ্টা করলে তারা আমাকে আইসোথার্মাল ওয়াটার—হিটার নিয়ে লিখতে বলে, সারারাত জেগে ওয়াটার—হিটার নিয়ে আমি একটি কবিতা লিখি। তিন দিন পর টিভির একটা বিজ্ঞাপনে আমার কবিতাটা শুনে আমি স্বাভাবিকভাবে বিস্মিত হয়ে পড়ি। এভাবেই আমি কমার্শিয়াল জগতে ঢুকে পড়ি। ধীরে ধীরে আমি উন্নতি করেছি। পরে আমি আরো অনেক বিজ্ঞাপন লিখেছি এবং সেগুলো বানিয়েছি। উনিশ’শ ষাট থেকে ঊনসত্তরের মধ্যে আমি একশ পঞ্চাশটার মত বিজ্ঞাপন তৈরি করে ফেলি। আমাকে এক মিনিটের মধ্যে সব বক্তব্যকে ফুটিয়ে তুলতে হত এবং এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপিত করতে হত যে জনগণ সেটা দেখে আলোড়িত হয় এবং দোকানে গিয়ে বিজ্ঞাপনের প্রডাক্টি কেনে। আমি কমার্শিয়াল এবং গ্রাফিক্স আর্ট থেকে সিনেমার অনেককিছু শিখেছি। গ্রাফিক্স—এ কি হয়? তোমার কাছে একটি কাগজ আছে, সংগে একটি কলম যার মধ্যে তুমি এমন কিছু অঁাকবে যা খুব সহজেই পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। আমারতো মনে হয়, গ্রাফিক্স সব আর্টেরই জনক। এর কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই ধরনের আরোপিত কাজও তোমার কল্পনাকে কাজে লাগাতে এক রকম বাধ্য করে। আমার বিজ্ঞাপন কাজের শেষ বছরগুলোতে কয়েকটি ইরানি চলচ্চিত্রের জন্য আমি কিছু ক্রেডিট সিকোয়েন্সের ডিজাইন করি। ওটাই কিন্তু আমার গ্রাফিক্স কাজ এবং নন্—এ্যাডভার্টাইজিং ফিল্ম পরিচালনার একটা টার্নিং পয়েন্ট। এই ক্রেটিড সিকোয়েন্সে কাজ করার সময়ই আমি আমার ক্যামেরাকে আবিস্কার করি।

আপনি কি নিজেকে প্রধানত একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাই মনে করেন?

আমার পেশা অনেক, তবে কোনটাই আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারে না। অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা আছে যারা একটি ছবির কাজ করতে করতে পরেরটার কথা চিন্তা করে। এরা কখনো শিল্পী হতে পারে না। আমি এদের দলে নই। আমিতো একজন ভবঘুরে। এই ভবঘুরে হবার ফলে আমি বিচিত্র সব জায়গায় গিয়েছি এবং বিচিত্র সবকিছু করেছি যেমন, কার্পেন্ট্রি করে আমি অনেক সময় ব্যয় করেছি। মাঝে মধ্যেতো কাঠ কেটে আমি যে তৃপ্তি পাই তা অন্য কিছুতে পাই না। নীরবতার মধ্যে কাজ করে আমি আত্মিক শান্তি পাই।

আপনি ফিল্মের জন্য যেমন ব্যাপকভাবে পরিচিত, স্টিল্ ফটোগ্রাফির জন্যও তো তেমন পরিচিত…

