আব্বাস কিয়ারোস্তামির সাক্ষাৎকার : পর্ব ২

share on:
আব্বাস কিয়ারোস্তামি

আব্বাস কিয়ারোস্তামির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন তুরস্কের ইস্তাম্বুল চলচ্চিত্র উৎসবে ব্রাইট লাইটস্ চলচ্চিত্র সাময়িকীর বার্ত কার্দুলেণ্ঢা ২০০৫ সালের মে মাসে । আজকে দ্বিতীয় পর্ব।

দর্শকরা এমন সব অভিনেতাদের কিভাবে গ্রহণ করে?

অপেশাদাররা পেশাদার অভিনেতাদের মত অভিনয় করে না সত্য, কিন্তু আমিতো ওটাই চাই। এবং এই যে অপেশাদারদের অভিনয় এবং তাদের মত করে চিত্রনাট্য তৈরি করার মাধ্যমে দর্শকরাও চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। আমি সব সময় “অর্ধ—নির্মিত সিনেমা”র পক্ষে যাতে দর্শকরা তাদের মনে বাকি অংশ তৈরি করে ফেলে। ভবিষ্যতের সিনেমাতো হচ্ছে পরিচালক এবং দর্শকের সিনেমা। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমি একটা ছবি তৈরি করি কিন্তু দর্শকরা ঐ ছবিকে নির্ভর করে আরো একশটা ছবি তৈরি করে ফেলে। প্রতিটি দর্শকই তাদের নিজের ছবি নিজে তৈরি করে। এটাই আমার সংগ্রাম। মাঝে মধ্যে আমার ছবির দর্শকরা আমার ছবি দেখে যখন তাদের মনের ছবির কথা বলে আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি এবং তখন আমি নিজেই তাদের ছবির দর্শক হয়ে যাই। এক্ষেত্রে ফার্সি ভাষার একটি প্রবাদের কথা মনে পড়ছে, প্রবাদটির অনুবাদ করলে দাড়ায়Ñ ধার করা চোখে দেখা। প্রবাদটির মত আমিও দর্শকদের কাছ থেকে তাদের চোখ ধার নিয়ে আমার ছবিগুলো দেখি এবং তাদের মত কল্পনা করে দেখি ছবিতে কি বাদ পড়েছে অথবা ছবিটা কেমন হলে ভালো হত। এটা আমি অন্যভাবেও বলতে পারি। সাধারণভাবে ছবির মাধ্যমে কিছু দেখানো হয় বা বলা হয়। কিন্তু সিনেমা তৈরিতে আমার লক্ষ্যই হচ্ছে, আমরা যা দেখি কতটুকু না দেখিয়ে বা না বলে করা যায়। আমরা দর্শকদের কল্পনাকে কত বেশি ব্যবহার করতে পারি। বাহ্যিকভাবে আমরা যা দেখি তার বাইরেও তুমি কল্পনা করতে পারো কারণ তুমি কোন এক বাস্তবতার মাত্র একটি অংশ দেখ। বিষয়টি সত্যিই সুন্দর যে, ছবি এবং এ্যাকশন তোমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায় যা গল্পে দেখানো হয় না। আমি এই দিক দিয়ে ব্রেসোর বর্জনের মাধ্যমে সৃষ্টি, সংযোগের মাধ্যমে নয়Ñ পদ্ধতিটি বিশ্বাস করি।

এই কারণেই কি এ টেস্ট অব চেরী’র মত সচেতনভাবে আপনি আপনার ছবিগুলোতে কোন উপসংহার টানেন না?