আমার কাছে স্টিল্ ফটোগ্রাফি, ভিডিও এবং ফিল্ম একই ধারার উপাদান। প্রশ্নটা হচ্ছে আমরা কিভাবে আমাদের বিষয়ের কাছাকাছি যেতে পারছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্যকেই যদি তুলে আনতে চাই তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ’টা কিন্তু ডিজিট্যাল ভিডিওর। আমি সাধারণত অপেশাদার অভিনেতা অভিনেত্রীদের নিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আর এরা কিন্তু ডিজিটাল ক্যামেরার সামনে সহজেই দাঁড়াতে পারে। এখানে লাইটের ওত ঝলসানি থাকে না বা ওত বিশাল একটা দলও থাকে না, ফলে সহজেই তাদের সাথে আমি ঘনিষ্ঠ হয়ে যেতে পারি। এছাড়া থার্টি ফাইভ মিলিমিটারের ক্যামেরা এবং এর প্রডাকশনের জটিলতায় সবাই কিন্তু এটা দিয়ে কাজ করার সুযোগ পাই না। বর্তমানে ডিজিটাল ক্যামেরা কলমের মতই কোন বিষয়কে তুলে আনতে সহজ করে দিয়েছে। তোমার যদি সঠিক দূরদৃষ্টির্ থাকে এবং তুমি যদি সহজাত ফিল্ম মেকার হয়ে থাকো, তবে ফিল্ম তৈরি করা তেমন কোন ব্যাপার নয়। কলম দিয়ে যেমন শুরু কর, ক্যামেরা দিয়েও তেমনি শুরু করতে পারো। টেন এবং ফাইভ—এর ছবি আমি ডিজিটাল ভিডিওতে তুলেছিলাম। তিন এপিসোডের মধ্যে আমি যে এপিসোড স্যুট করেছিলাম সেটা থার্টি ফাইভ মিলিমিটারে রূপান্তরিত করি। অন্য দুটি এপিসোড করেছে কেন লোচ এবং আরমান্নো ওলমি। তিনটি এপিসোড টিকিটস্ নামে ইতালিতে তৈরি হয়।

আপনি এখনো যেসব পেইন্টিংস্ করেন সেগুলো সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?

আব্বাস কিয়ারোস্তামি : শুনো, যদিও আমি পেইন্টিংস্ করি কিন্তু নিজেকে কখনো পেইন্টার মনে করি না। আমার মনে হয় নিজেকে পেইন্টার ভাবার চেয়ে পেইন্টিংস্—এর মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পেইন্টিংস্ করতে আমার ভাল লাগে। যদি কখনো কেউ তাদের পেইন্টিংস্ আমাকে মূল্যায়ন করতে বলে আমি সহজভাবে তাদের বুঝানোর চেষ্টা করি, এই মূল্যায়নটা বড় নয় বরং তারা যে পেইন্টিংস্ নিয়ে আছে এটাই গুরুত্বপূর্ণ। পেইন্টিংস্—এ জড়িত থাকাটাকে যেহেতু আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, সেই কারণেই আমি পেইন্টিংস্ করি।

যদিও আপনি নিজেকে পেইন্টার হিসেবে চিহ্নিত করতে নারাজ, কিন্তু আপনার ফিল্মকে আপনি যেভাবে চিত্রায়িত করেন এবং ল্যান্ডস্কেপ এর ফ্রেম তৈরি করেন তা সত্যিই অদ্ভুত। পেইন্টিংস্তো নীরবেই করতে হয়। এক অর্থে ফিল্ম তৈরিতে যে সামাজিকতা ও শৈল্পিকতা একই সাথে থাকে তা পেইন্টিংস্—এ থাকে না, ফিল্ম তৈরিতে প্রচুর মানুষ আর বিশাল এক রূপক ক্যানভাস থাকে অন্যদিকে পেইন্টিংস্—এর ক্যানভাসটাতো ছোট।

আমি শৈল্পিকভাবে বাস্তবতাকে দেখতে পেয়েছি, বিশেষ করে পেইন্টিংস্—এর দৃষ্টিকোণ থেকে। আমি যখন প্রকৃতির দিকে তাকাই, আমার মধ্যে আপনা—আপনি পেইন্টিংস্—এর একটা ফ্রেম তৈরি হয়ে যায়। সবকিছু নান্দনিক দিক থেকে দেখি। এমনকি যখন আমি ট্যাক্সি—র জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তখনো আমি সবকিছুই ফ্রেমে আবদ্ধ করে ফেলি। এর জন্যেই আমি মনে করি পেইন্টিংস্, ফটোগ্রাফি এবং ফিল্ম একে অপরের সাথে সংযুক্ত এবং ঘনিষ্ঠ। মনে হয় কারণ, এ তিনটায় বাস্তবতাকে ফ্রেমে বন্দী করে। এক্ষেত্রে আমি সব সময় রেনোয়া’কে স্মরণ করি। তিনি বলেছিলেন, যদি তোমার ক্যানভাসে রং ছিটিয়ে পড়ে, তবে কোন দুঃশ্চিন্তা না করে সেই ছিটিয়ে যাওয়া রং থেকে নতুন কি বের করে আনা যায়, সেটারই চেষ্টা করো।

আমি এমন একটা বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইছি যা শিল্পীর স্বাধীনতাকে খর্ব করে। ইরানে চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং সেন্সরশীপের সম্পর্কটা কেমন?