হ্যাঁ। কোন এক প্রকারে ছবিতে উপসংহার না টানার ধারণা বেশ কয়েক বছর আগে আমার মধ্যে কাজ করে। অধিকাংশ সময়ে দর্শক যে প্রত্যাশা নিয়ে ছবি দেখতে চায় তা হচ্ছে, ছবির কাহিনিটা বলা হবে। আমি এধরনের আয়োজনকে পছন্দ করি না যা আমার মধ্যে একজন গল্পকথক এবং দর্শক—এর বিভাজন তৈরি করে। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি দর্শকরা অনেক বেশি বুদ্ধিমান এবং নিশ্চয় এটাকে সুন্দর কিছু মনে করে না যে আমি দু’ঘন্টা ধরে তাদের আমার গল্প বলে মুগ্ধ করে রাখি। আমি যেভাবে চাই সেটা সে ভাবে শেষ করে দিব, আমি এটা চাই না। কিছু নির্মাতা তাদের মত করে তাদের ছবির সৌন্দর্য তুলে ধরতে চাই কিন্তু আমি ওমনভাবে সৌন্দর্য খুঁজি না। আমার কাছে সৌন্দর্য হচ্ছে দর্শক কত গভীরভাবে নিজেদের ছবির মধ্যে ঢুকতে পারছে এবং একটা ভালো ছবি সেটাই যা একজন দর্শককে কতটুকু বিমোহিত করবে তা নয় বরং দর্শককে কতটুকু নিজের করে নিতে পারলো।

আপনি কি একটু বিস্তারিতভাবে বলবেন কিভাবে অপেশাদার অভিনেতাদেরকে এত সাবলীল অভিনয়ে আনেন এবং আপনি আপনার ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করেন?

আমি ইতোমধ্যে উলে­খ করেছি, আমার ছবির সম্পূর্ণ চিত্রনাট্য থাকে না। আমার মনে চরিত্র ও ছবির সাধারণ কাঠামো থাকে। এবং আমার মনের মধ্যে যে চরিত্র আছে তাকে না পাওয়া পর্যন্ত আমি কোন নোট নিই না। আমি যখন সেই চরিত্রটাকে পেয়ে যাই তখন আমি তার সাথে সময় কাটাই এবং তাকে ভালোভাবে বুঝার চেষ্টা করি। অতএব, আমার মনে যে চরিত্রটা আছে তাকে নির্ভর করে পূর্বেই আমি কোন নোট নিই না বরং বাস্তব জীবনে যে মানুষগুলোকে দেখি তাদের উপর নির্ভর করেই করা হয়। আমি পুরো সংলাপও প্রথমে লিখি না এবং সেই নোটস্গুলো ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে আমি যে জ্ঞানলাভ করি তার উপর নির্ভর করেই হয়। যখন ছবির স্যুটিং শুরু হয় আমি আমার মনোনীত অভিনেতাকে একেবারে রিহর্সাল করাই না। অতএব, তাদেরকে আমার উপর নির্ভর না করিয়ে বরং আমিই তাদের দিকে ধাবিত হয়, ঘনিষ্ঠ হই এবং তারা আসলে যা সেটা তুলে আনি। আমি যা সৃষ্টি করার চেষ্টা করি তারা কিন্তু ওগুলোর সাথে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। এটা সত্য যে, আমি তাদের কিছু দিই কিন্তু আমিওতো তাদের কাছ থেকে নিই। বিষয়টির ব্যাখ্যার জন্য প্রায় এক হাজার পূর্বের রুমি’র একটা কবিতার সাহায্য নেওয়া যেতে পারে: মনে কর, তুমি আমার পোলো স্টিকের বল; আমি তোমাকে আঘাত করলাম অর্থাৎ গতি দিলাম, কিন্তু একবার যখন তুমি আমার কাছ থেকে মুক্ত হলে এবং ছুটতে শুরু করলে, আমাকে তখন তোমাকে খুঁজতে হবে। তখন তুমিও আমাকে দৌঁড়ায়ে নিবে। অতএব, তুমি যখন শেষ ফলাফলটা দেখবে তখন ওটা বের করা কষ্টকর যে, পরিচালক আমি না তারা। শেষ পর্যন্ত সবকিছু অভিনেতাদেরই হয়-আমি শুধু পরিস্থিতিটা তৈরি করি। আমি মনে করি এই ধরনের পরিচালনা অনেকটা ফুটবল কোচের মত। তুমি তোমার খেলোয়াড়দের তৈরি করছো এবং ঠিক জায়গামত তাদের বসিয়েছো কিন্তু একবার যখন খেলা শুরু হয়ে গেলো তখন তোমার আর করার কিছু থাকে না- তুমি হয়তো একটার পর একটা সিগারেট ধরাতে পারো অথবা ঘামতে শুরু করো কিন্তু এছাড়া তোমার আর করার কিছুই থাকে না। তুমি নিশ্চয় জানো টেন ছবিটায় একটা গাড়ির সামনে দশটা দৃশ্য আছে, তো ছবিটার স্যুটিং—এর সময় আমি পিছনে বসে ছিলাম এবং আমি কিছুতেই হস্তক্ষেপ করিনি। মাঝে মধ্যে আমি অন্য গাড়ির দিকে গিয়েছিলাম, অতএব সেট—এ সব সময় উপস্থিত ছিলাম না। আমার মনে হয়েছিল, আমি যদি না থাকি তবে অভিনেতারা তাদের মত করে আরো সুন্দরভাবে কাজ করবে, আমি খুব বেশি নির্দেশ দিলে হয়তো তারা নিজেদের স্বাভাবিকত্বটা হারিয়ে ফেলবে। অপেশাদার অভিনেতাদের দিয়ে অভিনয় করালে সেট—এর নিয়ম কানুনও আলাদা হওয়া প্রয়োজন এবং অবশ্যই তাদের মত করে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে।