গত দশ বছর ধরে সরকার আমার কোন ছবি দেখায়নি। আমি মনে করি, তারা আমার ছবি বুঝে না এবং তারা ছবিতে যে ম্যাসাজ পেতে চায় তা বের করতে পারে না বলে সেগুলো দেখায় না। তারা যে সব ছবিগুলোকে পৃষ্টপোষকতা দেয় সেগুলো আমার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। যেহেতু সিনেমার জগৎটা সরকারী নয় সেজন্য আমি এখনো কাজ করতে পারছি। সরকার আমাকে বাধাও দেয় না, সহযোগিতাও করে না। তোমাকে দুটো বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথমত, ইরানে একজন সরকারী কর্মকর্তা খুব বেশি সময়ের জন্য একটা পদে থাকে না। একজন যায়, আরেকজন আসে আর ঐ সময়েই কাজটা করতে হয়। দুটো ছবিতো অল্পের জন্য সেন্সরের কাঁচি থেকে রক্ষা পেয়েছে। সম্ভবত সেন্সর বোর্ড বুঝতে পারেনি কোন অংশটা কাটতে হবে। আমার মনে হয় সেই ছবিটায় ভালো যেটাতে সেন্সরের লোকজন বুঝতে পারে না কোন অংশটা বাদ দিতে হবে। আমি একটু যোগ করি, বর্তমান সময়ে পৃথিবীর অন্য জায়গার চলচ্চিত্র থেকে ইরানি চলচ্চিত্র তার চমৎকার দূরদৃষ্টি বা গভীরতার জন্যেই আলাদা নয়, বরং আলাদা এই কারণে যে, এখানে প্রতিটি চলচ্চিত্র কত বেশি সীমাবদ্ধতা ও বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে তার চিন্তা—চেতনা ও বিভিন্ন বিষয়কে তুলে ধরে।

আমি এই বিষয়টিকে দমন মনে না করে বাধা—বিপত্তি হিসেবে বিবেচনা করি। আর এই বাধা—বিপত্তি শুধু সিনেমার ক্ষেত্রেই নয় বরং আমাদের বৃহত্তর জীবনের প্রতিটি স্তরেই রয়েছে। প্রাচ্যের জীবন এটা থেকে কখনো মুক্ত নয়। আমাদের সব সময় কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে বড় হতে হয়েছে। জীবনতো হচ্ছে বাধা এবং মুক্তির সমন্বয়। কাজ ও ক্ষমতার জায়গাতো সীমিত। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমাদের প্রতি পদে পদে বলে দেওয়া হত আমাদের কি করা যাবে এবং কি করা যাবে না অথবা কোথায় যাওয়া যাবে বা কোথায় যাওয়া যাবে না।

মনিস রফিক
মনিস রফিক, অনুবাদক।

এই বিষয়ের একটা যথার্থ উদাহরণ হচ্ছে আমাদের ক্লাশ রুম। যখন আমাদের শিক্ষক কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর রচনা লিখে নিয়ে আসতে বলতেন, আমরা সেটা সুন্দরভাবেই লিখে নিয়ে যেতাম। কিন্তু যখন তিনি বিষয়টি নির্দিষ্ট করে দিতেন না তখন কিন্তু ভালো কিছু লিখে নিয়ে যেতে পারতাম না। আমাদের একটা গাইড লাইনের প্রয়োজন পড়তো, আমাদের স্বাধীনতা কতটুকু বা আমাদের সীমাবদ্ধতা কতটুকু কিংবা আমাদের সমাজের চরিত্র কেমন এর সব কিছুর ছাপই পড়েছে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। আমি একটি উদাহরণ টানি, ইরানের বিপ্লবের প্রথম চার বছরে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক বেশি বিশৃঙ্খলা, হৈ চৈ হয়েছে কারণ তখন তেমন বেশি একটা নিয়ম কানুন ছিল না। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, তখন অধিকাংশ চলচ্চিত্র নির্মাতাই কোন ছবি তৈরি করে নি যদিও অনেক বেশি ছবি হওয়ার কথা ছিল। কেউ সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেনি কারণ সবাই অপেক্ষা করছিল কি কি সব বাধা নিষেধ আরোপিত হতে যাচ্ছে তা দেখার জন্যে।