কান্উন এ কাজ করার ফলেই কি আপনি এমন পদ্ধতিতে কাজ করতে পছন্দ করেন? কারণ ওখানে যেহেতু ছেলেমেয়েদের কাজ করতে হতো এবং সম্ভবত এই পদ্ধতিতেই। (কান্উন হচ্ছে: ইরানস্ ইনস্টিটিউট ফর দ্য ইন্টেলেক্চুয়াল ডেভেলপমেন্ট অব চিলড্রেন এ্যন্ড ইয়াং এ্যাডাল্টস্)।

আমার জীবনে ঐ সময়েই বিষয়টি গেঁথে যায়। আমি যদি ছোট বাচ্চাদের নিয়ে শুরু না করতাম, তবে আমি কখনো এই স্টাইলে পৌঁছাতে পারতাম না। ছোট বাচ্চারা কিন্তু অনেক শক্তিশালী এবং স্বাধীনচেতা এবং এমন কিছু অদ্ভুত সব বিষয় নিয়ে উঠে আসতে পারে যা মার্লোন ব্র্যান্ডোর মত অভিনেতার দ্বারাও সম্ভব নয় এবং মাঝে মধ্যে তাদের আদেশ দেওয়া বা পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। জাপানে আমার যখন আকিরা কুরোসাওয়ার সাথে দেখা হয়েছিলো, উনি আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, শিশুরা যেভাবে অভিনয় করতে চায় তুমি কিভাবে তাদের সেভাবেই অভিনয় করাও? মাঝে মধ্যে আমার ছবিতে শিশুরা থাকে, কিন্তু আমি তাদের হাত থেকে মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত আমি তাদের উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমাতেই থাকি কারণ তাদেরকে যে পরিচালনা করবো সেই রাস্তা আমার থাকে না। আমার নিজের ধারণা হচ্ছে কেউ যদি খুব উচ্চস্তরের হয়, মনে কর ঘোড়ার ওপরের কোন সম্রাটের মত, তাহলেতো শিশুদের পক্ষে তার সাথে সম্পর্ক তৈরি করা খুবই কঠিন একটা কাজ। তাদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করতে হলে বা তাদেরকে বুঝতে হলে তোমাকে তাদের স্তরে নেমে আসতে হবে। অভিনেতারা কিন্তু শিশুদেরই মত।

কার (Car)—এর সাথে আপনার সম্পর্কটা কি বলবেন, যেহেতু আপনার বেশ কয়েকটি ছবিতে কার—এর ভূমিকাকে বেশ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে?

কার আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। আমার অফিস, আমার বাড়ি, আমার লোকেশন। আমার একটি সুন্দর মুহূর্ত হচ্ছে যখন আমি কার—এ থাকি এবং আমার পাশে কেউ বসে থাকে। আমরা খুবই স্বাচ্ছন্দ্যে বসে থাকতে পারি কারণ আমরা মুখোমুখি বসে থাকি না বরং পাশাপাশি বসে থাকি। আমরা প্রয়োজন ছাড়া অবিরাম একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকি না। আমরা চারদিকে তাকাতে পারি। আমাদের সামনে এবং পাশের প্রকৃতিকে মনে হয় ছবির বিশাল পর্দা। ঐ সময় নীরবতাকে ভারী বা কষ্টকর মনে হয় না। আমরা কেউ কারো জন্য উদ্বিগ্ন হচ্ছি না। এছাড়াও আরো অনেক বিষয় আছে, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, কার এই অবস্থায় আমাদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বহন করে নিয়ে যায়।

আমি একজন আমেরিকান এবং মাঝে মধ্যে আমি আমেরিকান মিডিয়ার এন্টি—ইরানিয়ান মত দ্বারা প্রভাবিত হই। আমার ভাবতে ভালো লাগে যে আপনার ছবিগুলো বিশেষ করে অটোমোবাইলের সাথে আপনার সিনেমাটিক ভালোবাসাকে আমেরিকানদের এমন ভালোবাসার থেকে আলাদা মনে হয় না। এটা আমেরিকান এবং ইরানিয়ানদের মধ্যে অনেক বেশি বুঝাপড়ার সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে, কিন্তু আমার ভয় হয় যে, ইউ এস সংবাদ মাধ্যম আমেরিকানদের আপনার দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দেয়। এ বিষয়ে আপনার মত কি?

এই বিষয়ে তোমার ইতিবাচক মনোভাবের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। দুঃখজনক হলেও সত্য তোমার মত চলচ্চিত্র সমালোচকের সংখ্যা আমেরিকায় খুবই কম, কিন্তু ইরানে অনেক বেশি সমালোচক আছে। এটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, সিনেমাপ্রেমী মানুষেরা বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে একটি সাধারণ মিল খুঁজবে এবং এটা কিন্তু রাজনীতিবিদদের কাজকে অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে। রাজনীতিবিদরা তো বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব বা বিভেদ তা থেকে লাভ খুঁজার চেষ্টা করে। তোমার তো ভালোভাবেই জানা আছে, সিনেমা শিল্পের একটা মূল লক্ষ্যই হচ্ছে প্রতিদিনের দ্বন্দ্বের বাইরেও সার্বজনীন বাস্তবতার বিষয়টি তুলে ধরা।

আমি আমেরিকা, ইরান এবং ইরানি সিনেমার গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে আরো কিছুক্ষণ চালিয়ে যেতে চাইছি। আমেরিকার বড় বড় শহরগুলোতে আপনার যে ছবিগুলো মুক্তি পায়, বলতে গেলে সেগুলো চোখের পলকে প্রেক্ষাগৃহে আসে এবং নামিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু অদ্ভুত লাগে, এমনো তো সময় ছিল যখন বার্গম্যান, ফেলিনি, গদার—এর মত মহান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ছবি নিয়মিতভাবে সুস্থ আন্তর্জাতিক পরিবেশকের মাধ্যমে আমেরিকায় নিয়মিত মুক্তি পেত এবং মানুষজন লাইন ধরে সেগুলো দেখতো। এমন সব প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে হয়তো আপনিই প্রথম যার ছবি এত ব্যাপকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হচ্ছে।