আমি এটা বুঝাতে চাচ্ছি না যে, এই সব বাধা—নিষেধ ভালো অথবা এগুলোর থাকা উচিৎ কিন্তু আমরা এগুলোর মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছি এবং আমাদের মানসিকতা ওমনভাবেই তৈরি হয়েছে। এটা শুধু আমাদের পেশাতেই নয় বরং সব পেশাতেই আছে। বাধা বিপত্তি কিন্তু মানুষকে আরো বেশি সৃষ্টিশীল করে তুলে। আমার একজন আর্কিটেক্ট বন্ধু আছে, সে আমাকে প্রায়ই বলে তখনই তার ডিজাইন খুবই সুন্দর হয় যখন তাকে বিরূপ কোন পরিস্থিতি বা জায়গার জন্য ডিজাইনটা করতে হয়। যখন কোন জমিতে সাধারণভাবে কোন স্থাপত্যকর্ম করা যায় না তখন তাকে অনেক বেশি চিন্তা করতে হয় এবং দীর্ঘ পরিশ্রমের পর সে তার চিন্তার সফল বাস্তবায়ন ঘটাতে সক্ষম হয়। ফলে এমন পরিস্থিতিতে যে কাজ করতে পারে সে অবশ্যই সৃষ্টিশীল হয় এবং সে সব সময় তার কাজকে উপভোগ করে।

কান ফেস্টিভ্যালে এ টেস্ট অব চেরী প্রদর্শিত হবার পূর্বে একটা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল যে ইরানি কর্তৃপক্ষ সম্ভবত ছবিটা প্রদর্শন করতে দিবে না কারণ ছবিতে আত্মহত্যার বিষয় দেখানো হয়েছে। পরে জানা গেল যে ছবির বিষয়বস্তু কোন সমস্যা নয়। ছবিটার বিষয়বস্তুর জন্য কি সেন্সরের ঝামেলা পোহাতে হয়েছে?

ছবিটা নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছিল। আমি কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলার পর তারা বুঝতে পেরেছিল যে ছবিটা আত্মহত্যা বিষয়ক নয় বরং ওটা এমন এক ছবি যাতে চিত্রিত হয়েছে আমাদের জীবন এর ব্যাপারে আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আছে, যখন আমরা চাইবো তখন আমরা এর পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারি। আমাদের দরজা খোলা আছে আমরা যে কোন সময় সিদ্ধান্ত নিতে পারি, কিন্তু আমরাতো থাকতেই চাই। আসলে এটাই হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার পরম দয়া যে তিনি আমাদের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন। কতৃর্পক্ষ আমার এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়েছিল। রোমানীয়—ফরাসী দার্শনিক ই এ সিয়োর‌্যান—এর একটি বাক্য আমাকে খুবই সাহায্য করেছিল। বাক্যটি হচ্ছে-আত্মহত্যা করার সম্ভাবনা না থাকলে আমি অনেক আগেই নিজের জীবনকে শেষ করে ফেলতাম। এ টেস্ট অব চেরী হচ্ছে বেঁচে থাকার এই সম্ভাবনা এবং আমাদের বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা কেমন সেটা তুলে ধরা। জীবন আমাদের কাছে এমন কোন বোঝা নয় যে একে বয়েই বেড়াতে হবে।

আমি একটু অযাচিতভাবেই জানতে চাইছি উনিশ’শ ঊনসত্তরের বিপ্লবের পরও কেন ইরানে থেকে গেলেন, যেখানে আপনার সময়ের অধিকাংশ চলচ্চিত্র নির্মাতাই দেশ ছেড়ে চলে গেলেন?