ধন্যবাদ তোমাকে ঐ তিনজন মহান চলচ্চিত্র নির্মাতার সাথে আমাকে তুলনা করার জন্য। আমিও মনে করি তারা অপূর্ব কিছু ছবি তৈরি করেছেন, কিন্তু এই প্রসঙ্গে বলছি, সেইসময় হলিউডের সিনেমা বর্তমান সময়ের মত ক্ষমতাধর ছিল না। আজকের প্রতিযোগিতা অনেক বেশি কঠিন আর রূঢ় আর সেই জন্যে তাদের ছবিগুলো আমাদের জন্য আর কোন দর্শক রাখছে না। এটাতো সত্য, চলচ্চিত্র তার দর্শকদের চোখ তৈরি করে, এবং যখন তারা হলিউডের ছবিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে সেখানে সেই জায়গায় আমাদের ছবি প্রবেশ করানো খুবই কঠিন। কিন্তু অজ্ঞাতসারেই হলিউডের সিনেমা এমন এক জায়গায় চলে আসছে যাকে তার শেষ অবস্থা বলা যেতে পারে আর এটাতে স্বাভাবিকভাবে আমাদের মত ছবিগুলো চলে আসবে। হলিউডের ছবির দর্শকরা এখন তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করছে। দর্শকরা ছবি শেষ না করেই হল থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, এগুলো অনেক হয়েছে। এখানেই সত্যিকারের নির্মাতাদের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে উঠে দাঁড়ানোর।

আমার অভিজ্ঞতা বলে আজকাল দর্শকরা ফিল্ম থেকে খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা করে না। তারা খুব আনন্দও পেতে চায় না; তারা মূলত দেখতে চায় এ্যাক্শন অথবা এমন কিছু বিষয়।

এটার কারণ হচ্ছে ফিল্মগুলো তাদের এমন রুচি তৈরি করে ফেলেছে ফলে এ্যাকশন ছাড়া অন্যকিছু ভাবতে পারে না। এর আরেকটা কারণ হচ্ছে অধিকাংশ ফিল্মতো ফিল্মমেকাররা বানাচ্ছে না, বানাচ্ছে টেক্নিশিয়ানরা। আমরা এই বিষয়টি পরিস্কার করতে চাই এবং পরিস্থিতির অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে।

সিরিয়াস আর্ট কি সব সময় দর্শকদের মনে অন্য কোন বাস্তবতা খোঁজার আগ্রহ সৃষ্টি করে?

হ্যাঁ, আমি তেমনই মনে করি, কারণ না হলে আর্টের কোন উদ্দেশ্য থাকতো না। ধর্ম এই উদ্দেশ্য পূরণ করতে সফল না হলে আর্টই এটা করতে পারে। তারা একই উদ্দেশ্য পূরণে ধাবিত হয়। ধর্মের লক্ষ্য যেখানে পরকাল, আর্টের লক্ষ্য সেখানে বর্তমান সময়ে আরো সুন্দরভাবে টিকে থাকা। একটি আমাদের সুদূরের পথে নিয়ে যেতে চায় অন্যটি একেবারে কাছে, যেখানে পৌছানো খুব কঠিন কিছু নয়।

আপনি যে চিন্তা লালন করেন এই চিন্তা থেকে অন্যান্য কোন্ কোন্ ফিল্মমেকার চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে?

হোউ সিয়ায়ো সিয়েন একজন। বাহ্যিকভাবে তারকোভস্কির কাজ আমার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং আমি যত আত্মিক ছবি দেখেছি তার মধ্যে তারগুলো অনন্য। ফেলেনি তার ছবির কিছু অংশে যা করেছে অর্থাৎ স্বাপ্নিক জীবনকে চলচ্চিত্রে তুলে আনা, তারকোভস্কির কাজেও আমরা তার পরিচয় পাই। থিও অ্যাঞ্জেলোপোলোস—এর ছবিও কিছু কিছু মুহূর্তে এমন এক আত্মিক জায়গায় পৌছায়।

কাব্যিক সিনেমা তৈরি ইচ্ছা আপনি এক সময় পোষণ করেছেন অর্থাৎ উপন্যাস ও নাটকের চেয়ে কবিতার কাছে আপনার সিনেমার ঋণ বেশি। আপনার দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস ছবির শিরোনামতো ফরোহ ফারোখজাদ নামে এক মহিলা কবির কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে, একটা দৃশ্যে একজন ইঞ্জিনিয়ার কবিতাটি আবৃত্তি করছে এবং এই ছবিতে ওমর খৈয়ামের রুবায়েতও এসেছে।

সিনেমাকে তো সেভেন্থ আর্ট বলা হচ্ছে। এটার ব্যাখা দু’রকমের হতে পারে; হয় এটা অন্যান্য সব আর্টকে গ্রহণ করেছে এবং সব আর্টের সমাহার ঘটেছে এখানে, অথবা এটা নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ আর্ট। কিন্তু এমনকি সিনেমা সেভেন্থ আর্ট হলেও বিষয়টি অদ্ভুত, আর্টের অন্যান্য সব শাখাগুলো যেমন চিত্রকলা, সঙ্গীত একটা বির্বতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে এবং পরিবর্তিত হয়েছে; সিনেমার ক্ষেত্রে এটা এখনো হয়নি। সিনেমা আগে যেমন ছিল এখন তেমনই আছে; এটা এখনো খুবই বেশি নির্ভরশীল। আমি যখন কাব্যিক সিনেমার কথা বলি, আমি তখন মানবতাবাদী কোন বার্তা দিতে চাই না। আমি বলি যে, সিনেমাটা হবে আসলেই কবিতার মত, কবিতার সমস্ত বৈশিষ্ট্যগুলি ধারণ করে, মনে কর প্রিজমের মত।

এই ধরনের সিনেমা, যাকে আমি প্রিজমের মত বলছি; তার এমন ক্ষমতা থাকবে যে কোন সময় বা যে কোন পরিস্থিতিতে তুমি তাকে নিজের মনে করতে পারো এবং দর্শকরা ওর মধ্যে নিজেদের আবিস্কার করতে পারবে। আমি মনে করি, সিনেমা অন্যান্য আর্টকে অনুসরণ করবে এবং যে প্রক্রিয়ায় অন্যান্য আর্টগুলোর উন্নয়ন হয়েছে, সিনেমারও তেমনিভাবে হবে এবং অন্যান্য আর্টের মত সিনেমার লক্ষ্যও একই হবে। কিন্তু দর্শকদেরও বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে যে সিনেমা শুধু বিনোদনের জন্যেই হতে পারে না যেমন পাঠক যখন কোন কবিতা না বুঝে অনুধাবণ করতে পারে তখনতো সে বলে না যে, কবিতাটা খারাপ। বলে যে, বুঝতে পারেনি। ওর সাথেই তার নিত্য বসবাস। তারা যখন গান শুনে তারা তখন নিশ্চয় প্রত্যাশা করে না যে তারা গল্প শুনবে। যখন তারা বিমূর্ত চিত্রকলা দেখে, তখন বর্ণনাত্মক কিছুর বাইরে তারা চিন্তা করে। এক ধরনের ইমেজের মাধ্যমে এর অর্থ তারা পেয়ে থাকে। আমি আশা করি তারা সিনেমার পর্দার সামনেও এমনভাবেই নিজেদের তৈরি করবে।

ফাইভ ছবিতে আপনি দর্শকদের এমন সুযোগ দিয়েছেন যেখানে আপনি গল্প বলেন নি। ক্যাম্পিয়ান সাগরের তীরে পাঁচটি শট্ দিয়েই এই স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবিটা শেষ করেছেন।