যে গাছটার শিকড় মাটির গভীরে চলে গেছে, সেটাকে তুলে যদি অন্য কোন জায়গায় লাগিয়ে দাও তবে সেটা বাঁচলেও কিন্তু আর ফল দিবে না। যদি ফল দিয়েও থাকে তবে সেটা আর আগের মত সুস্বাদু হবে না। এটা প্রকৃতির নিয়ম। আমার মনে হয় আমি যদি দেশ ছেড়ে চলে যেতাম তবে আমার অবস্থা ঐ গাছের মতই হতো।

আপনি কি মনে করেন আপনার ছবিগুলো ইরানের বিপ্লবোত্তর জীবনকে যথার্থভাবে তুলে ধরছে?

না, আমি এই ব্যাপারে একেবারে নিশ্চিত নই। আমি নিশ্চিত নয় যে আমার ছবিগুলো ইরানের সমাজ জীবনের বাস্তবতা উপস্থাপিত করছে; মূলত আমি জীবনের বিভিন্ন দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করি। ইরান একটি বিস্তৃত ও প্রসারণশীল জায়গা এবং আমরা যারা ওখানে বাস করি মাঝে মধ্যে আমাদের জন্যই কিছু বাস্তবতা উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আপনি কি নিজে একজন ধার্মিক?

এই প্রশ্নের আমি উত্তর দিতে পারবো না। আমি মনে করি ধর্ম বিষয়টি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং আমাদের দেশের ট্রাজেডি হচ্ছে এই ব্যক্তিগত বিষয়টি ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এই পৃথিবীতে আমার জন্য সবচেয়ে সহজতম কাজ হচ্ছে আমি যে ধার্মিক এটা বলা, কিন্তু আমি বলতে পারি না। আমাদের জীবনের এই সবচেয়ে ব্যক্তিগত জায়গাটা সরকারের ক্ষমতার ক্রীড়ানক হয়ে গেছে। মানুষের মূল্যবোধকে তারা তাদের ধার্মিকতার সম পর্যায়ে বিচার করে।

ধর্মীয় বাধা নিষেধের কারণেই কি আপনার ছবির প্রধান চরিত্রগুলো সব পুরুষ?

এরকম বাধা নিষেধতো স্বাভাবিক কাজ করা থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করে। তবে সহজ ভাষায় বলতে গেলে আমি মা বা প্রেমিকা হিসেবে নারীদের ভূমিকা পছন্দ করি না। অথবা দীর্ঘ কষ্ট পাওয়া নির্যাতিত মহিলার ভূমিকাও আমার পছন্দ নয়। আমার অভিজ্ঞতা এমন নয়। অথবা অসম্ভব ব্যতিক্রম কোন ভূমিকা। আমি একদম ব্যতিক্রম কিছু দেখানো পছন্দ করি না, বিশেষ করে মেয়েদের বীর হিসাবে যেটা বাস্তবতার সাথে মিলে না। এবং মেয়েদের আরেকটা ভূমিকা ঘর সাজানোর উপাদান হিসেবে। এটা শুধু ইরানেই নয় বরং গোটা বিশ্বেই এমনভাবে মেয়েদের উপস্থাপিত করা হয়। অতএব, আমার আর কি থাকে? যদিও টেন ছবিতে একজন নারী চরিত্র আছে।

ছবিটাতে কি আপনার বৈবাহিক অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে?

ঠিক ধরেছো। যা আমার অভিজ্ঞতায় নাই সেটা আমি কখনো তুলে আনতে চাই না বা সে সম্পর্কে কিছু বলি না। বাইশ বছর আগে আমাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। ইরানে নারীরাও বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। এক্ষেত্রে বলি, কোন মেয়ে যদি তার স্বামীর বিরুদ্ধে তাকে অত্যাচার করা বা মাদকাসক্ত হওয়া অথবা সন্তানের ভরণপোষণ এবং খেয়াল না রাখার অভিযোগ করে সেক্ষেত্রে তারা এই অধিকার ভোগ করে। তালাকের পর মেয়েরা তাদের স্বাধীনতা হারায় ফলে সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব—কর্তব্য পালনে তেমনভাবে সমর্থ হয় না। তাদের জীবনে প্রায়ই ট্রাজেডী নেমে আসে। আমি এই বিষয়টিই ছবিতে তুলে আনতে চেয়েছি। ছবিতে যে মহিলা তার স্বামীকে তালাক দেয় সে বিভিন্ন ধরনের যাত্রী নিয়ে তেহরান শহরে গাড়ি চালায়, তার যাত্রীদের মধ্যে দেখা যায় তার ছেলে, বন্ধু, বেশ্যা এবং একজন বৃদ্ধা। বিশেষ করে তার বিবাহ বিচ্ছেদের পরবর্তী পরিস্থিতি আমি তুলে ধরতে চেয়েছি। যাত্রীদের আসনে বসে থাকা তার ছেলে মায়ের সাথে বাজে ব্যবহার করে। সাত বছরের বালকের ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছে সে পুরুষতন্ত্রের পৌরুষত্ব দেখাচ্ছে- এক ধরনের যৌন বৈষম্যবাদী সমাজের প্রতিনিধির মত।