হ্যাঁ, ফাইভ—এ কবিতা, ফটোগ্রাফি এবং ফিল্ম এক হয়ে গেছে। এটা আর্টের একটা নিরীক্ষামূলক কাজ। পাঁচটি শট্ এখানে গোটা বিষয়টাকে তুলে ধরেছে যেমন, ঢেউ ভেঙ্গে পড়ছে, হাঁসগুলো হেলে দুলে যাচ্ছে, মানুষগুলো হেঁটে যাচ্ছে, এক পাল কুকুর এবং সবশেষে ঢেউ—এর উপর চাঁদের কিরণ এসে পড়েছে।

কবিতা এবং সিনেমার অনেক পার্থক্যের মধ্যে একটা হচ্ছে দর্শক ধরেই নেয় যে তারা ছবিটা এক বা দুইবার দেখতে পারে এবং তাই করে। আপনি কবিতা সম্পর্কে যে মনোভাব ব্যক্ত করলেন তার থেকে এটা সম্পূর্ণ আলাদা। কবিতাতো আমরা বার বার পড়ি। এই কাব্যিক সিনেমা দর্শকদের কাছে পৌঁছতে সমস্যা হবে না তো? যেহেতু দর্শক বার বার সিনেমা দেখতে অভ্যস্ত নয়। আপনি কি প্রত্যাশা করেন যে, আপনি যেসব ছবিগুলোর কথা বলছেন দর্শক এগুলো বার বার দেখুক অথবা আপনি কি অন্তত আশা করেন যে তারা দেখবে?

আমি যদি বলি আমার ছবিগুলো দর্শকদের একবারের বেশি দেখা উচিৎ তাহলে আমাকে বড় বেশি স্বার্থপর মনে হবে। যাহোক, আমি একটা বিষয় জানি। অনেক দর্শক অতৃপ্তি নিয়ে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হয়ে আসতে পারে কিন্তু তার পরেও তাদের পক্ষে ছবিটা ভুলা সম্ভব নয়। আমি জানি, তাদের খাবার টেবিলে ওটা নিয়ে তারা কথা বলবে। আমি আমার ছবির দ্বারা তাদের একটু অস্থির করে দিই তারা এবং নিজেদের মধ্যে কিছু খোঁজার চেষ্টা করে। এইদিক দিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, তারা আমার ছবি একবারের বেশি দেখবে।

কাব্যিক বা বিমূর্ত ফাইভ—এর মতো প্রামাণ্যচিত্র এ.বি.সি আফ্রিকাও ডিজিটাল ভিডিওতে করেছেন?

হ্যাঁ, ওটাই প্রথম ছবি যেটাতে আমি এই নতুন ফরম্যাট ব্যবহার করেছি, প্রথমতো আমি ডিজিটাল ক্যামেরাকে সিরিয়াস কিছু ভাবিনি, আমি ওটা স্টিল ক্যামেরার চেয়ে বেশি কাজের মনে করতাম এবং ওটার মাধ্যমে কিছু নোট রাখতাম। কিন্তু যখন আমি কাজ শুরু করলাম এবং ওটার সম্ভাবনা উপলব্ধি করলাম এবং ওটা ব্যবহার করে আমি কি করতে পারতাম তখন আমি অনুধাবন করতে পারলাম কত সময় আমি নষ্ট করে ফেলেছি। আমার জীবনের ত্রিশ বছর আমি থার্টি ফাইভ মিলিমিটার ক্যামেরায় কাজ করেছি এবং এই আমি যে ধরনের কাজ করি সেসব কাজে ক্যামেরা সহায়ক না হয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

এ.বি.সি আফ্রিকার কাজতো আপনি দ্যা উইন্ড উইল ক্যারি আস— এর ইঞ্জিনিয়ারের মত করেছেন। যে ছবির দৃশ্যায়নের জন্য বিশাল জনবল নিয়ে গেলেও সবার অজ্ঞাতসারে স্টিল ক্যামেরাটা নিয়ে ব্যবহার করতে থাকে।

হ্যাঁ, সত্যিই। আমি ভাগ্যবান যে আমি এই দুটো ছবি করার সময়ে এই মাধ্যমটা আমার কাছে আসে। কারণ দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস—এর ইঞ্জিনিয়ারের মত আমার তেমন নিঃশেষিত অবস্থা তখন। তারপর আমি এই ক্যামেরা পেলাম। এক অর্থে দেবদূতের মত এসে আমার শৈল্পিক জীবনকে রক্ষা করলো। এটা ছবি তৈরির মানসিক ক্ষেত্রে নয়, বরং ছবি তৈরির সহজলভ্যতা বা আরামের ক্ষেত্রে।

এ.বি.সি আফ্রিকা’র কাজ শুরু হলো কিভাবে?

যেহেতু জাতিসংঘ জানে যে আমি দীর্ঘদিন ধরে ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ছবি করছি, তারা আমাকে এইডস্ এর কারণে যে সব শিশুরা অনাথ হয়েছে তাদের নিয়ে একটি ছবি করার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। তারা চেয়েছিল ছবিটার মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোর সাথে সাথে এই সমস্যার বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। এবং এই ছবির মাধ্যমেই এইসব অসহায় শিশুদের দূরাবস্থায় এগিয়ে আসার জন্য পৃথিবীর সব মানুষদের আহ্বান জানানো হয়।

উগান্ডায় আপনার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?

আমি উগান্ডায় গিয়েছিলাম কারণ ওখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনেকটা কম। মাঝে মধ্যে আমরা রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে ঘুরতাম। দেখতাম সাদা পোশাক পরে লোকজন রাস্তায় লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কোথায় কোন আলো নেই। বিদ্যুৎ নেই, মোমবাতি নেই, কোন আলো নেই। ঐ দিনগুলোতে ওখানকার সবকিছুই সবুজ ও সুন্দর। আমি দারিদ্র—পীড়িত মানুষদের দেখতাম কিন্তু তাদেরকে খুব উঁচু দরের মনে হতো, যা আমি প্রায় কখনো দেখিনি। আমি আমার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই মানুষগুলো এত সুখী কেন? বন্ধু উত্তর দিয়েছিল, এদের তিনটি জিনিস নেই- দূর্নীতি, মানসিক চাপ আর প্রতিযোগিতা। তারা যে প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদের নিয়োজিত করেছে সেটা হচ্ছে জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে যে প্রতিযোগিতা। এই কারণেই তারা তাদের জীবনের অর্থ খুঁজে পায়। এইডস্—এর রূপ ধরে মৃত্যু তাদের এত কাছাকাছি যে তারা যে জীবিত আছে এতেই তারা সুখী।

ফেসবুকে সংস্কৃতি ডটকমের পেইজে লাইক দিন এখানে ক্লিক করে।

আরও পড়ুন :  আব্বাস কিয়ারোস্তামির সাক্ষাৎকার : পর্ব ১

Facebook Comments
মনিস রফিক

মনিস রফিক

মনিস রফিকের জন্ম ১৯৬৯ সালের ১ জুলাই রাজশাহী শহরে। ২০০৭ সাল থেকে চলচ্চিত্র ও আদিবাসীদের নিয়ে গবেষণা, পত্রিকা সম্পাদনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে জড়িত আছেন। বর্তমানে তিনি কানাডার টরেন্টোতে কর্মরত আছেন। তার প্রকাশিত চলচ্চিত্র বিষয়ক কিছু বই হচ্ছে - ক্যামেরার পেছনের সারথি, চলচ্চিত্র বিশ্বের সারথি, গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার পটভূমি পর্যালোচনা, তারেক মাসুদ : চলচ্চিত্রের আদম সুরত, সুবর্ণরেখা : প্রসঙ্গ ঋত্বিক ( সম্পাদনা), তিতাস একটি নদীর নাম ( সম্পাদনা)।