অভিনয়ের জন্য আপনি সব সময় কেন অপেশাদার অভিনেতা অভিনেত্রীদের বেছে নেন?

অপেশাদারদের দিয়ে অভিনয় করানো আমার জন্য সুবিধার, তারাতো আমার চিত্রনাট্য সংশোধন করে দেয়। আর এই কারণেই আমি তাদের দিয়ে অভিনয় করাই। আমার চিত্রনাট্য অনুযায়ী যদি একজন সাধারণ কেউ স্বাভাবিকভাবে অভিনয় করতে না পারে, তখন আমি ধরেই নিই আমার চিত্রনাট্যে ভুল আছে। অপেশাদার অভিনেতা স্যুটিং চলাকালীন সময়ে আমাকে বিভিন্নভাবে আমার কাজে হস্তক্ষেপ করে এটা আমার ছবিকে আরো সুন্দর করতে সাহায্য করে। আমি কখনো চাই না আমার ছবির অভিনয় একজন পেশাদার অভিনেতা নিজের মত করে করুক বরং আমি সব সময় চাই আমি যেভাবে কোন ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলতে চাই সে ওভাবেই করুক। সাধারণত একজন পরিচালক কোন সাধারণ চরিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্য কোন তারকা’কে দিয়ে অভিনয় করিয়ে নেয়, আমি কিন্তু সাধারণ কোন মানুষকেই ঐ সাধারণ চরিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্য ব্যবহার করি। এবং তারা নিজেদের চরিত্র ছাড়া অন্য কোন চরিত্রে অভিনয় করতে পারে না। একটা কথা আছে, প্রত্যেকেই একজন রোমান্টিক লেখক হতে পারে যদি সে নিজেই নিজের জীবনের প্রেম কাহিনি লেখে। ফলে এইসব অপেশাদার অভিনেতারা খুবই সুন্দর অভিনয় করে যেহেতু তারা তাদের নিজেদের চরিত্রেই অভিনয় করে। তুমি তাদেরকে কোন দৃশ্য বুঝিয়ে দিচ্ছো, তাদের বুঝার জন্য তারা কথা বলা শুরু করে দেয় এবং এমনসব বিষয় নিয়ে কথা বলে যা আমার মাথায় কখনো আসেনি। এটা একটা বৃত্তের মত এবং আমি জানি না, এর শুরু এবং শেষ কোথায় হয়। আমি জানি না, আমি তাদের শিখাচ্ছি কিনা কি বলতে হবে, না তারাই আমাকে শিখাচ্ছে কি করাতে হবে।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন : দশকের সেরা চলচ্চিত্র : সার্টিফাইড কপি

Facebook Comments
মনিস রফিক

মনিস রফিক

মনিস রফিকের জন্ম ১৯৬৯ সালের ১ জুলাই রাজশাহী শহরে। ২০০৭ সাল থেকে চলচ্চিত্র ও আদিবাসীদের নিয়ে গবেষণা, পত্রিকা সম্পাদনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে জড়িত আছেন। বর্তমানে তিনি কানাডার টরেন্টোতে কর্মরত আছেন। তার প্রকাশিত চলচ্চিত্র বিষয়ক কিছু বই হচ্ছে - ক্যামেরার পেছনের সারথি, চলচ্চিত্র বিশ্বের সারথি, গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার পটভূমি পর্যালোচনা, তারেক মাসুদ : চলচ্চিত্রের আদম সুরত, সুবর্ণরেখা : প্রসঙ্গ ঋত্বিক ( সম্পাদনা), তিতাস একটি নদীর নাম ( সম্পাদনা)।